Logo

৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

সংগ্রাম আর স্বপ্নজয়ের জীবন্ত প্রতীক

ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দ, ছবি: ইন্টারনেট

বিশ্বকাপ বিবিধ

গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দ

সংগ্রাম আর স্বপ্নজয়ের জীবন্ত প্রতীক

Icon

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১০:৩০ পিএম

ক্রীড়াঙ্গনে অনেক সাফল্যের গল্প আছে, কিন্তু কিছু গল্প শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে জয় করার অনুপ্রেরণাও হয়ে ওঠে। ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দের জীবনকাহিনি তেমনই এক অনন্য উদাহরণ।

বিশ্বকাপ মাঠে শক্তিশালী বেলজিয়ামের একের পর আক্রমণ এক রুখে দিয়ে প্রশংসা আর আলোচনায় গোলরক্ষক আলীরেজা। ম্যাচে তিনি একাই সাতটি সেভ করেন, যার মধ্যে একটি সেভকে অনেকেই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেভ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে মাঠের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে আলীরেজার দীর্ঘ সংগ্রাম, দারিদ্র্য এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক গল্প।

আলীরেজার জন্ম একটি যাযাবর পরিবারে। শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। তার পরিবার কোনো শহরে বসবাস করতো না, ছিল চরম দরিদ্রতা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি নিজেকে একটি সংকল্পে আবদ্ধ করেছিলেন—যেভাবেই হোক, সফল হতে হবে।
সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে একসময় বন্ধুদের সঙ্গে তিনি রাজধানী তেহরানে চলে যান। পরিবারকেও জানাননি কোথায় যাচ্ছেন। নতুন শহরে এসে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, ছিল না নিশ্চিত কোনো আয়।

সেই সময় ভাগ্য খুলে যায় এক কোচের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে। হুসেইন ফাইজ নামের এক কোচ তাকে ট্রায়াল দেওয়ার সুযোগ করে দেন। আলীরেজা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি দলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু চুক্তি পেলেও জীবনযুদ্ধ শেষ হয়নি।

এক সহখেলোয়াড়ের পরিবারের পোশাক কারখানায় তিনি কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে কাজের পাশাপাশি রাত কাটানোর ব্যবস্থাও হয়েছিল। কিছু পকেট খরচের বিনিময়ে তিনি কঠোর পরিশ্রম করে দিন পার করতেন। পরবর্তীতে নাফতে তেহরান ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করলেও আবাসনের সংকট কাটেনি। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আলীরেজা বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে তিনি কখনো লজ্জা পাননি; বরং যারা এ কাজ করেন তাদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কারণ তারা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সেবক।

তবে সেই সময়টা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। ফুটবলে নিজের জায়গা করে নিতে তিনি প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছেন। সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছেন, নিজেকে প্রমাণ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তার বিশ্বাস, জীবনের প্রতিটি ঘটনা ছিল মহান সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার অংশ।

কঠিন সময় পেরিয়ে ধীরে ধীরে তিনি দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের সমর্থন ও উৎসাহ পেতে শুরু করেন। একসময় আসে বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত—ইরান জাতীয় দলে প্রথমবারের মতো ডাক পান তিনি। তখন তিনি নাফতে তেহরানের হয়ে খেলছিলেন।

আজ আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলীরেজা পরিচিত নাম হলেও অতীতের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা তিনি কখনো ভোলেননি। বরং সেই সংগ্রামই তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। আলীরেজার ভাষায়, জীবনের প্রতিকূলতা অতিক্রম করার এই যাত্রা তাকে নিজের কাছেই একটি আদর্শে পরিণত করেছে।

দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, কারখানার শ্রমিকের কাজ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্ব—সবকিছু পেরিয়ে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর এই গল্প প্রমাণ করে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতাও একসময় সাফল্যের সোপানে পরিণত হতে পারে। আলীরেজা বেইরানভান্দ তাই শুধু একজন গোলরক্ষক নন; তিনি সংগ্রাম আর স্বপ্নজয়ের জীবন্ত প্রতীক।

মন্তব্য করুন

Logo