গত রাতটি ছিল মেসি ও সালাহ, দুই জাদুকরের যৌথ মহাকাব্য
ফুটবলের দুই জাদুকরের জয়ের লড়াইয়ে হেরে গেলেন সালাহ !
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম
ফুটবল কখনো কখনো এমন এক নাট্যকার, যার শেষ দৃশ্য লেখা থাকে শেষ বাঁশিরও পরে। আটলান্টার রাতে সেটিই আবারও প্রমাণ করল আর্জেন্টিনা ও মিশর। ইতিহাসের দরজায় কড়া নেড়েও শেষ পর্যন্ত ভেতরে ঢুকতে পারল না আফ্রিকার প্রতিনিধি মিশর। দুই গোলে এগিয়ে থেকেও তারা হারল ৩–২ ব্যবধানে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি—যার নামের পাশে "অসম্ভব" শব্দটি বহু আগেই পরাজিত হয়েছে।
শুরুটা অবশ্য ছিল পুরোপুরি মিশরের। বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে যায় মিশরের হাতে। মেসি, রদ্রিগো ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টাররা ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মিশর যেন দাবাড়ুর মতো প্রতিটি চাল আগেভাগেই ভেবে রেখেছিল। নিজেদের অর্ধে সুশৃঙ্খল প্রতিরক্ষা, আর সুযোগ পেলেই বিদ্যুৎগতির পাল্টা আক্রমণ।
সেই পরিকল্পনার প্রথম পুরস্কার আসে কর্নার থেকে। ইয়াসের ইব্রাহিমের শক্তিশালী হেডে স্তব্ধ হয়ে যায় স্টেডিয়াম। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১–০ গোলে এগিয়ে যায় মিশর।
গোল হজম করার পর যেন জেগে ওঠে আর্জেন্টিনা। মেসি আরও নিচে নেমে এসে খেলার ছন্দ তৈরি করতে থাকেন। আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টারদের নিয়ে একের পর এক আক্রমণ গড়ে ওঠে। ২১ মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত। পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। গ্যালারির হাজারো চোখ তখন মেসির বাঁ-পায়ের দিকে।
কিন্তু সেদিন প্রথমবারের মতো নায়ক হন মোস্তাফা শোবেইর। দুর্দান্ত ঝাঁপিয়ে তিনি ঠেকিয়ে দেন মেসির শট। এক মুহূর্তে বদলে যায় ম্যাচের আবহ। আর্জেন্টিনার হতাশা, মিশরের উল্লাস—দুটি বিপরীত আবেগ একই ফ্রেমে ধরা পড়ে।
প্রথমার্ধের শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা আক্রমণ করেছে, কিন্তু মিশরের রক্ষণ ছিল পাথরের দেয়াল। প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি ক্লিয়ারেন্স, প্রতিটি সেভে আফ্রিকার দলটি যেন নিজেদের বিশ্বাস আরও শক্ত করেছে। বিরতিতে স্কোরলাইন বলছিল—আক্রমণে এগিয়ে আর্জেন্টিনা, কার্যকারিতায় এগিয়ে মিশর।
দ্বিতীয়ার্ধে সেই গল্প আরও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। আরেকটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মিশর। স্কোরবোর্ডে তখন ২–০। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা যেন অতল গহ্বরে।
কিন্তু মহাতারকারা ঠিক তখনই নিজেদের পরিচয় দেন, যখন সবাই ভাবতে শুরু করে গল্প শেষ। মেসি সেই পরিচয়ই আবার দিলেন। আর্জেন্টিনা ফিরে এল। এক গোল, দুই গোল, তারপর তৃতীয় গোল। শেষ বাঁশি বাজার সময় স্কোরবোর্ডে লেখা—আর্জেন্টিনা ৩, মিশর ২। ইতিহাস লেখার কলমটি শেষ পর্যন্ত থেকে গেল আলবিসেলেস্তেদের হাতেই।
তবে এই ম্যাচের সৌন্দর্য কেবল নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে নয়। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল দুই যুগের, দুই দর্শনের, দুই মহাদেশের দুই ফুটবল জাদুকরের মুখোমুখি হওয়া—লিওনেল মেসি ও মোহামেদ সালাহ।
ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও মেসি যেন ফুটবলকে নতুন নতুন ভাষা শেখাচ্ছেন। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা—আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রায় সব শিখর তিনি স্পর্শ করেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে দুই শতাধিক ম্যাচ, শতাধিক গোল, অগণিত অ্যাসিস্ট আর অসংখ্য স্মরণীয় রাত—সব মিলিয়ে তিনি এখন আর শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি নিজেই একটি যুগের নাম।
অন্যদিকে সালাহ সেই বিরল তারকাদের একজন, যিনি তুলনামূলক ছোট ফুটবল শক্তির একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। লিভারপুলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগসহ ইউরোপের প্রায় সব বড় ট্রফি জেতা এই ফরোয়ার্ড গত এক দশকে ধারাবাহিকতার আরেক নাম। তার গতি, ড্রিবলিং, বাঁ-পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং এবং নেতৃত্ব তাকে আধুনিক আফ্রিকান ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত করেছে।
দলগত সাফল্যে আর্জেন্টিনা ও মিশরের দূরত্ব অনেক। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রভাবের বিচারে সালাহ কখনোই মেসির আলোয় ম্লান হয়ে যান না। একজন বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন, অন্যজন প্রমাণ করেছেন প্রতিভার কোনো ভূগোল নেই।
আজকের ম্যাচে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা, পরাজিত হয়েছে মিশর। কিন্তু এই ম্যাচ হারিয়ে সালাহ ছোট হননি; বরং আরও বড় হয়ে উঠেছেন তার লড়াইয়ের জন্য। আর মেসি? তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন, কিংবদন্তিরা বয়স দিয়ে নয়, মুহূর্ত দিয়ে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করেন।
শেষ পর্যন্ত এটি শুধু একটি নকআউট ম্যাচ ছিল না। এটি ছিল দুই মহাতারকার উত্তরাধিকার, শিল্প, অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক অনন্য সন্ধ্যা। স্কোরবোর্ড বলবে আর্জেন্টিনা জিতেছে। কিন্তু ফুটবল স্মরণ রাখবে—এই রাতটি ছিল মেসি ও সালাহ, দুই জাদুকরের যৌথ মহাকাব্য।
মন্তব্য করুন

