ছবিঃ প্রতীকী, অনলাইন থেকে সংগৃহীত
জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম
প্রিয় কন্যা, বাংলাদেশে তুমি মানুষ হয়েই জন্মেছিলে, তারপর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র - এই ত্রিভুজের চক্রে পড়ে তোমাকে মেয়ে হয়ে উঠতে হচ্ছে। তোমার পায়ে পায়ে পরানো হচ্ছে শেকল প্রতিদিন। ধর্মের নামে, নিয়মের নামে, শালীনতার নামে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হচ্ছে তোমাকে। ঘর থেকে বের হলেই, একটু চুল খুলে হাটলেই, একটু মন খুলে কথা কইলেই, মরতে হবে। তারপর সেই মৃত্যুর দায়ও ধেয়ে আসবে তোমার দিকেই।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে, সাদা দেয়ালে পানের পিক ফেলে, পথকুকুরকে লাথি মেরে পাশ দিয়ে যাওয়া জিন্স-শাড়ি-টিপ পরা তোমাকে এই দেশের লোকেরাই শালীনতা শেখাবে। আর সবার কথা মানতে মানতে ইটচাপা ঘাসের মতো বর্নহীন ফ্যাকাসে, আর বনসাই বৃক্ষের মত খাটো হয়ে আসবে তোমাদের জীবন। তুমিও, অজান্তেই, অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এই জীবনে। ভাববে, ‘এ-ই নারীর জীবন।‘
না, এ-ই তোমার জীবন না। তোমার এই জীবন, অনন্ত নক্ষত্ররাজি আর মহাকালের মহাযাত্রায় তোমার এই অস্তিত্ব, এ কেবল অন্যকে খুশীকরণ প্রকল্প নয়। এ হচ্ছে তোমার নিজেকে খুশী করার সুযোগ। এই জীবনকে তুমি গ্রহণ করো কন্যা। একে উপভোগ কর। ফুরিয়ে যাওয়ার আগে প্রাণভরে কুড়িয়ে নাও এর অনন্ত মাধুরী।
বিয়ে করতেই হবে, মা হতেই হবে, ভালো বউ হতেই হবে - এইসব সরলরেখার মত ভাবনাকে প্রশ্ন করতে শেখো। ইচ্ছা হলে করবে, ইচ্ছা না হলে করবে না। এরকমই অথবা এর চেয়ে ভয়ানক পৃথিবীতে আরো মানবশিশু নিয়ে এসে তাঁকে বিপদে ফেলবে কি না সেই প্রশ্ন করার সময় এসেছে। সামনে দিন আসছে, ‘কেপারনাম’ নামের লেবানিজ সেই সিনেমাটার মতো, শিশুরা বাবামার বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করবে, দেখে নিও।
সবার আগে নিজেকে ভালোবাসো। এই দেশে সেটা সহজ নয় জানি, তাই, প্রথম স্টেপ হিসাবে, নিজেকে গ্রহণ করে নাও। নিজের চোখ, কান, ঠোঁট, গায়ের রঙ সব যেমন আছে, তেমন ভাবেই তাদেরকে মেনে নাও। তারপর প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ভাবে ভালোবাসো। অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখো না। এই পৃথিবীতে এর আগে তোমার মত কেউ ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও আর কেউ তোমার মতো আসবে না। এই স্বকীয়তাই তোমাকে চিরকালের জন্যে বিশেষ করে দিয়েছে। বিশ্বাস করো- তুমি সত্য, তুমি সুন্দর।
নিজেকে যত্ন করো। এই জীবনে যা কিছু তুমি ভালোবাসো, যে কেউ তোমাকে ভালোবাসে, কেউ থাকবে না, সবাই, সবকিছুই, হারিয়ে যাবে। কেবল সাথে থাকবে তোমার শরীর। শরীর মানেই তুমি। শরীরকে যত্ন করো, সুস্থ রাখো। এর চেয়ে বড় বন্ধু নেই।
বয়স হলে দেখবে এই শরীর কেবল নিজের স্পর্শে পুরোটা সুখী হচ্ছে না। অন্যের স্পর্শ চাচ্ছে। তখন তোমাকে সাবধান হতে হবে। ‘রইদ’ সিনেমায় পাগলি কিভাবে এমনকি স্বামীকেও বুকে লাথি মেরে সরিয়ে দেয় দেখেছ? অমন লাথি মেরে অনাহুত স্পর্শকে সরিয়ে দেবে। আর অপেক্ষা করবে, তোমার এমন ভালোবাসার শরীরে হাত রাখার যোগ্যতা যার আছে,তাঁর জন্য। লক্ষ্মী মায়েরা আমার, ক্ষুধা পেলেই নর্দমার উপর বসে, ময়লা প্লেটে খেও না, কেমন?
নিজে যেন উপার্জন করতে পারো তাঁর জন্যে এখনই প্রস্তুতি নাও। তুমি তো কেবল বাংলাদেশে জন্মাও নি, তুমি পৃথিবীতেও জন্মেছ। টাকা ছাড়া এই পৃথিবীকে দেখবে কেমন করে?
আর শোন, বাবাখোর গাঁজাখোর, ফুলছেঁড়া পাতাছেঁড়া, কুকুর-বেড়ালকে লাথিমারা ছেলেদেরকে ভালোবেসে ভালো করে তুলতে যেও না। যে ডুবে যাচ্ছে তাঁকে ডুবতে দাও। তুলতে গেলে সে তোমাকে সহ ডুবে যাবে।
ছোট্ট ডানায় ধরা অনন্ত সূর্যালোক তুমি। বাংলাদেশে জন্মেছ, এ তোমার পাপ নয়। এ তোমার প্রতিবাদ। বাঁচো কন্যা, প্রানভরে বাঁচো, শিকল ছিঁড়ে বাঁচো।
মন্তব্য করুন

