Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

আমিকার কাব্রালের কেপ ভার্দে তার মিরাকল জারি রাখুক

বিশ্বকাপ বিবিধ

আমিকার কাব্রালের কেপ ভার্দে তার মিরাকল জারি রাখুক

Icon

রিয়াদুস সালেহীন জাওয়াদ

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

কেপ ভার্দের এই পর্যন্ত আসাটাই একটা আপসেট। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দেশটা স্পেনের সাথে ড্র করবে এবং প্রথমবারেই নক-আউট রাউন্ডে কোয়ালিফাই করবে— এটা তো আশ্চর্যের ব্যাপার বটেই। 

কেপ ভার্দের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৪ জনেরই জন্ম অন্য দেশে। বাকি খেলোয়াড়রাও কেউ দেশে থাকেন না, অন্য দেশে ফুটবল খেলেন। ইন ফ্যাক্ট কেপ ভার্দের বেশিরভাগ নাগরিক নিজেদের দেশেই থাকেন না, অন্যান্য দেশে প্রবাসী জীবন কাটান। 

জনসংখ্যার এই অদ্ভুত অংকের কারণটা খুব সোজাঃ কেপ ভার্দের কোনোদিন একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার কথাই ছিলো না। তবুও একজন মানুষ সেই চেষ্টা করসিলেন, আর সেই চেষ্টার মূল্য হিসেবে তাকে নিজের জীবন দিতে হইসিলো। 

১৪৫৫-৫৬ সালের দিকে পর্তুগিজরা যখন প্রথম বর্তমান কেপ ভার্দে আবিষ্কার করে, তখন সেখানে কোনো জনবসতি ছিলো না। থাকার কোনো কারণও ছিলো না। 

দেশটার আবহাওয়া প্রচণ্ড গরম এবং শুষ্ক, বৃষ্টি হয় না বললেই চলে। অগ্নুৎপাতের কারণে সৃষ্টি হওয়া দ্বীপগুলোর মাটি অত্যন্ত পাতলা, সেখানে ফসল চাষ বা পশু পালন— কোনোটাই সম্ভব না।  

কৃষি কাজে পর্তুগিজদের আগ্রহ এম্নিতেও ছিলো না, তাদের ধান্দা ছিলো ক্রীতদাস ব্যবসা। পর্তুগাল থেকে কিছু সেটলার আনা হলো, আর তাদের ফাই-ফরমাশ খাটার জন্য আফ্রিকা জাহাজ ভরে আনা হলো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের। ধীরে ধীরে কেপ ভার্দে পর্তুগালের ক্রীতদাস ব্যবসার সাপ্লাই চেইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে লাগলো। 

আফ্রিকা থেকে মানুষদের নিয়ে আসা হতো কেপ ভার্দেতে। সেখানে তাদের “গুদাম”-এর মধ্যে আটকে রাখা হতো, তারপর সময়মতো নিলাম করে ক্রেতাদের কাছে তুলে দেওয়া হতো। 

শত শত বছর এই প্রক্রিয়া চলতে থাকায় কেপ ভার্দেতে তৈরি হইসিলো এক নতুন ধরণের জনগোষ্ঠীঃ ক্রিওল বা মিক্সড; পর্তুগিজ এবং আফ্রিকান জিন, সংস্কৃতি এবং ভাষার মিশ্রণ। 

কেপ ভার্দের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে পর্তুগিজদের আরেকটা উপনিবেশ ছিলো, এখন আমরা সেই দেশটাকে গিনি-বিসাউ নামে ডাকি। অনেক ক্ষেত্রে গিনি-বিসাউ ছিলো কেপ ভার্দের মুদ্রার অপর পিঠ। বিশাল জনসংখ্যা, উর্বর জমি এবং নদীকেন্দ্রিক সমাজের কারণে শুরু থেকেই দেশটা ছিলো কৃষিপ্রধান। 

তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিলো দুই দেশের মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে। 

কেপ ভার্দের ক্রিওলরা ছিলেন সরাসরি পর্তুগালের নাগরিক। তারা সরকারি খরচে প্রাথমিক শিক্ষা পাইতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ ছিলো। তারা চাইলে সরকারি বা বেসরকারি চাকরি করতে পারতেন। 

অন্যদিকে গিনির মানুষের এই ধরণের কোনো অধিকার ছিলো না। পর্তুগালের প্রজা হিসেবে তাদের দিতে হতো বাধ্যতামূলক শ্রম, ছিলো না শিক্ষা বা চাকরির কোনো সুযোগ। তাই গিনি-বিসাউ এর প্রশাসন, শিক্ষা বা চিকিৎসা সেক্টরে ক্রিওলদেরই আধিপত্য ছিলো। 

এই অবস্থাতেই ১৯২৪ সালে গিনি-বিসাউতে জন্ম নেন আমিকার কাব্রাল; যদিও তার বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন কেপ ভার্দের লোক। তাদের ডিভোর্সের পর ৫ বছর বয়সে কাব্রাল মায়ের সাথে কেপ ভার্দেতে ফিরে আসেন। 

সে সময় দেশটিতে ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ চলছিলো, অনুর্বর কেপ ভার্দেতে প্রায়ই দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতেন। কিন্তু শৈশবের এই অভিজ্ঞতা কাব্রালের পুরো চিন্তার জগৎ ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। 

১৯৪৫ সালে কাব্রাল পর্তুগালে পাড়ি জমান কৃষি নিয়ে পড়তে। লিসবনের বিরোধী দল এবং পর্তুগিজ কমিউনিস্টদের সাথে খাতির জমানোর পর অন্যান্য আফ্রিকান ছাত্রদের নিয়ে তিনি তৈরি করেন “আফ্রিকান স্টাডিজ সেন্টার”। 

১৯৫২ সালে সরকারি চাকরি নিয়ে আমিকার কাব্রাল গিনি-বিসাউতে ফিরে আসেন। ফিরেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনি একটা দেশব্যাপী কৃষি জরিপ করেন। ৫ মাস পুরো দেশ ঘুরে, প্রায় ২২০০ কৃষক পরিবারের সাথে দেখা করে তিনি তথ্য জোগাড় করেন। কাব্রালের রাজনীতির থিওরি এবং বাস্তবায়ন— দুইটারই ভিত্তি ছিলো এই জরিপটা।  

একই সাথে তিনি পুরো দেশে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজ করছিলেন। সেটা টের পেয়ে ১৯৫৫ সালে পর্তুগিজ পুলিশ তাকে গিনি-বিসাউ থেকে তাড়িয়ে দেয়। বছরখানেক অ্যাঙ্গোলাতে থাকার পর তিনি আবারও গোপনে দেশে ফিরে আসেন, সৎভাই লুই কাব্রাল-সহ মাত্র ছয় জনকে নিয়ে তৈরি করেন আফ্রিকান পার্টি ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ গিনি অ্যান্ড কেপ ভার্দে, সংক্ষেপে PAIGC। 

দুই দেশকে কেন একত্রে স্বাধীন করা লাগবে? কাব্রালের যুক্তি ছিলো সোজা। কেপ ভার্দের একটা শিক্ষিত, দক্ষ মধ্যবিত্ত প্রফেশনাল ক্লাস আছে; নাই জমি আর জনসংখ্যা। অন্যদিকে গিনি-বিসাউতে জমি বা জনসংখ্যা থাকলেও শিক্ষা বা প্রশাসনিক অবকাঠামোর অভাব। 

যদি দুইটি দেশ আলাদা আলাদাভাবে স্বাধীনতা পায়, তাহলে কোনোটিই সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি হতে পারবে না। বরং দুই ভূখণ্ড এক হলেই কেবল একটি আসল স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করা সম্ভব ছিলো। 

গেরিলাদের সাথে আমিকার কাব্রাল

শুরুতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পরিকল্পনা থাকলেও পর্তুগিজরা শ্রমিকদের ধর্মঘটে গুলি চালিয়ে ৫০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করার পর কাব্রাল সশস্ত্র যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি একই সাথে গিনির গভীর জঙ্গলে ক্যাম্প বানানো, সামরিক এবং রাজনৈতিক ট্রেনিং দেওয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আফ্রিকান দেশের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করার কাজ চালাতে থাকেন। 

‘৬৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো এক হাজার গেরিলা নিয়ে তার বাহিনী যুদ্ধ শুরু করে। বছর দুয়েকের মধ্যে PAIGC একটি দেশটির দুই-তৃতীয়াংশ পর্তুগিজ দখলমুক্ত করে মুক্তাঞ্চল তৈরি করে। তবে কাব্রাল বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু জমি দখল করে কলোনাইজারদের হারানো যাবে না।  

তাই PAIGC-এর মুক্তাঞ্চলে, যেখানে ১% মানুষেরও অক্ষরজ্ঞান ছিলো না, সেখানে গড়ে তোলা হয় দেড়শোর বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাথে তৈরি করেন ৬টি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল এবং ১২০টি পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক। আর এই কাজে কাব্রালের সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন গিনির সাধারণ মানুষ। 

তারা স্কুলের টিচারদের খাওয়াতেন, থাকতে দিতেন। হাসপাতালের ডাক্তার এবং রোগিদের জন্য খাবার সরবরাহ করতেন ফ্রি তে। প্রায় ৫ বছর কাব্রাল একটি রাষ্ট্রের সমান্তরালে জনগণের জন্য আরেকটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এই মানুষগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে PAIGC-এর কৌশল ছিলো সোজাঃ "Tell no lies, claim no easy victories"। 

এদিকে পর্তুগিজরা তখন রাগে বদ্ধ উন্মাদ। এক কৃষিবিদের গেরিলা বাহিনী তাদের পেশাদার সেনাবাহিনীকে এমনভাবে হারিয়ে দেবে, সেটা তারা ভাবে নাই। ১৯৭০ সালে পর্তুগাল তার সমস্ত সামরিক শক্তি নিয়ে PAIGC-এর সদর দপ্তরে হামলা চালালে গেরিলারা সেটা রুখে দেন। বাধ্য হয়ে তারা কৌশল পরিবর্তন করেন। 

১৯৭২ সালে কাব্রাল PAIGC-এর সকলের কাছে একটি বার্তা পাঠান। তাতে লেখা, পর্তুগিজ গোয়েন্দারা পার্টির ভেতরে অনুপ্রবেশ করেছে, নেতাদের জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। কিন্তু তবুও কাব্রাল নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে করেন নাই। 

তার এক বছরের মাথায় পার্টির মধ্যে গুপ্ত পর্তুগিজ এজেন্টরা আমিকার কাব্রালকে তার নিজের বাসার দরজায় গুলি করে হত্যা করে। 

ততদিনে কেপ ভার্দে এবং গিনি-বিসাউয়ের স্বাধীনতা অনিবার্য হয়ে পরেছিলো। কিন্তু কাব্রালের স্বপ্ন— দুইটি ভূখন্ডকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার ভিশন আর পূরণ করা যায় নাই। 

সে কারণেই আজকে কেপ ভার্দের অধিকাংশ মানুষ প্রবাসী জীবন কাটাতে বাধ্য হন। আর গিনি-বিসাউ? সেটা আজকেও আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র এবং অস্থিতিশীল রাষ্ট্রের একটা। 

আমিকার কাব্রালের কেপ ভার্দে তার মিরাকল জারি রাখুক, এই বিশ্বকাপের সিন্ডারেলা স্টোরি আরও দীর্ঘ হোক!

মন্তব্য করুন

Logo