বিদায় ফুটবলের ট্রাজিক হিরো!
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম
এবারের বিশ্বকাপ থেকে একে একে বিদায় নিয়েছেন লুকা মদ্রিচ, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ম্যানুয়েল নয়্যার, সাদিও মানে, মোহাম্মদ সালাহদের মতো এক যুগের প্রতীক হয়ে ওঠা তারকারা। অনেকেরই এটি ছিল শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু তাদের সবার বিদায়ের ভিড়ে নেইমারের বিদায় যেন অন্যরকম এক শূন্যতা তৈরি করে। যে লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সেও পায়ের জাদু দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করে নিজের কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে তুলে নিয়েছেন, সেখানে মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই বিশ্বকাপের মঞ্চকে বিদায় জানাতে হলো নেইমারকে। বয়সের কারণে নয়, বরং বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়া শরীরের কাছে নতি স্বীকার করে।
বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো আর কোনোদিনও তাঁর হাতে উঠবে না। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও তিনি বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে কি তিনি হেরে গেলেন? ফুটবলের ইতিহাসে তাঁর স্থান কি শুধুই অপূর্ণতার তালিকায়?
আমার মনে হয়, নেইমার ফুটবলের অন্যতম ট্রাজিক হিরো। কারণ ট্র্যাজেডি শুধু পরাজয়ে নয়; ট্র্যাজেডি তখনই জন্ম নেয়, যখন অসাধারণ প্রতিভা নিজের সীমাবদ্ধতায় নয়, নিয়তির নির্মমতায় আটকে যায়। নেইমারের মূল্যায়ন তাই শুধু ট্রফি, পদক কিংবা ব্যালন ডি'অরের ভোটে সম্ভব নয়। তাঁর আসল পরিচয় বারবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। এ কারণেই তিনি কেবল একজন তারকা নন, তিনি এক অনমনীয় মানসিকতার প্রতীক।
একটা সময় ব্রাজিলের রাস্তায় ছোট্ট এক ছেলেকে দেখে মানুষ বলত, সে বল নিয়ে দৌড়ায় না; বলটাই যেন তার পায়ের ভাষা বোঝে। স্যান্টোসের জার্সিতে সেই জাদু একদিন পুরো পৃথিবী দেখল। মাত্র কিশোর বয়সেই তাকে তুলনা করা হলো পেলের সঙ্গে। তারপর বার্সেলোনায় লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজকে নিয়ে গড়লেন কিংবদন্তি এমএসএন ত্রয়ী। জিতলেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা, ক্লাব বিশ্বকাপ। এরপর বিশ্বের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি দিয়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে যোগ দিলেন। সবাই ভেবেছিল, এবার শুরু হবে নেইমারের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য।
কিন্তু ভাগ্য যেন তাঁর জন্য অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম প্রতিভাই শরীরের কাছে এতবার পরাজিত হয়েছে। কখনও পায়ের হাড় ভেঙেছে, কখনও গোড়ালির লিগামেন্ট, কখনও মেটাটারসাল, কখনও হাঁটুর লিগামেন্ট, কখনও দীর্ঘস্থায়ী পেশির চোট। ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর বড় একটি অংশ তাঁকে কাটাতে হয়েছে চিকিৎসাকেন্দ্র, পুনর্বাসন শিবির, জিমনেসিয়াম আর ফিজিওথেরাপির কক্ষে। যখনই মনে হয়েছে, এবার নেইমার পুরোপুরি ফিরেছেন, ঠিক তখনই আরেকটি ইনজুরি এসে সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে।
পরিসংখ্যানও সেই নির্মম গল্পই বলে। ইউরোপে খেলার সময় প্রতি মৌসুমেই তাঁকে অসংখ্য ম্যাচ মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও দীর্ঘ সময় ছিটকে থাকতে হয়েছে চোটের কারণে। আধুনিক ফুটবলে প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় তিনি বছরের পর বছর ছিলেন শীর্ষে। তাঁর ওপর হওয়া প্রতিটি ট্যাকল শুধু শরীরকে নয়, ধীরে ধীরে ক্ষয় করেছে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকুও।
২০১৪। নিজের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ। কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ানের স্বপ্নের কেন্দ্র ছিলেন নেইমার। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হুয়ান জুনিগার হাঁটুর আঘাতে তাঁর মেরুদণ্ডে চিড় ধরে। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার সময় তাঁর চোখের জল শুধু একজন ফুটবলারের ছিল না; সেটা ছিল একটি দেশের ভেঙে পড়া স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। কয়েক দিন পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাঁকে দেখতে হয়েছিল জার্মানির কাছে ব্রাজিলের সেই অবিশ্বাস্য ৭–১ পরাজয়।
ইতিহাসে 'যদি' শব্দের কোনো স্থান নেই। তবু প্রশ্ন জাগে—নেইমার যদি সেই ম্যাচে মাঠে থাকতেন, ফল কি একই থাকত? নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু এটুকু বলা যায়, ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস, আক্রমণের ধার এবং প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলেন তিনি। তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি ছিল না; সেটা ছিল পুরো দলের মানসিক ভরকেন্দ্র হারিয়ে ফেলা। তারপরও তিনি ফিরলেন।
২০১৮ সালে আবার স্বপ্ন নিয়ে। ২০২২ সালে আবার লড়াই। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে যে গোলটি তিনি করেছিলেন, সেটি ব্রাজিলকে সেমিফাইনালের খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সব বদলে গেল। টাইব্রেকারে পরাজয়। হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদতে থাকা নেইমারের সেই ছবি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময় ছবিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
মানুষ তাঁর ড্রিবলের চেয়ে অনেক বেশি মনে রেখেছে পড়ে যাওয়াকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁকে বানিয়েছে অসংখ্য মিমের বিষয়। 'ডাইভার', 'অভিনেতা', 'নাটকবাজ'—কত তকমাই না জুটেছে! অথচ খুব কম মানুষ ভেবে দেখেছে, যে খেলোয়াড় প্রতিনিয়ত প্রতিপক্ষের সবচেয়ে কঠিন ট্যাকলের লক্ষ্যবস্তু হন, তাঁর শরীর কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। প্রতিটি আঘাত শুধু হাড়ে লাগে না; আত্মবিশ্বাসেও লাগে। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় ভয় হলো, নিজের শরীর আর নিজের শিল্পকে সমর্থন করবে কি না।
২০২৩ সালে আল হিলালে যোগ দেওয়ার পর এল আরও বড় ধাক্কা। হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। অনেকেই বললেন, এটাই শেষ। ত্রিশের পর এমন চোট কাটিয়ে আগের ছন্দে ফেরা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নেইমার অন্যরকম। তিনি ফিরে গেলেন নিজের শিকড়ে—স্যান্টোসে। যেখানে সবকিছুর শুরু। আবার শরীরকে বিশ্বাস করতে শিখলেন। আবার চোট পেলেন। আবার ফিরলেন। হয়তো 'আবার' শব্দটাই নেইমারের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে তাঁর সময় ছিল খুবই অল্প। তবু সেই কয়েক মিনিটেই মনে হচ্ছিল, বহুদিন নিভে থাকা এক আতশবাজির বুকের ভেতর জমে থাকা আগুনে কেউ আবার স্ফুলিঙ্গ ছুঁইয়ে দিয়েছে। এক ঝলক। এক মুহূর্ত। কিন্তু সেই আলোই বুঝিয়ে দিল, প্রতিভা কখনও পুরোপুরি নিভে যায় না। নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করছিলেন। তারপর এল সেই পেনাল্টি। নেইমারের চেনা ছোট ছোট পা ফেলা। এক মুহূর্তের বিরতি। তারপর নিখুঁত শট। বল জালে জড়িয়ে যেতেই মনে হলো, শেষবারের মতো জেগে উঠল 'জোগো বোনিতো'। যেন বলটাই বলল—আমি এখনও ব্রাজিল।
কিন্তু সব কিংবদন্তি ট্রফি হাতে নিয়েই বিদায় নেন না। কেউ কেউ এমন এক আলোর রেখা রেখে যান, যা নিভে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন মানুষের চোখে ভাসতে থাকে।
আমরা প্রায়ই সাফল্যকে ট্রফি দিয়ে মাপি। অথচ ইতিহাস বারবার বলে, ট্রফি একজন খেলোয়াড়ের অর্জনকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না। জোহান ক্রুইফ, ফেরেঙ্ক পুসকাস কিংবা পাওলো মালদিনির মতো কিংবদন্তিদের উত্তরাধিকারও কেবল বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। ফুটবল শেষ পর্যন্ত শুধু জয়ের খেলা নয়; সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা এবং মানুষের কল্পনাশক্তিকে স্পর্শ করারও খেলা। সেই জায়গায় নেইমার তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা শিল্পী।
আমাদের জীবনেও তো এমন হয়। একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা, একটি চাকরির সাক্ষাৎকারে না হওয়া, একটি ব্যবসার পতন, একটি সম্পর্কের সমাপ্তি—এসবের পর আমরা প্রায়ই ভাবি, সব শেষ। নেইমারের জীবন যেন প্রতিদিন উল্টো কথাটাই বলে। শেষ মানেই শেষ নয়। যতক্ষণ নিজের ওপর বিশ্বাস আছে, ততক্ষণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও বেঁচে থাকে।
বিশ্বকাপে সাফল্যের অপূর্ণতা হয়তো তাঁকে আমৃত্যু তাড়া করবে। হয়তো সেটাই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। কিন্তু সব অপূর্ণতা ব্যর্থতা নয়। কিছু অসমাপ্ত গল্পই মানুষের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।
নেইমার নিজের মতো করেই পথ হেঁটেছেন। প্রশংসা ছিল। সমালোচনা ছিল। হাসি ছিল। অশ্রুও ছিল। কিন্তু তিনি থামেননি। যদি কোনো বিশেষ কারণে আবার অবসর ভেঙে না ফেরেন, তাহলে হয়তো এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ—ট্রফির জন্য নয়, অদম্য মানসিকতার জন্য; শিরোপার জন্য নয়, প্রত্যাবর্তনের জন্য; জয়ের জন্য নয়, হার না মানার জন্য।
নেইমার এক অপার বিস্ময়। বল পায়ে তাঁর সৃজনশীলতা, সংকীর্ণ জায়গায় প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা পাস, এক মুহূর্তে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার সামর্থ্য—সমসাময়িক ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড়ের মধ্যেই এত স্বাভাবিকভাবে মিলেছে। তিনি ছিলেন শিল্পীত ফুটবলের এক নিপুণ কারিগর; এমন এক শিল্পী, যার প্রতিটি স্পর্শে দর্শক বিস্মিত হয়েছে।
তিনি হয়তো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। কিন্তু ভেঙে পড়েও কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, সেই শিক্ষা তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে লিখে দিয়েছেন। আর কিছু শিক্ষা থাকে, যা যেকোনো ট্রফির চেয়েও বড়। নেইমারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো একটি সোনালি কাপ নয়; বরং এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করা যে, মানুষের মহত্ত্ব কেবল তার জয়ে নয়, বরং প্রতিটি পতনের পর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহসেই লুকিয়ে থাকে।
চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

