Logo

১০ ভাদ্র ১৪৩৩

×

Follow Us

আদিবাসী দিবসে বিশ্ব ও বাংলাদেশের আয়না

কাভার স্টোরি

যে অধিকার আজও অধরা

আদিবাসী দিবসে বিশ্ব ও বাংলাদেশের আয়না

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বিশ্বজুড়ে দিনটি উদযাপন করা হয় নানা রঙে; আয়োজনে। আবার দিনটি একই সঙ্গে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর— বৈষম্যের হিসাব নেওয়ার। যারা যুগের পর যুগ নিজেদের ভূমি, সংস্কৃতি, ভাষা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করে চলেছেন, তাদের কথা নতুন করে শোনার দিন।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ আদিবাসী মানুষ ৯০টি দেশে বসবাস করেন। শতকারার হিসেবে যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশের কিছু বেশি। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের অন্তত ১৫ শতাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। তারা প্রায় ৫ হাজার স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক। তাদের বসবাসের অঞ্চলগুলো পৃথিবীর অবশিষ্ট জীববৈচিত্র্যের বড় একটি অংশের রক্ষকও। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় ২৮ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত এবং এসব অঞ্চলে বিশ্বের প্রায় ১১ শতাংশ বন রয়েছে। অর্থাৎ, সভ্যতার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া এই মানুষগুলো আসলে সভ্যতার জন্যই অপরিহার্য অনেক কিছু রক্ষা করে চলেছেন। কিন্তু বিনিময়ে কী পাচ্ছেন?

ভূমি হারানোর ভয়, উচ্ছেদের আতঙ্ক, দারিদ্র্য, বৈষম্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে থাকা, সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকট, ভাষার বিলুপ্তি, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সবচেয়ে বড় সংকট—সহিংসতা। বিশ্বের অধকাংশ দেশেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক এখনো সম্মান বা সমতার হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, ভূমি দখল, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের নামে তাদের ভূখণ্ডে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। জাতিসংঘও বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আদিবাসীরা এখনো প্রান্তিকতা, বৈষম্য ও বর্জনের শিকার।

উন্নয়নের মানচিত্রে কারা অনুপস্থিত?

আদিবাসী মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত তাদের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে স্বীকৃতি না দেওয়া। একটি আদিবাসী পরিবারের কাছে জমি শুধু সম্পত্তি নয়। সেটি বসতভিটা, খাদ্যের উৎস, জীবিকার ভিত্তি, পূর্বপ্রজন্মের স্মৃতি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের অংশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা। ফলে একটি পরিবার যখন জমি হারায়, তখন শুধু একটি খতিয়ান বা কয়েক একর জমি হারায় না—হারায় তার ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের একটি অংশ। 

বিশ্বের বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়, খনিজ সম্পদ আহরণ, বাঁধ, সড়ক, পর্যটনকেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল কিংবা অন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নামে তাঁদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামতই যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।

এখানেই আসে অধিকার বনাম উন্নয়নের প্রশ্ন। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু যে উন্নয়নে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও জীবিকা ধ্বংস হয়, তাকে কতটা উন্নয়ন বলা যায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও বিশ্বজুড়ে অমীমাংসিত।

বাংলাদেশের গল্পটিও আলাদা নয়
বাংলাদেশের আদিবাসীদের বাস্তবতা এই বৈশ্বিক সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং পাহাড় ও সমতলে তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ভূমি নিয়ে বিরোধ, উচ্ছেদ, সাংস্কৃতিক সংকট এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমিত অংশগ্রহণ। 

দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসান এবং পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় করা সেই চুক্তির বয়স এখন ২৮ বছরের বেশি। কিন্তু চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন এখনো অসম্পূর্ণ। আপনার দেওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি থমকে আছে।

সবচেয়ে বড় সংকট ভূমি। চুক্তির পর ঐতিহ্যগত ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। পরে আইনি জটিলতা কাটাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০১৬ সালে কমিশন আইনে সংশোধনী আনা হলেও বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠান ভূমি বিরোধ কতটা মিটাতে পেরেছে, তা নিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই নিয়ে আদিবাসীদের মধ্যে রয়ে গেছে গভীর হতাশা।

একজন মানুষের জীবনের কয়েক দশক কেটে যায় একটি জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়—এর চেয়ে নির্মম ভূমি-সংকটের ছবি আর কী হতে পারে? রাঙামাটির জ্ঞান লাল চাকমা ২০১৬ সালে তিনি তাঁর পাঁচ একর বসতভিটা ফিরে পেতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করেছিলেন। বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় বর্তমানে অন্যের জমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। আরেক কৃষক ন্যালশন চাকমা অস্থিতিশীলতার কারণে একসময় দেশের বাইরে শরণার্থী হয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসেও নিজের জমি ফিরে পাননি। এই পারিবারের গল্পগুলো আসলে পরিবারের নয়, এটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কাঠমোর প্রতিচ্ছবি।

চুক্তি আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কোথায়?

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু সেই চুক্তিতো শুধু কাগজে থেকে লাভ নেই, প্রয়োজন তার বাস্তবায়ন। চুক্তির বাস্তবায়ন না হলে শান্তি কেবল সংঘাতের অনুপস্থিতির নাম হয়ে দাঁড়ায়। অথচ শান্তির প্রকৃত অর্থ হলো নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ পদ্ধতির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক অধিকারের বিষয়ে অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। এসব নথিতে ভূমি দখল, প্রান্তিকতা, ভয়ভীতি ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর চাপের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ আরেকটি প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নারী ও শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন এবং ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে—অতএব প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সমতলের আদিবাসীরাও কি নিরাপদ?

সমতলের আদিবাসীদের সংকটও কম নয়। গারো, সাঁওতাল, ওরাঁও, পাত্র, হাজং, মুন্ডা, কোচসহ সমতলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে বিরোধ, উচ্ছেদ, বন মামলা ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি। টাঙ্গাইলের মধুপুরে গারোদের ভূমি নিয়ে উদ্বেগ, রাজশাহী, নওগাঁ, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরে ভূমিহীনতার সমস্যা এবং সিলেটে গারো ও পাত্র জনগোষ্ঠীর ভূমি সংকটের কথা কমবেশি সবারই জানা। 

কিছু দিন আগে মধুপুরে কথা হয়েছিল আদিবাসী নারী ববিতা মনকিনের সঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, আগে খাবারের জন্য চিন্তা করতে হতো না, বনে ঢুকলেই মেটে আলু বা আনারস অনায়াসেই পেয়ে যেতেন। এখন পাহাড় দখল হয়ে যাওয়ায় তাদের খাবারেও টান পড়েছে। এখন তাদের বাগানের আনারস বা কলার গাছও কেটে দিচ্ছে নানা অধিদপ্তর, পরিদপ্তরের লোকজন। প্রায় একই রকম শঙ্কটের কথা বলেছিল নওগাঁর পোরশার এক সাঁওতাল পরিবার। তারা পতিত জমিতে গজিয়ে ওঠা শন কেটে নিয়ে এসে ঝাড়ু বানায়। সেটাই তাদের পেশা। তারা জানায়, যুগ যুগ ভোগ করে আসা জমি এখন অন্যের হয়ে গেছে। খাস জমি সব দখল হয়ে গেছে, দখলদাররা ফসল ফলায়। যদি কোথাও শন হয়ও, কাটতে গেলে লোকে বাধা দেয়। পয়সা দিয়ে কিনে আনতে হয়।

সমতলের সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অন্তত একটি ভূমি কমিশন রয়েছে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য দীর্ঘদিনের দাবির পরও পৃথক ভূমি কমিশন নেই। ফলে ভূমি হারানোর পর একজন আদিবাসী পরিবারকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথাগত ভূমির মালিকানা এবং আধুনিক কাগজপত্রের মালিকানার মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিও তাঁদের জন্য বড় বাধা। একটি সমাজের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাকে যদি রাষ্ট্রীয় আইনের কাঠামো স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে কাগজে যার মালিকানা আছে, বাস্তবে তার জমি কে ভোগ করছে—এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।

পরিচয়ের অধিকারও কি অপরাধ?

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আরেকটি দীর্ঘদিনের দাবি সাংবিধানিক স্বীকৃতি। সংবিধানের ২৩(ক) ধারায় ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’–এর কথা বলা হলেও ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। ফলে পরিচয়ের প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরিচয় তো কারও দেওয়া নামমাত্র নয়। একটি জনগোষ্ঠী তার ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সামাজিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে নিজেকে যে নামে পরিচিত করতে চায়, সেই আত্মপরিচয়ের অধিকারও মানবাধিকারের অংশ। 

সাম্প্রতিক এক সেমিনারে সংবিধানে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দের পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ শব্দ যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন অধিকার কর্মী ও বিষেশজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনগত স্বীকৃতি এবং ভূমি দখল ও উচ্ছেদ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। এই দাবিকে কেবল শব্দের বিতর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। শব্দের সঙ্গে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি জড়িত। পরিচয়ের স্বীকৃতি মানে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি।

ভাষা হারালে হারায় একটি পৃথিবী

আদিবাসীদের অধিকার শুধু ভূমি বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়। এটি ভাষার প্রশ্নও। একটি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ শুধু একটি যোগাযোগব্যবস্থার বিলুপ্তি নয়; সেই ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান, প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা, চিকিৎসাপদ্ধতি, কৃষিজ্ঞান, গান, গল্প, প্রবাদ এবং পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। জাতিসংঘের তথ্য মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭ হাজার ভাষার অন্তত ৪০ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আদিবাসী ভাষাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ অনেক ভাষা বিদ্যালয়ে শেখানো হয় না এবং জনজীবনেও ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।

বাংলাদেশেও মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু হলেও শিক্ষকসংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আর সব মিলেয়ে—একটি শিশুকে তার নিজের ভাষায় লেখাপড়া করার অধিকার দিতে আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে।

এই বছরের প্রতিপাদ্য 

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে জাতিসংঘ গুরুত্ব দিয়েছে আদিবাসী ধাত্রীদের ওপর—‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: অধিকার এগিয়ে নেওয়া, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ’। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট বিষয়। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আরও গভীর একটি রাজনৈতিক বার্তা।

আদিবাসী ধাত্রীরা শুধু সন্তান প্রসবের সহায়তাকারী নন; তাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান, সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক মূল্যবোধের বাহক। জাতিসংঘের মতে, তাঁদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও ভূমির সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সম্পর্ককে একসূত্রে যুক্ত করে। কিন্তু বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে এই জ্ঞানব্যবস্থা যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। অর্থাৎ আদিবাসীদের বাঁচিয়ে রাখা মানে শুধু তাদের জন্য হাসপাতাল বানানো নয়; তাদের জ্ঞানকেও সম্মান করা।

আদিবাসীরা সাহায্যপ্রার্থী নন

আদিবাসী মানুষকে আমরা প্রায়ই উন্নয়ন-সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে দেখি। এই দৃষ্টিভঙ্গিও বদলানো দরকার। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বন সংরক্ষণ, খাদ্যব্যবস্থা এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তাদের জন্য প্রকল্প নয়, প্রয়োজন অংশীদারিত্ব। আদিবাসীদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা উন্নয়ন ভাবনায় প্রয়োজন তাদের অংশগ্রহণ। যে মানুষটি শত বছর ধরে একটি পাহাড়, একটি বন বা একটি নদীর সঙ্গে বসবাস করে আসছেন, সেই ভূখণ্ড সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানকে উপেক্ষা করে করা উন্নয়ন কোনো ভাবেই টেকসই হবে না।

রাষ্ট্রের কাছে প্রাপ্যটা কি খুব বেশি?

আদিবাসীদের দাবি শুনলে আমাদের চট করেই বলে উঠারা প্রবণাতা আছে, তার বিশেষ সুবিধা চাইছেন। আসলেই কি তাই? একটু গভীরে চিন্তা করলেই দেখবো, তাদের দাবিগুলো বিশেষ সুবিধার নয়; সমান অধিকার নিশ্চিতের। নিজের ভূমিতে নিরাপদে বসবাস, নিজের ভাষায় সন্তানকে শিক্ষা দেওয়া, নিজের সংস্কৃতি চর্চা, নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়া, সহিংসতার শিকার হলে বিচার পাওয়া, প্রথাগত ভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা বা নারী ও শিশুর নিরাপত্তা; এগুলো কোনো দয়া নয়, নাগরিক অধিকার। 

রংধনুর সব রং কি সমান উজ্জ্বল?

বাংলাদেশকে যদি সত্যিই একটি ‘রেইনবো নেশন’ বা বহু জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে রংধনুর প্রতিটি রঙের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু জাতীয় দিবসগুলোতে আদিবাসী নৃত্য, পোশাক ও খাবার প্রদর্শন করলেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা হয় না। কোনো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে মঞ্চে প্রশংসা করে তাদের ভূমি-অধিকার উপেক্ষা করা এক ধরনের বৈপরীত্য। তাদের উৎসব ভালো লাগে, কিন্তু তাদের অধিকার দিতে ভালো লাগে না—এমন দ্বৈততা দিয়ে কোনো বহুত্ববাদী রাষ্ট্র তৈরি হয় না।

রাষ্ট্রের উদ্যোগ নিতে হবে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলোর বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট সময়সীমা ও জবাবদিহি আনা, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, মাতৃভাষায় শিক্ষার বিস্তার ঘটানো, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আদিবাসীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি হলো—কোনো অভিযোগ উঠলে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির পথ বেছে নিতে হবে।

আজকের দিনটি তাই শুধু তাদের নয়

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস মূলত আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার দিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও আয়না। কারণ একটি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেই সেই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র ফুটে ওঠে।

যে দেশে একটি জনগোষ্ঠী নিজের ভূমি নিয়ে অনিশ্চিত, নিজের ভাষা হারানোর ভয়ে থাকে, নিজের পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকে এবং বিচার পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ায়—সেখানে উন্নয়নের বড় বড় পরিসংখ্যান থাকলেও গণতন্ত্রের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিশ্বের ৪৭ কোটি ৬০ লাখ আদিবাসী মানুষের সংগ্রাম তাই বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, ওরাঁও, ম্রো কিংবা অন্য জনগোষ্ঠীর সংগ্রামও কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়। তাদের অধিকার রক্ষা মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। তাদের ভূমি রক্ষা মানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা। তাদের ভাষা রক্ষা মানে মানবসভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডার রক্ষা করা। তাদের সংস্কৃতি রক্ষা মানে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ঋদ্ধতা দেওয়া। আর তাদের মর্যাদা রক্ষা মানে শেষ পর্যন্ত মানুষের মর্যাদাকেই রক্ষা করা।

অধিকার দয়া নয়, কারও অনুগ্রহও নয়। অধিকার—অধিকারই। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সেই অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র এই অধিকার যেদিন নিশ্চিত করতে পারবে সেদিন সেদিন বহুরঙের ফুলে ভরবে বাগান, সফল হবে এই আদিবাসী দিবস পালন।

মন্তব্য করুন

Logo