Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

মরুকরণের পদধ্বনি শুনি

ফিচার

মরুকরণের পদধ্বনি শুনি

Icon

মুহাম্মদ আবদুর রহমান

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৩:০১ পিএম

রুক্ষ ভূমি—শুষ্ক, অনুর্বর ও প্রাণহীন। যেখানে হারিয়ে গেছে মাটির উর্বরতার স্তর, সেখানে যেন আধিপত্য বিস্তার করেছে শক্ত ও কঠিন মৃত্তিকার আস্তরণ। সেই ভূমিতে সবুজের সমারোহ কল্পনা করাও কঠিন। খরা ও মরুকরণের প্রভাবে মাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার উৎপাদনক্ষমতা; উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য পড়ে অস্তিত্বের সংকটে।

শরীফুজ্জামান রাজশাহীর একটি বিলাঞ্চল ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন ২০০৩ সালে। মাছ ধরেই একসময় জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। বিল শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষিজমির উৎপাদনও কমে গেছে। প্রায় প্রতি বছরই খরার কবলে পড়ে এলাকা। ফলে জীবিকার সন্ধানে তাঁকে পাড়ি জমাতে হয়েছে রাজধানীতে। তাঁর গ্রামের আরও অনেক মানুষও আজ ঢাকার প্রান্তিক জনপদে নতুন জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন।

ঢাকার ভাসমান মানুষের মধ্যে রয়েছেন সবজি বিক্রেতা সালাম মিয়াও। যশোরের চৌগাছা উপজেলার কৃষক ছিলেন তিনি। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। তাঁর ভাষায়, জমি আগের মতো ফলন দেয় না, গরম বেড়েছে, পানির স্তর নেমে গেছে। সেচের ব্যয় বাড়ছে, অথচ উৎপাদন কমছে। ফলে কৃষিকাজ ছেড়ে জীবিকার নতুন পথ খুঁজতে হয়েছে তাঁকে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পাবনা, নওগাঁ, বগুড়া ও দিনাজপুরের অনেক এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই খরা ও পানিসংকটের বাস্তবতা অনুভব করছেন। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চল এবং মধুপুর গড় এলাকায় পরিবেশবিদরা কয়েক দশক ধরে ভূমির আর্দ্রতা হ্রাস ও মরুকরণের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। 

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদ-ব্যবস্থার বহমান পলিমাটি যুগে যুগে গড়ে তুলেছে বাংলাদেশের এই উর্বর বদ্বীপ। শত শত নদ-নদী এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশীর্বাদ থাকা সত্ত্বেও নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমির অবক্ষয় ও মরুকরণের প্রবণতা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, বন উজাড় এবং কৃষিজমির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে।

ফারাক্কা-তিস্তা সমস্যাসহ বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে পানি প্রত্যাহার, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়া, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকটকে আরও তীব্র করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ফলে অনেক নদী-খাল শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। 

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান প্রায় ২০°৩৪′ থেকে ২৬°৩৮′ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। দেশের জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিগত বৈচিত্র্যের কারণে অঞ্চলভেদে মরুকরণের ঝুঁকিও ভিন্ন। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও পানিসংকট ভূমির অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। অনেক এলাকায় বছরে চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম বিরাজ করে।

একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জৈব উপাদানের ঘাটতির কারণে মাটির গুণগত মান কমছে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণের ফলে অনেক কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। অতিরিক্ত নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। গত কয়েক দশকে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার মতো দুর্যোগ দেশের পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এসব দুর্যোগের ফলে ভূমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র।

মরুকরণের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ে বাস্তুসংস্থানের ওপর। উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীল জীবজগতের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। অনেক এলাকায় গাছপালার ঘনত্ব কমছে, সংকুচিত হচ্ছে প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বন উজাড়, অপরিকল্পিত কৃষিকাজ ও অতিচারণের ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। মধুপুর গড়ের বনাঞ্চল যেমন ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে, তেমনি সুন্দরবনে বাড়ছে লবণাক্ততার প্রভাব। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক ঝুঁকির সম্মুখীন।

মরুকরণ কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও। কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা সংকুচিত হওয়ায় বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। গ্রাম ছেড়ে মানুষ ছুটছে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের দিকে। ফলে নগরায়ণের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রতি বছর ১৭ জুন পালিত হয় মরুকরণ ও খরা মোকাবিলায় জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব দিবস। দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মরুকরণ কোনো দূরবর্তী হুমকি নয়; এটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বহু অঞ্চলের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সময় থাকতে এই সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করছি এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি? 

মুহাম্মদ আবদুর রহমান: পরিচালক, সেন্টার ফর পিপল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট


মন্তব্য করুন

Logo