Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

চলতি পলিটিক্যাল ইকোনমি এবং আসন্ন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ-অধ্যায়

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

চলতি পলিটিক্যাল ইকোনমি এবং আসন্ন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ-অধ্যায়

আলতাফ পারভেজ

আলতাফ পারভেজ

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১২ পিএম

সমাজে কেন সাংস্কৃতিক যুদ্ধ লাগানো হয় তার উত্তর পাওয়ার একটা পথ হলো এরকম বড় বড় উস্কানির আগে-পরের পলিটিক্যাল-ইকোনমির ইভেন্টগুলো খেয়াল করা। এটা অনেকে জানেনও নিশ্চয়ই। সেই সূত্রে বাংলাদেশের সামনে ক্রমাগত আরও সাংস্কৃতিক বাহাসের উস্কানি আসতে পারে সামনে। যার কারণ স্পষ্টত অর্থনীতি। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিয়ে নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুমানগুলো বেশ উদ্বেগজনক। সংকটের চোরাস্রোত অনেকদিন থেকে বইছিল। বিগত মাস ও বছরগুলোতে সেগুলো আরও বাড়তি গতি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। কুলীন সমাজ এবং তাদের সহায়ক ফোর্সগুলোর সামনে এখন পরিস্থিতি সামলাতে বিশ্বাস ও সংস্কৃতির বিবাদের আয়োজনই ভরসা।

খ্যাতনামা অনেক সংস্থা বলছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ বা এর কাছাকাছি নেমে আসতে চলেছে। অন্তত আন্তর্জাতিক কোন সংস্থা এটা ৪ এর বেশি বলছে না। ঠিক এরকম সময়ে আবার মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের উপরে উঠবে বলা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের কথা, প্রায় সব থিংকট্যাংক বলছে শিগগির এরকম অবস্থা থেকে উদ্ধার নেই।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমতে থাকার মানে বেকারি বাড়া, আয় ও সঞ্চয় কমা। আর, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সংসার খরচ বাড়ে, সঞ্চয়ে টান পড়ে, ক্রয় ক্ষমতা কমে। উভয় প্রবণতার মানে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবন সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি রশিতে বাঁধা পড়েছে। কত জোরে টানা হবে রশি তার উপর নির্ভর করছে কার কতটুকু ছিঁড়ে যাবে। সমাজে আবেগীয় টুনার্মেন্টগুলোর আয়োজন ও স্পন্সরশিপের জন্য এটাই ভালো সময়। সেগুলো জরুরিও বটে। যাকে ইংরেজিতে বলা যায় ‘ডিস্ট্রাকশন প্রজেক্টস্’। এতে মানুষের মনযোগ তার সংকটের উৎস ও কারণ থেকে সরিয়ে রাখতে সুবিধা হয়। সেসময় স্বস্তি ও শান্তির জন্য সঠিক করণীয়ের বদলে সাময়িক তৃপ্তিকর নানান ফানুসের পেছনে ছোটানো হয় তাদের। 

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

বিবিধ ডিস্ট্রাকশন দুরবস্থার শিকার মানুষকে নানান উপদলে ভাগ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। একসঙ্গে বসে ঠান্ডা মাথায় তারা দুর্দশার সঠিক কারণও খুঁজতে পারে না। জনতার দুর্দশার মাঝেই কোন কোন মহল তরতাজা থাকে বা নতুন করে তরতাজা হয়ে ওঠে। ডিস্ট্রাকশন বা মনযোগ ঘোরাতে এরকম ক্ষেত্রে কী কী ঘটে তার বৈশ্বিক নজির বিপুল। বিশ্বাসের সংঘাত বাধানো থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদী উম্মাদনা তৈরির অনেক কলাকৌশলের খোঁজ পড়ে এরকম সময়ে।

বাংলাদেশে অত্যাধুনিক কলাকৌশলের দরকার হয় না। পুরানো মডেলেই অনেক বড় বড় ফাঁড়া পার হয়ে যায় এখানে কুলীন সমাজ। বিশ্বব্যাংক ইদানিং জানাচ্ছে, বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে প্রায় আশি লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে গেছে। খেয়াল করুন, এই সময়টা সাংস্কৃতিক যুদ্ধের কেমন বাড়বাড়ন্ত ছিল এখানে। ছাগল চুরি থেকে ওড়না পর্যন্ত কত কী বিশাল বিশাল ইভেন্টের ভেতর দিয়ে নেয়া হলো আমাদের। তার মাঝেই খেলারামরা খেলছিল। 

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি এও জানালো, বাংলাদেশে তথাকথিত ভর্তুকির অন্যতম প্রধান খাত কৃষিসারের বেলায় ৫০ ভাগই যায় ২০ শতাংশ বড় ল্যান্ডলর্ডের কাছে। পুরো অংকটা অনেক বড়। এসব কথা দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বললে তার কপালে জুটতো কেবল ‘বামপন্থী’ ট্যাগ এবং খানিকটা মবও হয়তো। কিন্তু এখন যখন বিশ্বব্যাংক বলছে তখন সেটা ইংরেজি কাগজের লিড নিউজ হলো।

কৃষি-ভুর্তকি- সুবিধার এরকম খবর প্রকাশের দিনই দেখলাম ব্যাংক খাত নিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে সেই ‘ক্ষতি’ পোষাতে জনগণের কোষাগার থেকে বছরে ওদিকে এখন ৬০ হাজার কোটি করে দিতে হবে কয়েক বছরে। অর্থাৎ, লুটপাটের কয়েন যাবে একদিকে--সাজা যাবে জনগণের দিকে। 

দৈনিন্দিন অর্থনীতির বিপরীতমুখী রশি টানার মাঝে বাঁধা পড়ে থাকাদের চোখের সামনে দিয়ে এরকম সব ব্যাপার এগিয়ে নিতে নিশ্চিতভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর মাঠে আনতে হবে একে একে নাটক-নভেল-সঙ্গীত জগতের অন্যদের কল্পিত নানান ত্রুটিকথা কিংবা নারীদের কোন ইস্যু, কিংবা কোন উৎসবের সহিত্ব বা পরিচয়ের বিবাদ. …কিংবা আরও পিলে চমকানো ষড়যন্ত্রের কোন স্ক্রিপ্ট বা অন্য কোন সফট টার্গেট। মিডিয়ার কোলাহলে পড়ে সমাজের একাংশ যেমন এসব বিবাদে আগ্রহ ভরে যুক্ত হয়—অন্য অংশ আবার তাতে ভয়ে সংকুচিত হয়। উভয়তেই সাংস্কৃতিক যুদ্ধের উদ্যোক্তা ও স্পন্সরদের লাভ। অন্তত পলিটিক্যাল ইকোনমির জায়গা থেকে তো বটেই। 

মন্তব্য করুন

Logo