Logo

৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

বিশ্বকাপ বিবিধ

শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

Icon

শুভ্র মিসির

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের এবারের আসর নানা কারণেই অন্য যে কোনোবারের চেয়ে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা, তিন দেশ মিলেয়ে আয়োজন, খেলোয়াড়সহ দর্শকদের ভিসা প্রাপ্তিতে নানা বিধি নিষেধ, অভিবাসী খেলোয়াড়দের আধিক্য, মাঠের খেলায়ও নতুন নতুন নিয়মসহ আছে বলবার মতো অনেক কিছুই। তবে এর বাইরে কয়েকটি দলের বেশ কয়েকজন ফুটবলার রয়েছেন যাদের শৈশব কেটেছে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী জীবনের মধ্য দিয়ে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১১৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত, যার মধ্যে প্রায় ৪৯ মিলিয়ন শিশু। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই কিছু শিশু, যারা একসময় শরণার্থী শিবিরে বড় হয়েছিল কিংবা পরিবারসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিল, তারাই আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে নিজেদের জন্মভূমি নয় বরং যেখানে বেড়ে উঠেছে সেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। আবার কয়েকজন এমনও আছেন যারা শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছেন নিজের জন্মভূমিকেই।

কানাডার আলফনসো ডেভিস: শরণার্থী শিবির থেকে জাতীয় নায়ক

প্রথমেই বলতে হয় কানাডা জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক আলফনসো ডেভিসের কথা, যার শিকড় গাথা লাইবেরিয়ায়। জন্মেছিলেন এমন এক সময়ে যখন চারিদিকে ছিল গোলা আর বারুদের গন্ধ। ক্ষমতার দ্বন্দে ১৯৮৯ সালে শুরু হয় প্রথম লাইবেরিয়ান গৃহযুদ্ধ। ১২ বছরব্যাপি এ গৃহযুদ্ধে নিহত হয়েছেন প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ আর বাস্তুচ্যুতি ঘটেছিলো আরো কয়েক লাখের। এমনই এক পরিবারে জন্ম ডেভিসের। যুদ্ধের সময় বাড়িঘর হারিয়ে নিজ দেশ ছেড়ে ডেভিসের বাবা-মা ঠাঁই নিয়েছিলেন ঘানার বুদুবুরাম শরণার্থী শিবিরে। সেখানে ২০০০ সালে জন্ম নেয় আলফনসো ডেভিস। এখানেই কাটে শৈশবের পাঁচটি বছর। এরপর ডেভিসের পরিবার স্থানান্তরিত হয় কানাডার এডমন্টন শহরে।

ছবি: কানাডা জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক আলফনসো ডেভিস

নতুন দেশে পরিবারটির মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না, তবে ছোটবেলা থেকেই ডেভিস ফুটবলের প্রতি ছিলেন দারুণ অনুরক্ত। স্থানীয় ক্লাব এবং স্কুলের হয়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক খেলা থেকে তার প্রতিভা দ্রুত নজরে আসে সবার। এরপর পেশাদার ফুটবলে নাম লিখিয়ে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক ও উইঙ্গারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নিজেকে। তার নেতৃত্তে ইতোমধ্যে কানাডা নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলয় স্থান করে নিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার তিন যুদ্ধশিশু যখন দলের প্রাণভোমরা

২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার দলে খেলছেন এমন তিনজন রয়েছেন যারা উঠে এসেছেন আফ্রিকার ভিন্ন তিন যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ থেকে। তারা হলেন মোহাম্মদ তুরে, আউয়ার মাবিল ও নেস্টরি ইরানকুন্ডা—যাদের জীবনকাহিনি প্রায় একই সূত্রে গাঁথা।

মোহামেদ তুরে

মোহাম্মদ তুরের জন্ম ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গিনির রাজধানী কনাক্রির একটি শরণার্থী শিবিরে। তুরের পরিবার মূলত লাইবেরিয়ার বাসিন্দা ছিলেন। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে পরিবারটি দেশ ছেড়ে গিনিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেখানে তারা প্রায় ১৪ বছর শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটান।

ছবি: অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় মোহাম্মদ তুরে 

তুরের জন্মের কয়েক মাস পর, ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে এ পরিবারটি মানবিক কর্মসূচির আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসিত হয়। এরপর তারা দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে বসবাস শুরু করে। নতুন দেশ, সংস্কৃতি আর বাস্তুচ্যুতির পোড়ন ভুলতে তুরে বেছে নেন ফুটবল। অ্যাডিলেডের পাড়ার মাঠ থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তুরের এই যাত্রা তার সংগ্রামী জীবনের গল্পই

আউয়ার মাবিল 

আওয়ার মাবিলের শৈশব আধুনিক ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়। ১৯৯৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর কেনিয়ার বিখ্যাত কাকুমা রিফিউজি ক্যাম্পে জন্ম মাবিলের। তার পরিবার দক্ষিণ সুদানে গৃহযুদ্ধের কারণে নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। জন্মের আগেই তার বাবা-মা নিরাপত্তার খোঁজে কেনিয়ায় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। শরণার্থী শিবিরের জীবন ছিল কঠিন—খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার ছিল না নিশ্চয়তা। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে দেশ ছাড়লেও পরিবারটির নতুন জীবনও ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। ২০০৬ সালে, মাবিলের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তার পরিবার মানবিক পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় অস্ট্রেলিয়ায় চলে যায়।

ছবি: অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় আউয়াল মবিল

অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর ফুটবল মাবিলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। স্থানীয় ক্লাব ও স্কুল পর্যায়ের খেলায় অংশ নিয়ে তিনি দ্রুত নজর কাড়েন। ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অস্ট্রেলিয়াকে মূলপর্বে তুলতে মাবিলের ছিল দারুণ অবদান। এবারও খেলছেন অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেই।

নেস্টরি ইরানকুন্ডা

নেস্টরি ইরানকুন্ডার জন্ম ২০০৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তানজানিয়ার কিগোমা অঞ্চলের একটি শরণার্থী শিবিরে। তার বাবা-মা ছিলেন বুরুন্ডির নাগরিক। দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার কারণে তারা দেশ ছেড়ে তানজানিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। জন্মের অল্প সময় পরই পরিবারটি মানবিক পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হয়। শৈশবে ইরানকুন্ডা ফুটবলের পাশাপাশি রাগবিতেও আগ্রহী ছিলেন। তবে খুব অল্প বয়সেই ফুটবলে তার অসাধারণ প্রতিভা ধরা পড়ে। তিনি স্থানীয় ক্লাবগুলোর হয়ে খেলে পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির ক্লাব ফুটবলে নাম লেখান।

ছবি: অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় নেস্টরি ইরানকুন্ডা

এরপর প্রথমবারের মতো ডাক পান ২০২৬ বিশ্বকাপে। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ড্র করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে গোল করে তিনি দেশটির ইতিহাসে বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে রেকর্ড বইয়ে নাম লেখান। মাত্র ২০ বছর বয়সে তার এই কীর্তি তাকে ভবিষ্যতের অন্যতম তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

যুদ্ধে দেশ ছেড়ে ফের নিজ দেশেই বসনিয়ার ডেমিরোভিচ ও বেগোভিচ

এরমেদিন ডেমিরোভিচ

বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফুটবল দলের অন্যতম প্রাণভোমরা এরমেদিন ডেমিরোভিচ। তার শৈশব অন্য অনেকের মতো সরাসরি শরণার্থী শিবিরে কাটেনি, তবে তার পরিবারের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বসনিয়ার যুদ্ধের সঙ্গে। ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ জার্মানির হামবুর্গ শহরে জন্ম ডেমিরোভিচের। তার বাবা নিহাত ডেমিরোভিচ বসনিয়া-হার্জেগোভিনার মানুষ ছিলেন। ১৯৯২ সালে বসনিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে তিনি জার্মানিতে চলে আসেন। ফলে পরিবারটি যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পায়। যদিও স্বদেশের সঙ্গে কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি তাদের সম্পর্ক। শৈশব থেকেই ডেমিরোভিচের স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়া। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই দেখান প্রতিভার ঝলক।

ছবি: বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফুটবল দলের খেলোয়াড় এরমেদিন ডেমিরোভিচ

এরপর জার্মানির বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। ডেমিরোভিচের সুযোগ ছিল জামার্নির জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর। কিন্তু নিজের শিকড় ভুলেননি তিনি। নিজ দেশকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে তুলতে ডেমিরোভিচের ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেও দারুণ খেলে দলকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তুলতে করেছেন সহযোগীতা।

আসমির বেগোভিচ

আসমির বেগোভিচের শৈশব কেটেছিল যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং নতুন জীবনের সন্ধানে। ১৯৮৭ সালের ২০ জুন তিনি যুগোস্লাভিয়ার অংশ থাকা বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ট্রেবিনিয়ে শহরে জন্ম তার। কিন্তু আনন্দের শৈশব খুব বেশিদিন স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৯২ সালে বসনিয়া যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিবার নিরাপত্তার খোঁজে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। যুদ্ধের সময় বেগোভিচ পরিবারের প্রথম আশ্রয় ছিল জার্মানি। সেখানে কয়েক বছর উদ্বাস্তু হিসেবে কাটানোর পর তারা কানাডায় চলে যায়। কানাডার এডমন্টনে বেড়ে ওঠার সময় তিনি বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ছবি: বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফুটবল দলের খেলোয়াড় আসমির বেগোভিচ

ছোটবেলায় ফুটবলের পাশাপাশি বাস্কেটবলও খেলতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফুটবলকেই বেছে নেন। দীর্ঘকায় গঠন আর ক্ষিপ্রতা দিয়ে বেগোভিচ অল্প সময়ের মধ্যে গোলকিপার হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। খেলেছেন কানাডাসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশের ক্লাব ফুটবলে। কানাডায় বড় হয়ে উঠলেও নিজের শিকড়কে কখনো ভুলে যাননি বেগোভিচ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাই নিজ জন্মভূমিকেই বেছে নেন। ২০১৪ সালে বসনিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ দলে ছিলেন তিনি আর এবার দেশের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অভিযানেরও অংশ হয়েছেন তিনি।

জার্মানির রুডিগার: এক অভিবাসী পরিবারের সন্তান

আন্তোনিও রুডিগারের শৈশবের গল্প অভিবাসন, সংগ্রাম এবং কঠোর পরিশ্রমের এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৯৩ সালের ৩ মার্চ তিনি জার্মানির বার্লিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন জার্মান এবং মা ছিলেন আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের নাগরিক। রুডিগারের জন্মের কিছুদিন আগে সিয়েরা লিওনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, ফলে তার মায়ের পরিবার যুদ্ধের ভয়াবহতার স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছিল। বার্লিনের সাধারণ একটি এলাকায় বেড়ে ওঠেন রুডিগার। ছোটবেলা থেকেই তিনি ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব সমৃদ্ধ না হলেও তার মা-বাবা সবসময় তাকে খেলাধুলায় উৎসাহ দিয়েছেন। রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা ছিল তার শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। শিশুকালে রুডিগার ছিলেন প্রতিযোগিতাপ্রবণ। মাঠে তিনি কখনো হার মানতে চাইতেন না। এই মানসিকতাই পরে তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারে পরিণত করেছে।

ছবি: জার্মানি দলের সদস্য আন্তোনিও রুডিগার

স্থানীয় কয়েকটি ক্লাবের যুব একাডেমিতে খেলে নিজের দক্ষতা বাড়ান। কিন্তু অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে অনেক বৈষম্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তবে এসব বাধাকেই যেন নিজের শক্তিতে পরিণত করেন রুডিগার। তার মায়ের মুখ থেকে শোনা সিয়েরা লিওনের যুদ্ধ এবং পরিবারের সংগ্রামের গল্প শুনে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে জীবনে পাওয়া সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যে ছেলেটি বার্লিনের রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলত, সেই রুডিগার পরবর্তীতে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর হয়ে খেলেছেন এবং জার্মানির জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য একজন হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন।

মন্তব্য করুন

Logo