সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
যে কোনো রাজনৈতিক পালাবদলের পর সাধারণ মানুষ প্রধানত দুটি বিষয়ের দিকে সবচেয়ে বেশি তাকিয়ে থাকে জানমালের নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়। তারা দেখতে চায়, নতুন সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে কি না, বাজারে গিয়ে আগের চেয়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছে কি না। তারা বুঝতে চায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি আরও জবাবদিহিমূলক? প্রশাসন কি দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করছে?
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় ঠিক এমনই এক প্রত্যাশার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন, সংঘাত এবং শাসনব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নতুন ধারা দেখা যাবে। কিন্তু সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অভিজ্ঞতায় জনগণ সেই আশাবাদের প্রতিফলন কমই দেখতে পেয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো—একদিকে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান অবনতি, মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও দলীয় প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে; অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। এই দুই সংকটম একসঙ্গে সরকারের জন্য শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব: নিরাপত্তা, কিন্তু মানুষ কতটা নিরাপদ?
একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু গত কয়েক মাসে খুন, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতনের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধের সংখ্যা শুধু যে বাড়ছে তা নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বোধও অনেক বেড়েছে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে টিআইবির গবেষণা বলছে, অপরাধ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। শুধু মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসেই দেশে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬টি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সময়ে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটি শুধু অপরাধ বৃদ্ধির চিত্র নয়; বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্তৃত্ব ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
কোনো রাষ্ট্রে অপরাধের হার শূন্য হবে না, কিন্তু মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম এবং অপরাধীরা শাস্তি পাবে, তাহলে সামাজিক আস্থা বজায় থাকে। বর্তমানে সেই আস্থার জায়গাটিই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছিনতাই, চুরি ও সহিংস অপরাধের খবর নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে। রাতে নয়, দিনের বেলাতেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী—কেউই নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা নয়; বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার প্রবণতারও ইঙ্গিত দেয়।
মব সহিংসতা চলছেই
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যে প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, তা হলো মব সহিংসতা ও গণপিটুনি।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত এবং ৭০ থেকে ১২৫ জন আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্র যখন বিচার ও আইন প্রয়োগের একমাত্র বৈধ কর্তৃত্ব হারাতে শুরু করে, তখনই মব সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সরকারের ঘোষিত ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির পরও বাস্তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বিচারব্যবস্থা ধীর, দুর্বল অথবা অকার্যকর, তখন তারা নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু এর ফল হয় ভয়াবহ। কেউ হয়তো চোর সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। আবার এমন উদহরণও রয়েছে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো ব্যক্তিকে এর শিকারে পরিণত করা হচ্ছে।
এই প্রবণতা শুধু আইনের শাসনকে দুর্বল করে না; এটি সমাজকে ক্রমশ সহিংস ও অসহিষ্ণু করে তোলে। রাষ্ট্র যদি দ্রুত এবং দৃশ্যমানভাবে এই সংস্কৃতি দমন করতে না পারে, তাহলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর মব সহিংসতার যে প্রবণাতা শুরু হয়েছিল নির্বাচিত সরকার এলে তার অবসান হবে বলেই সাধারন নাগরিক ধরে নিয়েছিল। কিন্তু তা না হয়ে চব্বিশের ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে।
চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব: ক্ষমতার ছায়া অর্থনীতির ওপর
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি কোনো নতুন সমস্যা নয়। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও যদি একই অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জাগে—তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?
হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড, পরিবহন খাত কিংবা স্থানীয় ব্যবসা—প্রায় সর্বত্র চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ আদায়ের সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তাহলে তা সরাসরি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
একটি ট্রাক যখন পথে পথে চাঁদা দেয়, সেই খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। একজন ব্যবসায়ী যখন নিরাপদে ব্যবসা করতে পারেন না, তখন তিনি সেই ঝুঁকির মূল্যও ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করেন।
অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির সংকট পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তারা একে অপরকে শক্তিশালী করে।
‘এবার আমাদের পালা’: ক্ষমতার পুরোনো রোগের প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের পর একটি পরিচিত বাক্য বারবার ফিরে আসে—‘এবার আমাদের পালা’।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশাসন, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়নের প্রবণতা এখনও দৃশ্যমান।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে পেশাদারিত্ব হারায়। যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় যদি পদোন্নতির প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর ফলে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতাই কমে না; জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ মানুষ তখন মনে করে, রাষ্ট্র সবার নয়; বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।
জবাবদিহির প্রতিষ্ঠানগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন—এসব প্রতিষ্ঠান মূলত সরকারের ক্ষমতার ওপর একটি নৈতিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।
কিন্তু যদি এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকে কিংবা কার্যকর না হয়, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বর্তমানে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ এখানেই। কারণ দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা আর কার্যকর প্রতিষ্ঠান—এই দুই জিনিস এক নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী না হলে দুর্নীতিবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যও শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
মানুষের ধৈর্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম মূল্যস্ফীতি। রাজনীতি নিয়ে মানুষের ধৈর্য অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু বাজার নিয়ে মানুষের ধৈর্য খুব সীমিত। মানুষ প্রতিদিন বাজারে যায়। প্রতিদিন চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংস কিনে। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব মানুষ প্রতিদিন অনুভব করে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে তা পৌঁছেছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ শুধু চাল-ডাল নয়, পরিবহন, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বাসাভাড়া এবং অন্যান্য সেবার ব্যয়ও সমানতালে বেড়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের শেষ পাঁচ মাসের মধ্যে তিন মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে।
বাজার বাস্তবতার চাপ
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাজারে। আর সেখানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির এই হার শুধুমাত্র পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণার প্রতীক। যে পরিবার আগে সপ্তাহে দুই দিন মাছ ও এক দিন মাংস খেত, তারা এখন হয়তো সপ্তাহে এক দিন মাছ খাচ্ছে। যে পরিবার আগে সন্তানের জন্য আলাদা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করত, তারা এখন সেই খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। যে পরিবার আগে কিছু সঞ্চয় করতে পারত, তারা এখন মাসের শেষ সপ্তাহে ধার করছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়; এটি জীবনযাত্রার মান, পুষ্টি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মোটা চালের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে কেজিপ্রতি মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৬ টাকা। মাঝারি মানের ব্রি-২৮ চালের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৫৪ থেকে ৬৮ টাকা হয়েছে। সরু চাল বা মিনিকেট-নাজিরশাইলের দাম এখন ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি।
ভোজ্যতেলের বাজারও অস্থির। বর্তমানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা, যা এক বছরে ১০ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৫ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু চাল ও তেল নয়, অনেক সবজির দামও ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাদ্যব্যয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
মধ্যবিত্তের অদৃশ্য সংকট
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে মধ্যবিত্তের ওপর। দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে। ধনী মানুষের সম্পদ ও আয়ও তুলনামূলক বেশি। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো প্রায়ই এই দুই শ্রেণির মাঝখানে আটকে যায়। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাসুদুর রহমান। তাঁর বর্তমান বেতন ৫০ হাজার টাকা। তিন বছরে তাঁর বেতন বেড়েছে মাত্র ৭ হাজার টাকা, কিন্তু একই সময়ে সংসার খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এই টাকা ম্যানেজ করতে মাসের বিনোদন— ছেলে-মেয়েকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যাও, বাদ দিতে হয়েছে। যে পরিবার কয়েক বছর আগেও মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারত, তারা এখন সঞ্চয় ভেঙে বা ধার করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এটি কেবল একজন মানুষের গল্প নয়; বরং নগর মধ্যবিত্তের বৃহত্তর বাস্তবতা।
তারা সরকারি সহায়তা পায় না, আবার বাজারের চাপ সামলানোর মতো অতিরিক্ত আয়ও নেই। ফলে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না করলেও নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঞ্চয় কমে যায়, চিকিৎসা পিছিয়ে যায়, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় কমে যায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে।
প্রকৃত আয় কমছে, হতাশা বাড়ছে
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়ছে না। মজুরি বা বেতন কিছুটা বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে মানুষ বেশি টাকা হাতে পেলেও কম জিনিস কিনতে পারে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, অথচ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ২১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
কৃষি খাতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, সেবা খাতে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শিল্প খাতে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এর অর্থ হলো, দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে এই জনগোষ্ঠীর ওপর।
এই বাস্তবতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সামাজিক হতাশা বাড়ে। কারণ মানুষ তখন অনুভব করে, সে যতই পরিশ্রম করুক না কেন, জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে না।
সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক সতর্কর্তা
রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনের কারণে নয়, বরং জনগণের নীরব অসন্তোষের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকারের জন্যও সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা এখানেই।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি, মব সহিংসতা, দলীয় প্রভাব এবং মূল্যস্ফীতি—এই সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা নয়। এগুলো মিলেই একটি সামগ্রিক জনঅসন্তোষ তৈরি করছে।
যখন একজন নাগরিক মনে করেন তিনি নিরাপদ নন, ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না এবং একই সঙ্গে বাজারের খরচও সামলাতে পারছেন না, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি হতাশা জন্ম নেয়।
এই হতাশা প্রথমে নীরব থাকে। পরে তা সামাজিক অসন্তোষে, রাজনৈতিক অনাস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতায় রূপ নিতে পারে।
দ্বিমুখী সংকটে সরকার
বর্তমান সরকার এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাজনৈতিক সুশাসনের সংকট এবং অর্থনৈতিক সংকট একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে। এবং দুটিকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
একদিকে গত দুই মাসে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ৩ হাজার ৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
অন্যদিকে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, এবং মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমছে।
অর্থাৎ নাগরিকরা একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপে আক্রান্ত। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এই দুই সংকট একসঙ্গে উপস্থিত হলে সরকারের প্রতি জনআস্থা দ্রুত ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মব সহিংসতা, দলীয়করণ, জবাবদিহির ঘাটতি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব যেমন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তেমনি মূল্যস্ফীতির চাপ তাদের জীবনকে ক্রমশ অসহনীয় করে তুলছে।
ফলে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উন্নয়ন নয়, বরং আস্থা। মানুষ কি রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে পারছে? মানুষ কি বিশ্বাস করছে যে আগামী দিনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে?
এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারলে সরকারের সামনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—তিন ধরনের সংকটই আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মন্তব্য করুন

