Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

জাপানের জন্য শোকগাথা

বিশ্বকাপ বিবিধ

জাপানের জন্য শোকগাথা

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম

খেলায় হারজিত আছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও এখানেই। শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কেউ জানে না, কার স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, কারটা থেমে যাবে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে একটি দল বিদায় নিলে স্কোরবোর্ডের সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে অন্য এক হিসাব, অসমাপ্ত স্বপ্নের হিসাব।

এই যে, ব্রাজিলের কাছে জাপান হেরে বিদায় নিল। ফলাফল লিখে রাখবে ইতিহাস। কিন্তু সেই এক লাইনের আড়ালে চাপা পড়ে যাবে কত বছরের প্রস্তুতি, কত নির্ঘুম রাত, কত অগণিত অনুশীলন। খেলোয়াড়দের ঘাম, কোচদের কৌশল, চিকিৎসকদের পরিশ্রম, বিশ্লেষকদের অসংখ্য ভিডিও দেখা, মাঠকর্মীদের যত্ন, আর হাজার মাইল দূরে বসে থাকা কোটি সমর্থকের নীরব প্রার্থনা- সব যেন এক মুহূর্তে থেমে যায়।

শেষ বাঁশি বাজে। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কেউ মুখ ঢাকে জার্সিতে। কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন উত্তর খুঁজছে। ক্যামেরা অবশ্য বেশিক্ষণ সেখানে থাকে না। সে ছুটে যায় বিজয়ীদের উল্লাসে। ইতিহাসও তাই করে। বিজয়ীদের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লিখে রাখে, পরাজিতদের গল্প ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়।

ফুটবল বড় নির্মম। এখানে সবাই স্মরণীয় হয় না। যে জেতে, সে কিংবদন্তি। যে হারে, সে প্রায়শই একটি পরিসংখ্যান। অথচ পরাজিতদের মধ্যেও কত বীরত্ব, কত সাহস, কত অসমাপ্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। চার বছর পর আবার সুযোগ আসে। কিন্তু সবার জন্য নয়। কারও বয়স বেড়ে যায়। কারও শরীর আর সাড়া দেয় না। কেউ জাতীয় দল হারায়। কেউ নীরবে অবসর নেয়। তাই একটি শেষ বাঁশি অনেকের কাছে শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়; সেটিই হয়ে ওঠে পুরো ফুটবল জীবনের শেষ বাক্য।

তবু পরাজয়ের মধ্যেও এক ধরনের মহিমা আছে। কারণ যে দল হেরে যায়, তারাও শেষ পর্যন্ত লড়াই করে। তারাও স্বপ্ন দেখে। তারাও নিজেদের পতাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তুলে ধরে। বিজয়ীরা ট্রফি নিয়ে বাড়ি ফেরে। পরাজিতরা ফিরিয়ে নিয়ে যায় কোটি মানুষের ভালোবাসা, অশ্রু আর অপূর্ণতার ভার।

সম্ভবত এ কারণেই বিশ্বকাপের প্রতিটি বিদায় আমাদের একটু বিষণ্ন করে। কারণ আমরা জানি, একটি দলের হার মানে শুধু একটি ম্যাচের শেষ নয়। শেষ হয়ে যায় বহু বছরের অপেক্ষা, অগণিত ত্যাগ আর অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত স্বপ্নের একটি অধ্যায়।

আচ্ছা, পরাজয় কি মৃত্যুরও এক প্রতিচ্ছবি?

মৃত্যু যেমন একটি জীবনের সমাপ্তি, নকআউট পর্বের পরাজয়ও তেমনি একটি স্বপ্নের মৃত্যু। কেউ মারা গেলে স্বজনেরা কাঁদে। একটি দল হেরে গেলে সমর্থকদের চোখও ভিজে ওঠে। কারণ মানুষ স্কোরলাইনের জন্য কাঁদে না। কাঁদে সেই মানুষগুলোর জন্য, যারা নিজেদের সবটুকু দিয়ে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরে যায়।

শেষ বাঁশির সঙ্গে শুধু ম্যাচ শেষ হয় না। শেষ হয়ে যায় অগণিত প্রার্থনা, অনুশীলন, ত্যাগ আর ভবিষ্যতের কত রঙিন কল্পনা। ড্রেসিংরুমে নেমে আসে এক ধরনের নীরবতা, যা কোনো ভাষায় লেখা যায় না। হয়তো কোনো জার্সি আর কখনও বিশ্বকাপের আলো দেখবে না। কোনো জোড়া বুট আর কোনো জাতীয় সংগীতের আগে মাঠে পা রাখবে না। তাই পরাজয়ের কান্না আসলে একটি অসমাপ্ত গল্পের কান্না।

হয়তো এ কারণেই অপরিচিত এক দেশের খেলোয়াড়ের চোখের জলও আমাদের অস্থির করে তোলে। সেই অশ্রু মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি খুব সাধারণ- সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। আবার ভেঙে পড়ে। আবার উঠে দাঁড়ায়।

সম্ভবত এখানেই পরাজয়ের গভীরতম সৌন্দর্য। জয় মানুষকে ট্রফি দেয়, পরাজয় মানুষকে মহত্ত্ব দেয়। জয় ইতিহাস লেখে, পরাজয় লিখে মানবতার গল্প। তাই বিশ্বকাপের প্রতিটি বিদায় শুধু একটি দলের নয়। সেটি আমাদের সবার জন্যই এক টুকরো শোকগাথা।

মন্তব্য করুন

Logo