Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

অপরাধীকে দায়মুক্তি দিয়ে ভুক্তভোগীকে শান্তির উপদেশ দেওয়া আসলে শান্তির না, ক্ষমতার রাজনীতি

ছবিঃ শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত নাভানেথেম নাভি পিল্লাই (অনলাইন থেকে সংগৃহীত)

মত-দ্বিমত

অপরাধীকে দায়মুক্তি দিয়ে ভুক্তভোগীকে শান্তির উপদেশ দেওয়া আসলে শান্তির না, ক্ষমতার রাজনীতি

ড. লুবনা ফেরদৌসী

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

যুদ্ধ থেমে গেলে কি শান্তি ফিরে আসে? নাকি কখনো কখনো যুদ্ধ শেষ হয় কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে, আর ক্ষমতার রাজনীতি সেই যুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখে ইতিহাস বিকৃতির মধ্যে, অপরাধীর দায়মুক্তিতে, ভুক্তভোগীর নীরবতায়?

যাঁর পরিবার হারিয়ে গেছে, যাঁর শরীর ও জীবনে নির্যাতনের ক্ষত বা যুদ্ধের সহিংসতার সাক্ষ্য বহন করছে, অথচ অপরাধী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আন্তর্জাতিক মিত্রতার সুরক্ষায় বহাল তবিয়তে আছে, তাঁর কাছে শান্তি বলতে আমরা ঠিক কী বোঝাতে চাই? বন্দুকের শব্দ না শোনাকে? নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলার বাধ্যবাধকতাকে?

নাভি পিল্লাইয়ের ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার এই প্রশ্ন গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনজ্ঞের দীর্ঘ কর্মজীবন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। নোবেল কমিটি বিশেষভাবে তুলে ধরেছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকা। 

তাঁর কাজ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, শান্তি কূটনৈতিক সমঝোতা বা সংঘর্ষবিরতির বিষয় যেমন, তেমনি শান্তি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নও। কারণ সংঘর্ষের অবসান ঘটলেও অন্যায়ের অবসান ঘটে না, যদি ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, অপরাধের সত্য স্বীকৃতি না পায় এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হয়।

বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে, কারণ আমার বর্তমান গবেষণাগুলোর একটি ১৯৭১ সালের গণহত্যা, গণহত্যা অস্বীকারের রাজনীতি এবং তার সমকালীন রাজনৈতিক উত্তরজীবন নিয়ে।
গণহত্যা কেবল মানুষ হত্যা করে না, মানুষের মৃত্যুর অর্থ নিয়েও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই তৈরি করে। প্রথমে মানুষকে হত্যা করা হয়, তারপর কখনো তাদের পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা হয়, কখনো অপরাধের উদ্দেশ্য অস্বীকার করা হয়, কখনো অপরাধীকে দেশপ্রেমিক বানানো হয়, আর কখনো ভুক্তভোগীর স্মৃতিকে রাজনৈতিক অসুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
আর যার কারণে গণহত্যা অস্বীকার হয়ে ইতিহাসে আটকে না থেকে হয়ে ওঠে সহিংসতার ধারাবাহিকতার আরেক রূপ। কারণ হত্যার পর সত্যকে হত্যা করার চেষ্টা আসলে ক্ষমতার সেই পুরোনো দাবিটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। কার জীবন মূল্যবান, কার মৃত্যু স্বীকারযোগ্য, আর কার যন্ত্রণার ইতিহাস রাষ্ট্রের সুবিধামতো বদলে দেওয়া যাবে।

সহিংসতার ইতিহাস যতবার পড়ি, পড়তে গিয়ে প্রতিবার মনে হয়, নিহত মানুষের সংখ্যা জানাটা জরুরি, কিন্তু সংখ্যার মধ্যে তাঁদের জীবন হারিয়ে গেলে আমাদের বোঝাপড়াও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার, তাদের অসমাপ্ত স্বপ্ন, আর বেঁচে থাকা মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা আছে। সেই অপেক্ষা সহানুভূতির জন্য কেবল নয়, সত্য স্বীকার করা ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির জন্যও।

পিল্লাইয়ের বিচারিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক আকায়েসু মামলায় তিনি বিচারক প্যানেলের সদস্য ছিলেন। এই মামলায় প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গণহত্যার অপরাধে দণ্ডাদেশ দেয়। রায়টি আরও প্রতিষ্ঠা করে যে কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাও গণহত্যার অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এই বিচারিক স্বীকৃতির তাৎপর্য আইনি ও গভীরভাবে রাজনৈতিক। যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতাকে দীর্ঘদিন যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখা হয়েছে, যেন যুদ্ধ পুরুষেরা করে, আর নারীর শরীর তার মূল্য পরিশোধ করে। আকায়েসু রায় সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠা করেছে, নারীর ওপর যৌন সহিংসতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ, এমনকি গণহত্যার অংশও হতে পারে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতাও ছিল বৃহত্তর দমন-পীড়ন ও আধিপত্যের ইতিহাসের অংশ। অথচ গণহত্যা অস্বীকারের রাজনীতি প্রায়ই সেই অভিজ্ঞতাকে আড়াল বা খাটো করতে চায়। যে সমাজ নির্যাতিত নারীর অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করে, অথচ অপরাধীর রাজনৈতিক পুনর্বাসনে উদারতা দেখায়, সেখানে ন্যায়বিচারের সংকট ইতিহাসে আটকে থাকে না; বর্তমানের রাজনীতিতেও বেঁচে থাকে।

আমার কাছে এখানে শান্তির সঙ্গে ন্যায়বিচারের সম্পর্ক । অস্ত্রের শব্দ থামলেও ভয় থেকে যেতে পারে। অপরাধের বিচার না হলে মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবে যে একই ঘটনা আবার ঘটবে না?
অবশ্য আদালতের একটি রায় সব ক্ষত সারিয়ে দেয় না। হারানো মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। নির্যাতনের ক্ষত সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারে না, কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা ট্রমার অবসান ঘটাতে পারে না। কিন্তু বিচার অন্তত প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে সংঘটিত অপরাধকে ইতিহাসের সুবিধাজনক ব্যাখ্যায় বিলীন করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামরিক পদমর্যাদা, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কোনো অপরাধের দায়মুক্তির সনদ নয়। তবু বিচার একটি জরুরি কথা প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অন্যায়, তার দায় আপনার নয়, আর অপরাধীর পদমর্যাদা সেই দায় মুছে দেয় না।

আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকেও এই বিশ্বাসের যোগ্য হতে হবে। দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম, শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য আরেক নিয়ম হলে আইনের ভাষা যত সুন্দরই হোক, মানুষের আস্থা টিকবে না। ভুক্তভোগীর জাতীয়তা বা অপরাধীর মিত্রপরিচয় দেখে ন্যায়বিচারের প্রয়োজন বদলে যেতে পারে না।

আমাদের উপমহাদেশে ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, অপরাধের বিচার দাবি করলে তাকে প্রতিহিংসা বলা, আর অপরাধীর দায়মুক্তিকে জাতীয় ঐক্য বা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হিসেবে হাজির করা। অথচ যে ঐক্যের শর্ত ভুক্তভোগীর নীরবতা, সেটা ঐক্য হয় না, হয় ক্ষমতাবানের সুবিধার্থে চাপিয়ে দেওয়া বিস্মৃতি। যে পুনর্মিলনের পূর্বশর্ত সত্য অস্বীকার, সেটা পুনর্মিলন না, অন্যায়কে নতুন রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া।

নাভি পিল্লাইয়ের কাজের প্রতি আমার শ্রদ্ধার জায়গা হলো, তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি পরিসর গড়ে তোলার কাজে যুক্ত থেকেছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার ভাষ্যের পাশাপাশি নির্যাতিত মানুষের অভিজ্ঞতাও বিচারিক সত্য প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রে আসতে পারে। তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন।

তবে এই স্বীকৃতি উদ্‌যাপনের সবচেয়ে অর্থবহ উপায় নিজেদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক অবস্থানকেও একই নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো। আমরা কি ন্যায়বিচার চাই, নাকি কেবল নিজেদের পছন্দের অপরাধীদের বিচার চাই? আমরা কি গণহত্যার বিরোধিতা করি, নাকি শুধু সেই গণহত্যার, যার অপরাধী আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ?
অপরাধীকে দায়মুক্তি দিয়ে ভুক্তভোগীকে শান্তির উপদেশ দেওয়া আসলে শান্তির না, ক্ষমতার রাজনীতি।

যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারে রাষ্ট্র। কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ কথা ঘোষণা করার নৈতিক অধিকার রাষ্ট্রের একার না। সেই প্রশ্নে নিহত মানুষের ইতিহাস, বেঁচে থাকা মানুষের সাক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সত্য জানার অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি যদি সত্যকে অস্বীকার করার বিনিময়ে কেনা হয়, তবে সেটাকে শান্তি বলা যায় না; কেননা সেটা পরবর্তী অন্যায়ের জন্য রাজনৈতিক অবকাশ।

মন্তব্য করুন

Logo