Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

বিপন্ন শিশুর শৈশব ও নিরাপত্তা

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

কাভার স্টোরি

বিপন্ন শিশুর শৈশব ও নিরাপত্তা

দীপু মাহমুদ

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২১ পিএম

শিশুর হাতে বই থাকার কথা ছিল, থাকার কথা ছিল রঙিন পেনসিল, খেলনা কিংবা স্বপ্নের খাতা। তার চোখে থাকার কথা ছিল পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কারের কৌতূহল। অথচ সেই শিশুই যখন অর্থের বিনিময়ে যৌন শোষণের শিকার হয়, যখন তার শৈশবকে পণ্যে পরিণত করে মুনাফা লোটে অপরাধী চক্র, তখন শুধু শিশুর জীবনই বিপন্ন হয় না, বিপন্ন হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের সভ্যতার দাবিও। যে সমাজ শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কিংবা আধুনিকতার বড়াই শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থবহ!

বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের বাণিজ্যিক যৌন শোষণের ভয়াবহতা নিয়ে সম্প্রতি একাত্তর টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশে আনুমানিক ৩০ হাজার মেয়েশিশু যৌন শোষণ ও পাচারের শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

এই সংখ্যার পেছনে আছে হাজারো অদেখা মুখ, ভেঙে যাওয়া জীবন এবং এমন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যেখানে শিশুর অসহায়ত্বই অপরাধীদের কাছে মুনাফার উপকরণ। কোনো শিশু দারিদ্র্যের কারণে, কোনো শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, কোনো শিশু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে, আবার কোনো শিশু নিজের পরিচিত মানুষের হাতেই শোষণের শিকার হয়েছে। তাদের দুর্দশাকে শুধু নৈতিক অবক্ষয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা একই সঙ্গে মানবাধিকার, জননিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সংকট।

বাংলাদেশের রেজিস্টার্ড ব্রোথেল, অনিবন্ধিত যৌন বাণিজ্যের স্থান, ব্যক্তি মালিকানাধীন হোটেল এবং অন্যান্য পরিবেশে শিশুদের যৌন শোষণের কথা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর জন্ম ও বেড়ে ওঠাই এমন পরিবেশে ঘটে, যেখানে তার পরিবার এবং চারপাশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শোষণের চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। শিশুকে সেই পরিবেশ থেকে নিরাপদে বের করে এনে শিক্ষা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হয়।

শিশু যৌন শোষণের পেছনে দারিদ্র‍্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও একে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রত্যেক শিশু শোষণের শিকার হয় না। আবার সচ্ছল পরিবারের শিশুও নিরাপদ নয়। অপরাধীরা মূলত খোঁজে এমন শিশু, যাদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো নির্ভরযোগ্য মানুষ নেই, যাদের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম, কিংবা যাদের ভয় দেখিয়ে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট, অল্প বয়সে কাজ করতে বাধ্য হওয়া, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, শিশুবিবাহ, গৃহহীনতা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব- এসব পরিস্থিতি শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়। কখনো ভালো চাকরি, কখনো শহরে কাজের সুযোগ, কখনো উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিশুকে বাড়ি থেকে দূরে নেওয়া হয়। পরে সেই প্রতিশ্রুতিই পরিণত হয় প্রতারণার ফাঁদে।

এখানে পরিবারকেও একমাত্র দায়ী করে সমস্যার সমাধান খোঁজা ঠিক হবে না। অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের মধ্যে কোনো পরিবার ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আবার অনেক পরিবার নিজের অজান্তেই প্রতারণার শিকার হতে পারে। কিন্তু কোনো শিশুকে বিক্রি করা, পাচার করা কিংবা শোষণের জন্য হস্তান্তর করার দায় কোনোভাবেই দারিদ্র্যের অজুহাতে আড়াল করা যায় না। অপরাধের দায় অপরাধীরই। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে অর্থের অভাবে কোনো শিশুর শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান কিংবা নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে না পড়ে।

বিশেষভাবে ঝুঁকিতে আছে পথশিশু ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুরা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মানব পাচারবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আনুমানিক ৩৪ লাখ গৃহহীন শিশুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যার সংজ্ঞা ও গণনাপদ্ধতি বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন। তবে বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, রাস্তায় বসবাসকারী কিংবা রাস্তাকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল শিশুদের এক অংশ পাচার, জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি ও অপরাধে ব্যবহার এবং যৌন শোষণের ঝুঁকিতে থাকে। জন্মনিবন্ধন বা পরিচয়পত্র না থাকা, নির্ভরযোগ্য অভিভাবকের অনুপস্থিতি এবং সামাজিক সেবার নাগালের বাইরে থাকা তাদের আরও অসহায় করে তোলে।

শিশু যখন পরিবার হারায়, তখন শুধু তার থাকার জায়গা হারায় না, হারায় বিপদে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ, নিজের পরিচয় প্রমাণের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সামাজিক অবলম্বনও। তাই পথশিশুর সমস্যাকে শুধু ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তাদের নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জন্মনিবন্ধন, পরিচর্যা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ইন্টারনেট শিশুদের শেখা, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে শিশুদের প্রতারণা, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং শোষণের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। অপরাধীরা ভুয়া পরিচয়ে শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, শিশুর ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য সংগ্রহ করে, পরে সেগুলো প্রকাশের ভয় দেখিয়ে শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনলাইনে তৈরি হওয়া সম্পর্ক থেকে বাস্তব জগতের শোষণ ও পাচারের ঘটনাও ঘটে।

এ ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর দায় চাপালে হবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা শেখাতে হবে এমনভাবে, যাতে তারা বিপদের লক্ষণ চিনতে পারে এবং কোনো কিছু ঘটে গেলে ভয় বা লজ্জায় চুপ করে না থেকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কের সাহায্য নিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আন্তদেশীয় পাচারচক্রের মাধ্যমে যৌন শোষণের শিকার হওয়ার ঘটনার উল্লেখ আছে। সেখানে দেখিয়েছে, ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যম অপরাধী চক্রের নিয়োগ ও প্রলুব্ধ করার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

অনলাইন নিরাপত্তার জন্য কয়েকটি ব্যবস্থা অপরিহার্য। শিশুদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগকারী সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা, শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করা, অপরাধের ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং দ্রুত তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অভিযোগ গ্রহণ, ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ এবং আইনসম্মত তদন্তে সহযোগিতার ক্ষেত্রে কার্যকর দায়িত্ব নিতে হবে। তবে নজরদারির নামে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শোষণের শিকার শিশুকে দোষারোপ না করা। কোনো শিশু অনলাইনে কারও সঙ্গে কথা বলেছে, ছবি পাঠিয়েছে কিংবা প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে- এ কারণে তার ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় তার নয়। অপরাধীকে শনাক্ত করা এবং শিশুকে নিরাপদ রাখা- এই দুই দায়িত্বই রাষ্ট্র ও সমাজের।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস জোগায়। তবে শুধু সাজা বাড়ালেই অপরাধ বন্ধ হবে, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত শনাক্তকরণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং বিচারিক নিষ্পত্তি- সবকিছুর সমন্বয় দরকার। প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অপরাধী চক্রের সদস্যদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি থেকে রক্ষা করে প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

শিশু যৌন শোষণের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং শোষণের স্থান বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু উদ্ধারকেই সাফল্যের শেষ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। উদ্ধার হওয়া শিশু কোথায় যাবে? তার পরিবার কি নিরাপদ? পরিবারে ফিরে গেলে আবার শোষণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে কি? তার পড়াশোনা কীভাবে চলবে? মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে সে কি পেশাদার সহায়তা পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া উদ্ধার অভিযান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা। উদ্ধার হওয়া প্রত্যেক শিশুর জন্য ব্যক্তিভিত্তিক সুরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবার অনিরাপদ হলে বিকল্প পরিচর্যা ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এমন কোনো ছবি, নাম, ঠিকানা বা বিবরণ দেওয়া উচিত নয়, যা শিশুকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরতে গিয়ে শিশুর মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে আরও বিপন্ন করা যাবে না। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্ধার হওয়া শিশুর ছবি বা পরিচয় ছড়িয়ে দেওয়াও তার পুনর্বাসনকে কঠিন করে তুলতে পারে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা উচিত। কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, কতজন পাচারের শিকার হচ্ছে, কতজন যৌন শোষণ থেকে উদ্ধার হচ্ছে, কত মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে, কত মামলায় দণ্ড হচ্ছে এবং উদ্ধার হওয়া শিশুরা দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের সহায়তা পাচ্ছে- এসব তথ্য সমন্বিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। তথ্য প্রকাশে শিশুর পরিচয় গোপন রাখতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা সম্পর্কে জনসাধারণকে জানাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। স্কুল, হাসপাতাল, সমাজসেবা কার্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকতে হবে। কোনো শিশু দীর্ঘদিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে, নির্যাতনের লক্ষণ দেখা গেলে কিংবা নিরাপদ অভিভাবকত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা যেন শিশুর ওপর অযাচিত নজরদারি বা দরিদ্র পরিবারের প্রতি বৈষম্যের হাতিয়ার না হয়।

তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে শিশু সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের জন্য খাদ্যসহায়তা, নগদ সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি, নিরাপদ বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসনে বাধ্য হওয়া শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু সাহায্যের অর্থ বাড়ালেই হবে না, প্রকৃত ঝুঁকিতে থাকা পরিবার যেন সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মানব পাচার, শিশু যৌন শোষণ, অনলাইন অপরাধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের তদন্তে বিশেষ প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা ও আন্তসংস্থাগত সমন্বয় প্রয়োজন। অপরাধের সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে পরিচয় বা প্রভাবের কারণে যেন কেউ রেহাই না পায়।

পঞ্চমত, শিশুদের কথা শোনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অনেক শিশু নির্যাতনের কথা জানায় না, কারণ তারা ভয় পায় যে পরিবার তাকে দোষ দেবে, সমাজ তাকে অপমান করবে কিংবা অপরাধী প্রতিশোধ নেবে। বিদ্যালয় ও কমিউনিটিতে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর এবং জরুরি সহায়তার পথ থাকতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে, বিপদে পড়লে সাহায্য চাওয়া লজ্জার নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব হলো তার কথা বিশ্বাসযোগ্যভাবে শোনা এবং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

শিশুদের সুরক্ষার প্রশ্নে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন দরকার। যৌন শোষণের শিকার শিশুকে ‘পতিত’, ‘বিপথগামী’ কিংবা ‘সমাজের কলঙ্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করা শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়, অপরাধীদের আড়াল করারও এক ভয়ংকর উপায়। যে শিশুকে প্রতারণা, ভয়ভীতি, নির্যাতন কিংবা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে শোষণ করা হয়েছে, তার প্রতি সমাজের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত সহমর্মিতা ও সুরক্ষা। লজ্জা অপরাধীর, শিশুর নয়।

গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অপরাধের আড়ালে থাকা চক্র, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা উন্মোচন করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্য যাচাই, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা এবং শিশুবান্ধব ভাষা ব্যবহারের নীতি মেনে চলতে হবে। চটকদার বা চাঞ্চল্যকর শিরোনাম কিংবা শিশুর দুর্দশার দৃশ্য প্রদর্শনের বদলে অপরাধের কাঠামো, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং প্রতিরোধের উপায় সামনে আনা জরুরি।

বাংলাদেশের শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল কোনো একটি মন্ত্রণালয়, পুলিশ বিভাগ কিংবা মানবাধিকার সংগঠনের নয়। এটা রাষ্ট্রের সামগ্রিক দায়িত্ব। পরিবারকে সহায়তা দিতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক থাকতে হবে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে এবং বিচারব্যবস্থাকে ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা করে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুর শৈশব একবার হারিয়ে গেলে তা কোনো সরকারি প্রকল্প, আর্থিক ক্ষতিপূরণ কিংবা আদালতের রায় দিয়ে পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের আগেই শিশুকে সুরক্ষিত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক শিশুর নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার বাস্তবায়ন কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়।

যে দেশে একজন শিশুও পাচারকারী বা যৌন শোষণকারী চক্রের হাতে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, সে দেশের উন্নয়নের হিসাবের পাশে গভীর প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়। আর যখন হাজার হাজার শিশুর জীবন এমন ঝুঁকিতে থাকার কথা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসে, তখন আর নীরব থাকার সুযোগ থাকে না। তখন ঝুঁকিতে থাকা শিশুকে রক্ষা করতে সবাই একসাথে কথা বলতে হয়।

শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা কোনো ঐচ্ছিক প্রকল্প নয়, এটা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনগত দায়। এই দায় পালনে ব্যর্থ হলে তার মূল্য শুধু আজকের শিশুরা দেবে না- দেবে আগামী দিনের পুরো সমাজ।

মন্তব্য করুন

Logo