একটি আদালত, দুটি শিশু, অসংখ্য প্রশ্ন
নিশাত সুলতানা
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
১৩ বছর ৪ মাস বয়সী মা শিশু ‘জুঁই’ আদালতে দাঁড়িয়ে মাতৃত্বের অধিকারের জন্য লড়াই করছে। এই সংবাদটি যখন ফেসবুকের নিউজ ফিডে ভেসে এলো, তখন আমি অবাক বিস্ময়ে আরেকবার ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম আমার নিজের সন্তানকে। ওর বয়সও ১৩ বছর। ভাবছিলাম, এতটুকু বয়সে, এত ছোট্ট একটি শরীরে কীভাবে আরেকটি প্রাণ ধারণ করা, তাকে জন্ম দেওয়া সম্ভব!
৭ মাস বয়সী শিশু সন্তান কোলে ফুটফুটে চেহারার আরেকটি শিশুর ছবি, একটি সংবাদ আর একটি আদালতকক্ষ যে কখনও কখনও একটি সমাজের ব্যর্থতার পুরো ইতিহাস তুলে ধরতে সক্ষম; সাম্প্রতিক ঘটনাটি তারই সাক্ষী। ১৩ বছর ৪ মাস বয়সী জুঁই আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের সাত মাস বয়সী সন্তানের হেফাজত চাইছে। বিচারক যখন জিজ্ঞেস করেন, ‘ তোমার বাবু?’ তখন শিশুটি উত্তর দেয়, ‘ হ্যাঁ, আমার ছেলে।‘ এই সংলাপটি শুধু একটি মামলার অংশ নয়; বরং এই সংলাপটি তুলে ধরে বাংলাদেশের বাল্যবিয়ে পরিস্থিতির অভিশপ্ত এক চিত্র। শুধু তাই নয়, বিষয়টি প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক অবহেলার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। দুর্ভাগ্য যে শিশুটির এই মুহূর্তে স্কুলের ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম শ্রেণির বেঞ্চে বসে ক্লাশ করার কথা, সে এখন আদালতে নিজের সন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে।
গার্লস নট ব্রাইডস গ্লোবাল নেটওয়ার্কের হিসাব বলছে প্রতি বছর বিশ্বে ১২ মিলিয়ন কন্যা শিশুর বাল্যবিয়ে হয়। প্রতি তিন সেকেন্ডে বিশ্বে একটি করে মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়। সেই হিসাবে মিনিটে প্রায় ২৩ টি কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিশুবিবাহের হার সর্বোচ্চ এবং বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ। সমাজের মূলের গেঁথে থাকা বাল্যবিয়ের প্রচলিত কারণগুলো এখনো দূর করা যায়নি। এরমধ্যে যুক্ত হয়েছে বাল্যবিয়ের নতুন প্রবনতাগুলো। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণা " বিটুইন চয়েস অ্যান্ড কনস্ট্রেইন্ট: এক্সামিনিং ইনস্টিটিউশনাল গ্যাপস অ্যান্ড ইমার্জিং ট্রেন্ডস রিলেটেড টু চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ’ এ উঠে এসেছে বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে বেশ কিছু নতুন বিষয় আবির্ভূত হয়েছে; যার মধ্যে অন্যতম হলো কিশোর-কিশোরীদের স্বেচ্ছায় বিয়ে করার প্রবণতা এবং তথ্য-প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ।
গবেষণায় দেখা গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তুলনায় শহরের বস্তিগুলোতে বাল্যবিয়ের হার অনেক বেশী। কিশোর- কিশোরীদের স্বেচ্ছা বিয়ের প্রভাবক হিসেবে যে বিষয়গুলো কাজ করছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে উচ্চাশা না থাকা ও রোল মডেলের অভাব, পরিবারের সঙ্গে আবেগিক দূরত্ব এবং উপেক্ষিত হবার যন্ত্রণা, অনন্দবিহীন স্কুলশিক্ষা এবং নিম্নমানের পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবক কর্তৃক ইচ্ছার বিরূদ্ধে জোর করে বিয়ে দেয়ার ভীতি, নিজের ভালমন্দ ও চিন্তার পরিপক্কতা হবার আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, পর্ণগ্রাফির সহজলভ্যতা ইত্যাদি। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত দুটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল যৌনতা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ট্যাবু ও নীরবতার সংস্কৃতি এবং দুটি প্রজন্মের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট। সন্তানরা প্রেমের সম্পর্কে আছে, সেটি জানার পর অভিভাবকরা যেমন সন্তানের বিয়ে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, ঠিক একইভাবে সম্পর্কটি জানাজানি হবার পর অভিভাবকরা মেনে নেবেন না, সে আশঙ্কায় ছেলেমেয়েরাও বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এই ধরনের বাস্তবতায় কোনো পক্ষই বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি হয়নি সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে না। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি পরিবার একবার জানতে পারলে অনতিবিলম্বে মেয়েটির বিয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়।
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এই গবেষণায় দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর কিংবা তরুণও স্বেচ্ছায় বিয়ের বয়স হবার আগেই বিয়ে করেছেন। নিয়ন্ত্রণবিহীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহার স্বেচ্ছাবিয়ের প্রবণতা অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে স্মার্টফোন কিনে দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। আমরা সন্তানদের ডিজিটাল দুনিয়ায় নিয়ে আসছি; কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা শিখাচ্ছি না। আমরা ওদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছি, কিন্তু সম্পর্ক, সম্মতি, প্রতারণা কিংবা ঝুঁকি সম্পর্কে কথা বলছি না। তাদের অনলাইনে যুক্ত করছি; কিন্তু অফলাইনে কিংবা বাস্তবজীবনে তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ফলে দুটি প্রজন্মের মধ্যকার আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটি হারিয়ে যাচ্ছে। আর সেই শূণ্যস্থান দিয়েই প্রবেশ করছে অপরিচিত জগতের মানুষ আর বিভিন্ন প্রলোভন। প্রযুক্তি এখানে অপরাধী নয়; অপরাধী আমাদের প্রস্তুতিহীনতা ও উদাসীনতা।
জুঁইয়ের গল্প তাই আমার কাছে বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়। এটি একটি সময়ের সতর্কবার্তা। বাল্যবিয়ের কারণকে আমরা প্রায়ই দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে। বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে আরও অনেক নতুন উপকরণ জন্ম নিয়েছে। তাই এই বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় নিয়ে বাল্যবিয়ের প্রতিরোধে নতুনভাবে কাজ করতে হবে। তবে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা কোনো সমাধান নয়। শিশুদের জন্য ব্যাপকভাবে ডিজিটাল ওরিয়েন্টেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কৌশল নিয়ে কাজ করতে হবে। পারিবারিক যোগাযোগের সংকট এবং শিশুদের মানসিক একাকীত্ব নিয়েও ভাবতে হবে। স্কুলগুলোকেও শিশুদের মানসিক বিচ্ছিন্নতা ও সংকট নিরসনে ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে।
তবে জুঁইয়ের জীবনের গল্পের এতো সব তর্ক-বিতর্ক ছাপিয়ে যা আমাদের প্রবলভাবে স্পর্শ করেছে তা হলো মাতৃত্বের চিরন্তন অনুভূতি কি নিবিড়ভাবে ছুঁয়ে গেছে ১৩ বছর বয়সী ছোট্ট একটি শিশুকে। যে বয়সে তার ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যাবার কথা, সেই বয়সে শিশুটি নিজেই তার ৭ মাস বয়সী শিশুর দায়িত্ব বুঝে নিতে দুহাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করেছে আদালতপ্রাঙ্গনে। আমাদের শুধু প্রত্যাশা সময় আর প্রস্তুতির আগে যেন কাউকে মাতৃত্বের স্বাদ নিতে না হয়। মাতৃত্ব যেন কখনোই অভিশাপ হিসেবে নেমে না আসে আমাদের মেয়েদের জীবনে। আর কোনো শিশুকে যেন তা্র গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া আরেকটি শিশুর অভিভাবকত্বের জন্য আইনি লড়াই না করতে হয়। আর কোনো জুঁইকে যেন শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়।
নিশাত সুলতানা: লেখক ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

