Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

স্বাধীনতা কন্যাশিশুর অধিকার

ছবিঃ দৈনিক বাঙলার জাগরণ পেইজ থেকে

মত-দ্বিমত

স্বাধীনতা কন্যাশিশুর অধিকার

দীপু মাহমুদ

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

গত ৮ অক্টোবর কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ধানখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার এক অটোরিকশাচালক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। একজন কিশোরীর বাড়ি ফেরার পথে এমন পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মেয়েদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আটকে আছে। এই ঘটনা বাংলাদেশে কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একজন কিশোরী স্কুলে যায়, পড়াশোনা করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। অথচ তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কতটা, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

গতকাল ছিল বিশ্ব কন্যা দিবস। ২০২৬ সালের এই দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করুন’। জাতিসংঘের এই আহ্বান আমাদের সামনে শুধু বাল্যবিবাহ বন্ধের প্রশ্নই রাখে না, এর সাথে বাংলাদেশের মেয়েরা কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

বাংলাদেশের মেয়েরা আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। তারা খেলাধুলা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও পেশাগত জীবনে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। পরিবারের আয় বাড়াতে, অর্থনীতিতে অবদান রাখতে এবং সামাজিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতেও মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এই অগ্রগতি বাস্তব এবং তা স্বীকার করা জরুরি। কিন্তু অগ্রগতির আরেকটি হিসাব আছে। একজন মেয়ে কতদূর পড়াশোনা করতে পারছে। কতখানি নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে। নিজের পছন্দমতো তার আগামীর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার মতামত কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে- এসব প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর ছাড়া এই সময়ে কন্যাশিশুর পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে না।

মেয়েদের অগ্রগতি আর মেয়েদের স্বাধীনতা এক বিষয় নয়। একজন মেয়ের কোনো বাধা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া তার অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত কর‍তে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। আর সেই অধিকার চর্চার স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে।


অগ্রগতির পাশাপাশি যে বাস্তবতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) কন্যাশিশুদের পরিস্থিতি বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাদের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে বর্তমানে বিবাহিত ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

পরিসংখ্যান থেকে শুধু বিয়ের বয়স সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাই নয়, এগুলো বহু মেয়ের শৈশব, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের অবতারণা করেছে। একজন মেয়ের বিয়ে যখন তার শৈশবেই ঠিক হয়ে যায়, তখন তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, নিজ সিদ্ধান্তে পেশা বেছে নেওয়া অথবা পছন্দমতো নিজ জীবন গড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাল্যবিবাহের পরিণতি শুধু সামাজিক অনুষ্ঠানে অল্প বয়সে বিয়ে করার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা, আর্থিক নির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।

এখানে দারিদ্র্যের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। একই গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে দরিদ্রতম পরিবারের ৬৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় সত্য। কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেই সমস্যার অবসান হয় না।

দরিদ্র পরিবারের কাছে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ, যাতায়াতের অসুবিধা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বড় ধরনের বিবেচনা হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, সচ্ছল পরিবারেও সামাজিক প্রত্যাশা, মেয়ের বিয়ে নিয়ে প্রচলিত ধারণা এবং পারিবারিক কর্তৃত্ব তার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলে। এখানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মেয়েদের সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার সুযোগ, নাকি নিজ আগামী তৈরি করার অধিকার

বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আর নিজের সক্ষমতা বিকাশের মতো শিক্ষা পাওয়া এক নয়। শিক্ষাজীবন শেষ করা, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন, প্রয়োজনীয় দক্ষতা গড়ে তোলা এবং সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ- সবকিছুকেই শিক্ষার সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখা দরকার।

একজন মেয়ে পরীক্ষায় বিদ্যালয়ে ভালো ফল করল। সে বিজ্ঞানী হতে চায়, শিক্ষক হতে চায়, উদ্যোক্তা হতে চায় কিংবা এমন কোনো পেশায় যেতে চায়, যা তার পরিবারের সদস্যদের মানসিক পরিধির আওতায় নেই। তখন তার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় সমন্বিত সহযোগিতা। বিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার। মানসম্মত শিক্ষা। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। নিরাপদ যাতায়াত। পরিবারের সমর্থন এবং কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে মেয়েদের শিক্ষা চলমান রাখতে বাধা আসে শিক্ষার কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে। এটা খানিকটা বাঁকে এসে থমকে পড়ার মতো। কোথাও আর্থিক সংকট, কোথাও বিদ্যালয়ের দূরত্ব, কোথাও নিরাপত্তার উদ্বেগ, আবার কোথাও বিয়ের চাপ তাদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে দেয়। প্রতিবন্ধী মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রবেশগম্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপযোগী শিক্ষা উপকরণ ও সহায়ক সেবার অভাব বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

আমার পিএইচডি থিসিসের ভিত্তিতে এই বিষয়টি এনেছিলাম, মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগের সাফল্য শুধু কতজন বিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, তা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। দেখতে হবে, কতজন শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারল, কতজন প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করল এবং কতজন নিজেদের পছন্দের আগামী গড়ার সুযোগ পেয়েছে।

রিসার্সে যা পেয়েছি তা হচ্ছে, এখানে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের ভালো ফলাফলে গর্ব করা আর তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা আলাদা বিষয়। একজন কিশোরী কী পড়বে, কোথায় পড়বে, কখন বাড়ি ফিরবে অথবা আগামীরে সে কোন পেশায় যেতে চায়- এসব বিষয়ে অভিভাবকের উদ্বেগ স্বাভাবিক। তবে উদ্বেগের সমাধান যদি হয় মেয়ের চলাফেরা ও পছন্দের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা, তাহলে সেই সুরক্ষা মেয়ের বিকাশের অধিকারকে সংকুচিত করে দেয়। যা হচ্ছে।

নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নয়

বাংলাদেশে মেয়েদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি প্রায়ই তাদের চলাফেরার স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘাতে আসে। কোনো মেয়ে পথে হয়রানির শিকার হলে তাকে পথ বদলাতে বলা হয়। সন্ধ্যায় বাইরে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে তার কোচিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানির ঘটনা ঘটলে অনেক সময় ভুক্তভোগীর চলাফেরা, পোশাক কিংবা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

এখানে মৌলিক প্রশ্নটা তোলা দরকার: নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি প্রতিবেদনে লালমনিরহাটে মেয়ের প্রতি হয়রানির প্রতিবাদ করায় একজন বাবাকে মারধরের ঘটনা এবং নোয়াখালীতে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে কেন্দ্র করে অভিযোগ দায়েরের পর তার পরিবারের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জুনে বগুড়ায় মেয়ের হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের প্রস্তাবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক বাবার নিহত হওয়ার ঘটনার কথাও বলা হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে মেয়েকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এটা হতে পারে না। নেভার এভার। হয়রানির অভিযোগ জানানোর সহজ ও গোপনীয় ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগকারী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই দায়িত্ব পালন না করে মেয়েকে সতর্ক করার মানেই হচ্ছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করা অববা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।

একজন মেয়েকে নিরাপদ রাখার অর্থ তাকে পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। পৃথিবীতে তার নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একজন মেয়েকে গুডের জালার ভেতর ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে আড়ালে রাখা যাবে না। তার চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তার চলাফেরা যেন অন্যের অসদাচরণের জন্য সংকুচিত হয়ে না পড়ে- সেই দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের। নিতেই হবে।

ডিজিটাল জগৎও মেয়েদের অধিকারক্ষেত্র

আজকের কিশোরীদের জীবন শুধু বাড়ি, বিদ্যালয় ও খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্টারনেট তার শেখার, যোগাযোগের, সৃজনশীলতা প্রকাশের এবং নিজ আগ্রহ অনুসারে বিভিন্ন জগতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছে। কিন্ত এর ভেতর লখিন্দরের বাসর ঘরে সাপ ঢুকে পড়ার মতো অনলাইন হয়রানি, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

নাকের ব্যথায় নাক কেটে ফেলে দেওয়ায় মতো যুক্তিও শুনতে হয়। তারা ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে মেয়েদের ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার সহজ সমাধান দিয়ে দিচ্ছেন। তার মানে মেয়েদের শেখা, তথ্য পাওয়া ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার হীন নকশা। হীরক রাজার দেশের সেই সংলাপ "এরা যত জানে, তত কম মানে। তাহলে এর বিপরীতে প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। 

একই সঙ্গে কিশোরীদের দক্ষ করে তুলতে হবে কীভাবে অনলাইন ঝুঁকি শনাক্ত করতে যায়, কীভাবে সহায়তা চাইতে হয় এবং কীভাবে নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করে যেতে হয়। এসব দায়িত্ব শুধু মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মানে তাকে পাজেলড করে ছিটকে ফেলা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে হয়রানির শিকার হলে একজন কিশোরী ভয়ে চুপ কিরে না থেকে সহযোগিতা চাইতে পারবে।

ডিজিটাল জগতে অংশগ্রণ বিকাশের অংশ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ে তাদের সেই অংশগ্রহণের ব্যবস্থা স্থায়ী করতে হবে। 

জলবায়ু সংকটের অভিঘাতও মেয়েদের জীবনে

কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, অতিরিক্ত তাপ এবং ভিটেমাটি হারানো শুধু পরিবারের আয় ও বাসস্থানের ওপর প্রভাব ফেলে না। এ সমস্ত ঘটনা মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকারও বাধাগ্রস্ত করে।

২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের State of the World's Girls সিরিজের গবেষণা এ ব্যাপারে নতুন তথ্য সামনে এনেছে। ৫২টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের তিন দশকের স্বাস্থ্য ও জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ, কেনিয়া, পেরু, সেনেগাল ও জিম্বাবুয়ের ৫ হাজার কিশোরী ও তরুণীর ওপর জরিপ এবং ১৩৯ জনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মেয়েদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-সেবায় প্রবেশের সুযোগ ব্যাহত করে এবং বাল্যবিবাহ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশের নদীভাঙনপ্রবণ, উপকূলীয় ও দুর্যোগকবলিত এলাকার বাস্তবতায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার ঘরবাড়ি হারালে বা জীবিকার সংকটে পড়লে মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকলে, যাতায়াতের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা নিরাপদ থাকার জায়গা না থাকলে মেয়েদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। এসব পরিস্থিতিতে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

তাই দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয় ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজনের বাজেট ও পরিকল্পনায় কিশোরীদের প্রয়োজন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যে মেয়ে জলবায়ু সংকটের কারণে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হারায়, তার ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়। দেশও তার অবদান থেকে বঞ্চিত হয়।

অধিকার মানে নিজের কথা

কন্যাশিশুর অধিকারকে শুধু নির্যাতন থেকে সুরক্ষা কিংবা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একজন শিশুর মতামত প্রকাশ, নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং বয়স ও পরিপক্বতা অনুযায়ী তার মতামতের গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার আছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১২ অনুচ্ছেদে এই নীতি স্বীকৃত হয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের সব সিদ্ধান্ত একাই নিতে হবে কিংবা অভিভাবকের দায়িত্ব থাকবে না। শিশুকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার কথা শুনতে হবে, তার অভিজ্ঞতা ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সিদ্ধান্তের কারণ তাকে বোঝাতে হবে।

একজন কিশোরী নিজের পড়াশোনা নিয়ে মতামত দিচ্ছে, পরিবারের সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছে, বিদ্যালয়ের পরিবেশ সম্পর্কে অভিযোগ জানাচ্ছে কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিকল্পনা করছে- এসবকে অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে বিকাশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পরিবারে এই চর্চা শুরু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তার প্রতিফলন ঘটবে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ, নিরাপত্তা, পাঠক্রম, খেলাধুলা কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিশোরীদের মতামত নেওয়া জরুরি। স্থানীয় সরকার ও শিশু সুরক্ষাবিষয়ক উদ্যোগেও তাদের অংশগ্রহণের অধিকার থাকতে হবে।


বিনিয়োগের অর্থ শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়

বিশ্ব কন্যা দিবসের ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যে কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এই বিনিয়োগকে শুধু শিক্ষা বা সামাজিক সুরক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এর মধ্যে আছে মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল, ডিজিটাল সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ।

প্রথমত, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের শনাক্ত করে তাদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বহনে অক্ষম পরিবারকে সহায়তা না দিয়ে শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার অর্থনৈতিক ভিত্তি অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। ঝরে পড়া মেয়েদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, যৌন হয়রানি ও সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর পর মেয়ে যেন নতুন করে অপমান, সামাজিক চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চতুর্থত, মেয়েদের বিষয়ে সরকারি কর্মসূচি ও বাজেটের ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কতজন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, তার পাশাপাশি কতজন পড়াশোনা সম্পন্ন করেছে, কতজন বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেয়েছে, কতজন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে এবং অভিযোগের প্রতিকার কতটা কার্যকর হচ্ছে- এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।

কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় মেয়েদের নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা না শুনে তাদের জন্য পরিকল্পনা তৈরি করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা অদৃশ্য থেকে যাবে।

মেয়েরা এগোবে, নিজের শর্তে

বাংলাদেশের মেয়েদের অগ্রগতির ঘটনায় গর্ব করার মতো অনেক কিছু আছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির মূল্যায়ন করতে হবে তাদের জীবনের বাস্তব স্বাধীনতা দিয়ে। একজন মেয়ে কতটা পড়তে পারল, কতটা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারল, কতটা নিজের পছন্দের পেশায় যেতে পারল এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্ব পেল- এসব প্রশ্ন একজন মেয়ের এজেন্সি লেভেলের সমৃদ্ধি হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

একজন কন্যাশিশুকে ভালো ফল করতে হবে, প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে- সমাজের এই প্রত্যাশাগুলোর সঙ্গে তার নিজের আকাঙ্ক্ষা ও পছন্দেরও মূল্য দিতে হবে। মেয়েদের সাফল্য শুধু পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে তাদের নিজের জীবনকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী গড়ে তোলার অধিকারও আছেছে।

বাল্যবিবাহ বন্ধ করা জরুরি, কিন্তু শুধু বিয়ে ঠেকিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এরপর সেই মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে কিনা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা, সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভবিষ্যৎ গড়তে পারছে কিনা- সেসব প্রশ্নের উত্তরের নিশ্চয়তা জরুরি। আবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিবাহিত মেয়েদের আর প্রতিষ্ঠানে ফেরত আসতে দেয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি বললাতে হবে। একইভাবে, মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো যেমন জরুরি, তেমনি তাদের শেখার পরিবেশ, দক্ষতা অর্জন এবং পরবর্তী জীবনে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে যখন তার নাগরিকেরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে। কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নেই। একজন মেয়ে কেবল ভবিষ্যতের মা, স্ত্রী কিংবা পরিবারের দায়িত্ব পালনকারী নয়। সে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অধিকারসম্পন্ন একজন মানুষ, যার বর্তমান জীবন, আকাঙ্খা ও পছন্দের নিজস্ব মূল্য আছে।

গতকালের বিশ্ব কন্যা দিবসের কথা মনে রেখে আমাদের অঙ্গীকার শুধু মেয়েদের সুরক্ষা দেওয়া কিংবা তাদের এগিয়ে যাওয়ার অধিকারটুকু তৈরি করা নয়। সেই অধিকার বাধাবিঘ্নমুক্তভাবে কাজে লাগানোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও। এমন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মেয়েকে নিরাপত্তার নামে নিজের আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিতে হবে না, দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষা থেকে সরে যেতে হবে না, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে শৈশব হারাতে হবে না এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মতামত জানানোর জন্য শাস্তি পেতে হবে না।

কন্যাশিশুর অধিকার মানে শুধু তার বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা ও সুরক্ষিত থাকা নয়। কন্যাশিশুর অধিকার মানে তার নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলার স্বাধীনতাও। সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন

Logo