৯৯৯-এ বাঁচা এবং পাঁচ মাসের বিচারহীনতা
ধর্ষণ, নির্যাতন, সাইবার সহিংসতা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর দীর্ঘ লড়াই
আরিফুর সাদি
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২১ এএম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে 'তরিকুলের বিচার করো' নামে একটি ফেসবুক পেজ। সেখানে প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে ভয়াবহ নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা। করা হচ্ছে মামলার অগ্রগতি, ভুক্তভোগীর বক্তব্য, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিচার দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট। কেন এই পেজ? বিচারের দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন? সেটা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারুফা আক্তার মিমের ওপর যেদিন নির্যাতন চালানো হয়।
ডেট লাইন ২৪ ফেব্রুয়ারি
রমজান মাসের সেই রাত। আশুলিয়ার ইসলামনগরের একটি ভাড়া বাসার ভেতরে হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের বিবরণ অনুসারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার ওপর চলে শারীরিক নির্যাতন। ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে তার হাত পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পোড়া স্থানে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার পর সেখানে লবণ ও হেক্সিসল লাগানো হয়। বেল্ট ও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং গলায় ছুরি ধরে দেওয়া হয় হত্যার হুমকি। নির্যাতনের একপর্যায়ে করে ধর্ষণ। এরপর অভিযুক্ত তার মোবাইল ফোন নিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে চলে যায়।
সেই মুহূর্তে যখন তার মনে হচ্ছিল, আর বাঁচার কোনো পথ নেই। ঠিক সেই সময় চোখে পড়ে ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা একটি বাটন ফোন। কোনোমতে হাতের বাঁধন খুলে সেই ফোনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। এবং সেই ফোনকল মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনে তাকে।
ঘটনার পরদিন, ২৫ ফেব্রুয়ারি বাবা-মা ও সহপাঠীদের নিয়ে গিয়ে ভুক্তভোগী মারুফা আক্তার মিম নিজেই বাদী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এস এম তরিকুল ইসলাম বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। পরে তদন্তের দায়িত্ব যায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে।
পথে পথে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল
একে একে দিন পেরিয়েছে। ঋতু বদলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে।ক্যাম্পাসে বেড়েছে নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণা। কিন্তু সেই রাত যেন মিমের জীবনে এক জায়গায় থেমে আছে। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হননি। তদন্তে নেই কোনো অগ্রগতি।
ভুক্তভোগীর দাবি, বিচার চাওয়ার পথেই তাকে লড়তে হচ্ছে নতুন নতুন সংকটের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, চরিত্রহননের চেষ্টা, পরিবারকে হুমকি, মামলা তুলে নেওয়ার চাপ এবং বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে আপসের চেষ্টা—সব মিলিয়ে তার অভিযোগ, আদালতের বাইরেও তাকে প্রতিদিন আরেকটি লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে গত পাঁচ মাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা, তদন্তের গতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সহপাঠী, অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
গা ছাড়া প্রশাসন, তদন্ত চলছে গদাই লস্করি চালে
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় অধিকার কর্মী মার্জিয়া প্রভার সঙ্গে। তিনি বলেন, “জাহাঙ্গীরনগরের ধর্ষণের ঘটনার পর মামলা দায়ের থেকে শুরু করে প্রশাসনের অবহেলা এবং ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার ভাষায় কথা বলে প্রশাসন প্রমাণ করেছে, ধর্ষণের ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখনো অটুট রয়েছে। এখনো এমন একটি মানসিকতা কাজ করে যেখানে কোনোভাবে একজন নারীকে চরিত্রহীন বা অভিযুক্তের প্রেমিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ধর্ষণের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিচারব্যবস্থাও অনেক সময় সেই ফাঁদে পড়ে।
হত্যাচেষ্টার মেডিকেল প্রমাণ থাকার পরও কেন পুলিশ তদন্তে অগ্রগতি আনতে পারছে না এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারছে না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা নূর বলেন, “মামলার পরদিন পুলিশ ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ধর্ষণের আলামত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেয়নি।” সানজিদা নূরের দাবি, ভুক্তভোগী অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা কিংবা মামলাটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
এ বিষয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ জেনিচ অভিযোগ তুলে বলেন, “ঘটনার পর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানালেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকর অগ্রগতি আমরা দেখতে পাইনি। অভিযোগ ওঠার পরও তরিকুলকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে। অন্যদিকে পুলিশ বারবার বলছে, তারা তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। আমাদের কাছে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি; বরং পুলিশের ভূমিকা টালবাহানাপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে।”
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুল ইসলামের দাবি, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষ্য, অভিযুক্ত আত্মগোপনে থাকায় এখনো তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
ঘটনা শিকড় আরও গভীরে
ফৌজদারি মামলার বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন শুরু হলেও এর বিস্তার ছাড়িয়ে গেছে আদালতের বাউন্ডারিরও অনেক বাইরে। সেখানে জমা হয়েছে পাঁচ মাস ধরে একটি বিচারপ্রক্রিয়ার পথচলা, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাহীনতা, তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন এবং বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকার বিষাদময় গল্প।
২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন আর দশটা ঘটনার মতো ছিল না। ভুক্তভোগীর ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অভিযুক্ত এস এম তরিকুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয়। এর পর থেকেই সম্পর্কটি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ, ভয়ভীতি এবং নির্যাতনের দিকে মোড় নেয়। প্রথম দিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও পরে সেটি সহিংস হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ তার। ২০২৫ সালে তিনি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে অভিযুক্ত তরিকুল তাকে কয়েক দিন নিজের বাসায় আটকে রাখেন এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেন বলে অভিযোগ করেন। ওই সময় তার আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয় এবং পরে সেগুলো দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু হয় বলেও তার দাবি।
ভুক্তভোগী জানান, সম্পর্ক শেষ করার প্রতিটি চেষ্টার জবাবে তিনি নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন। কখনো ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, কখনো পরিবারের সদস্যদের কাছে স্ক্রিনশট পাঠানোর ভয় দেখিয়ে তাকে সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন সেই ভয় থেকেই কাউকে কিছু জানাতে পারেননি।
২৪ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ওই দিন দেখা করতে অস্বীকৃতি জানালে তরিকুল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে আশুলিয়ার ইসলামনগরের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যায় এবং সেখানেই ঘটে নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা।
একপর্যায়ে তরিকুল ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি কোনোভাবে নিজের হাতের বাঁধন খুলতে সক্ষম হন। এরপর ভেতর থেকে দরজা আটকে ৯৯৯-এ ফোন করেন। কিছুক্ষণ পর অভিযুক্ত ফিরে এসে দরজা ভাঙার চেষ্টা করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে শুরু করেন। পরিস্থিতি বুঝে তরিকুল সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
সেই রাতের পর শুরু হয় আরেক ধরনের যুদ্ধ
মামলা দায়ের, মেডিকেল পরীক্ষা, চিকিৎসা, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি—এসব ছিল বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধাপ। কিন্তু ভুক্তভোগীর বলেন, আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি তাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যেখানে প্রতিদিনই নতুনভাবে ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত তরিকুল বিভিন্ন নম্বর থেকে তাকে ফোন করে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। শুধু তাকে নয়, তার পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছেও যোগাযোগ করা হয়। ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে তাদের বলা হয়, ভুক্তভোগীকে মামলা প্রত্যাহারে রাজি করাতে। অন্যথায় তাদেরও ক্ষতি হতে পারে বলে হুমকি দেয়।
ভুক্তভোগী মিম জানান, একপর্যায়ে তরিকুল সরাসরি তার মাকেও ফোন করেন। সেখানেও তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সেই কথোপকথনের অডিও রেকর্ড নিজের কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন।
এখানেই শেষ নয়
শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আদালতে পৌঁছানোর আগেই মিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আরেক ধরনের সহিংসতা। বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে তার ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একটি গুগল ড্রাইভের লিংকের মাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন পোস্টে ঘটনার বিকৃত বর্ণনা ছড়িয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ভুক্তভোগীর ভাষায়, তাকে শুধু একজন অভিযোগকারী নয় বরং অভিযুক্তের আসনে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে।
এসব ঘটনার পর তিনি সাইবার হয়রানির অভিযোগ নিয়েও পুলিশের দ্বারস্থ হন। তিনি বলেন, থানায় গেলে অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত গত ৫ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২৫(২) ধারায় তরিকুল ইসলাম ও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে তিনি পৃথক একটি মামলা দায়ের করেন।
মিম বলেন, সেই মামলারও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। যে গুগল ড্রাইভের লিংকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ছড়ানো হয়েছে, সেটি অপসারণেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই নতুন করে সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে তাকে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মামলা প্রত্যাহারের চাপ এবং কর্তৃপক্ষের ভূমিকা
মিমের দাবি, সরাসরি হুমকির পাশাপাশি আপসের নানা প্রস্তাব আসতে থাকে। তরিকুলের পরিবারের সদস্যরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাড়িতে লোক পাঠানো হয়। জানানো হয়, মামলা তুলে নিলে অভিযুক্ত তাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্বও নেবে। তরিকুলের মামা, এলাকার সাবেক চেয়ারম্যান এবং উত্তরা এলাকার কয়েকজন রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি; তাদের মাধ্যমেও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই—মামলা প্রত্যাহার এবং আপস।
কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। তার ভাষায়, ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশাই তাকে এখনো লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি দিচ্ছে। তবে তার অভিযোগ, এই পুরো সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। বিভিন্ন সময়ে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে দাবি করেন তিনি। প্রতিবারই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু পাঁচ মাস পরও সেই আশ্বাস বাস্তব ফল এনে দিতে পারেনি বলে তার অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইজান আহমেদ অর্কও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষার্থীদের সম্পদ হিসেবে দেখে, নাকি বোঝা হিসেবে—এই প্রশ্নটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় একটি ঘটনার পরও, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ছাত্রী ভুক্তভোগী, সেখানে প্রশাসনের কার্যকর কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনুসরণের দায়িত্বও আমাদেরই নিতে হয়েছে।”
বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান কবে
জাহাঙ্গীরনগরের সীমানা ছাড়িয়ে বিষয়টি এখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়ছে। কথা বলছেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। প্রতিবাদের আওয়াজ উঠেছে সামাজিকমাধ্যমে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী প্রাপ্তি পিয়া বলেন, “জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনায় পুলিশ নীরব কেন? আজ প্রশ্ন শুধু একজন অভিযুক্তের বিচার নয়। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্র নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে কি না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান চাই। দোষী যে-ই হোক, তার দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভিক্টিম ব্লেমিং ও স্লাটশেমিংও বন্ধ করতে হবে।”
অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামের বক্তব্য, “আমরা ইতোমধ্যে তার গ্রামের বাড়ি, নানাবাড়িসহ জামালপুর সদর ও সরিষাবাড়ী এলাকায় একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছি। ঈদের সময়ও সেখানে অবস্থান করেছি। এমনকি তার বাড়ির আশপাশেও নজরদারি চালিয়েছি। কিন্তু অভিযুক্ত বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে। সে কোথায় আছে, সে বিষয়ে কেউ কোনো তথ্য বা সন্ধান দিতে পারেনি।”
কতগুলো সমান্তরাল লড়াই লড়তে হবে?
এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ধীরে ধীরে একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পর একজন নারীকে আর কতগুলো সমান্তরাল লড়াই লড়তে হবে?
এই প্রশ্ন শুধু তার একার নয়। ঘটনাটি সামনে আসার পর একই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন তার সহপাঠী, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকারকর্মীরাও। তাদের অভিযোগ, মামলার তদন্ত যতটা এগোনোর কথা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিচারহীনতার আশঙ্কাই আরও প্রবল হয়েছে। এই পর্যায়েই ঘটনাটি একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত লড়াইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশ্য আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
মন্তব্য করুন

