প্রতীকী ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত
শিক্ষকের কপালে রিভলবারের হুমকি, রাষ্ট্র কি শুনতে পেয়েছে!
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেনকে ফোন করে একজন বলছে, "জলে বাস করে কখনো কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায় না।" তার আগে বলা হয়েছে, তারা এখনো তার মাথায় রিভলবার ঠেকিয়ে টাকা চায়নি। অর্থাৎ ভয় দেখানোর কাজটি এখনো কথার মধ্যেই আছে- তবে কথাগুলো এমন, যাতে সেই ভয়কে বাস্তব বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে। ফোনদাতা ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে অধ্যাপক শাহরিয়ারের কাছে টাকা চেয়েছে, বলেছে তাদের কয়েকজন কর্মী কারাগারে আছে, তাদের জামিনের জন্য টাকা দরকার। কথোপকথনের একপর্যায়ে বলা হয়েছে, ৪৫ লাখ টাকা বাকি আছে। অধ্যাপক শাহরিয়ারকে তাদের পাঁচ কর্মীর জামিনের জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। ফোনদাতা জানে যে অধ্যাপক শাহরিয়ার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে আছেন। এই কথোপকথনের ৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ডও প্রকাশিত হয়েছে এবং অধ্যাপক শাহরিয়ার এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক এই কারণে যে, শাহরিয়ার হোসেন একা নন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত পাঁচজন শিক্ষককে ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন ছাড়াও অন্য শিক্ষকেরা আছেন। এ ঘটনায় একজন শিক্ষক নিরাপত্তা চেয়ে মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে বলে জানিয়েছে।
প্রথম প্রশ্ন, কারা এই ফোন করেছে? কিন্তু তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন হলো, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষককে এভাবে টার্গেট করার সাহস তারা পেল কীভাবে?
এটাকে নিছক চাঁদাবাজির কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এখানে শুধু টাকা চাওয়া হয়নি। টাকা আদায়ের জন্য একটি পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে, ভয় তৈরি করা হয়েছে, সম্ভাব্য সহিংসতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সম্পর্কে জানা থাকার কথাও জানানো হয়েছে। একজন শিক্ষক যখন ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তির কাছে জানতে চান, "আমি কোথায় আছি, আপনি জানেন?" তখন উত্তর আসে- তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে আছেন। এরপর বলা হয়, তার পেশার কারণেই তাকে ফোন করা হয়েছে।
এই জায়গাটিই তদন্তকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অপরাধী কারও ফোন নম্বর পেলেই তাকে ফোন করতে পারে, তবে একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে বেছে নেওয়া, তাদের পেশাগত পরিচয় জানা এবং প্রয়োজনে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য থাকার দাবি করা- এসবের উৎস কী? তাদের তথ্য কি কোথাও থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে? কেউ কি তাদের সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছে? নাকি এটা দীর্ঘদিনের কোনো চক্রের কাজ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার গভীরতা বোঝা যাবে না।
আরও একটি প্রশ্ন অবশ্যই সামনে আসবে- ফোনকারীরা সত্যিই ‘সর্বহারা’ কিনা। এখানেও আমাদের সতর্ক থাকা দরকার। কেউ ‘সর্বহারা পার্টি’র পরিচয় দিলেই সে ওই সংগঠনের সদস্য হয়ে যায় না। বরং অপরাধীরা চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখাচ্ছে- এমন সন্দেহ পুলিশের অন্য এক তদন্তে উঠে এসেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে আটজন কলেজ শিক্ষককে ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সেখানে পুলিশ প্রাথমিকভাবে চরমপন্থী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতারক চক্র এ কাজ করে থাকতে পারে বলে জানিয়েছিল।
তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাতেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ‘সর্বহারা পার্টি শিক্ষককে হুমকি দিয়েছে’- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো, সর্বহারা পরিচয়ের আড়ালে কারা এই অপরাধ করছে?
এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের দিকে তাকালে। ২০১৫ সালে রাবির একাধিক শিক্ষককে ‘লাল বাহিনী’, ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি’, ‘সর্বহারা’সহ বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরের তথ্যসূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উপাচার্যসহ প্রায় ২১ জন শিক্ষককে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২০১৫ সালের জুলাইয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদীর কাছেও ‘জনযুদ্ধ’ কমান্ডার পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তিনি টাকা দিতে না চাইলে তার সন্তানের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন এবং মতিহার থানায় জিডি করেছিলেন। সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল, এর আগের অনেক অভিযোগ অপরিচিত ফোন থেকে এসেছিল এবং হুমকিদাতাদের শনাক্ত করা যায়নি।
এরপর ২০১৯ সালে ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে রাবির তিন শিক্ষককে একই নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তারাও মতিহার থানায় জিডি করেছিলেন।
তাহলে ২০১৫, ২০১৯ এবং ২০২৬- বছরের ব্যবধান পেরিয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে একই ধরনের পরিচয়ে ফোন আসে কীভাবে? ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র আছে- এমন প্রমাণ এখনো নেই। কিন্তু এত বছরের ব্যবধানে একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি অন্তত একটি বিষয়কে সামনে আনে, তা হচ্ছে- আগের ঘটনাগুলোর তদন্ত, শনাক্তকরণ ও বিচারিক পরিণতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কি যথেষ্ট জবাব পাওয়া গেছে?
এই প্রশ্নটি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ আইন এ ধরনের হুমকি ও চাঁদাবাজিকে খুব সাধারণ কোনো ব্যাপার হিসেবে দেখে না। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৮৩ ধারায় ভয় দেখিয়ে সম্পদ বা অর্থ আদায়কে ‘extortion’ বা চাঁদাবাজি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আর ৩৮৭ ধারায় চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে হত্যা বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখানোর বিষয়টি আলাদাভাবে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে ৫০৩ ধারায় কাউকে ভয় দেখিয়ে এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করা বা তার আইনগত অধিকার থেকে বিরত রাখাকে ‘criminal intimidation’ বলা হয়েছে। হত্যা বা গুরুতর আঘাতের হুমকির ক্ষেত্রে ৫০৬ ধারায় আরও কঠোর শাস্তির বিধান আছে।
অর্থাৎ ফোনের ওপারে কেউ "আমরা তো এখনো আপনার মাথায় রিভলবার ধরিনি" বললেই বিষয়টা শুধু কথার পর্যায়ে থাকে না। যদি সেই কথার উদ্দেশ্য হয় ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা, তাহলে ভয়টাই অপরাধের একটি উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ ঘটার জন্য বাস্তবে রিভলবারটি মাথায় ঠেকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
একটি ফোন নম্বর থেকে ফোন এসেছে। সাইবার ক্রাইম বিভাগের সহায়তায় এই কল মাদারীপুর থেকে করা হয়েছে বলে একটা রিপোর্টে পাওয়া গেছে। কিন্তু কলটি কোন এলাকা থেকে করা হয়েছে- এটা তদন্তের শেষ নয়, বরং শুরু। প্রকৃত ব্যবহারকারী কে, সিমটি কার নামে, ফোন কার হাতে ছিল, কলের সময় কোথায় ছিল, একই নম্বর বা সংশ্লিষ্ট নম্বর থেকে আর কাদের ফোন করা হয়েছে, শিক্ষকদের নম্বর কোথা থেকে পাওয়া হয়েছে, কলের পেছনে একজন না একাধিক ব্যক্তি আছে- এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
এখানে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি তদন্তের ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতের ঘটনাগুলোতে আমরা একটি পরিচিত দৃশ্য দেখেছি- হুমকি, জিডি, তদন্তের আশ্বাস। তারপর সময় চলে যায়। হুমকিদাতারা অজ্ঞাতই থেকে গেছে। ২০১৫ সালে রাবির ঘটনাগুলো নিয়ে তখন এমন অভিযোগ ছিল যে, অপরিচিত ফোন থেকে আসা হুমকির ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।
এই জায়গায় ভয়ংকর বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি হতে পারে- ফোন করে ভয় দেখানো যাবে, চাঁদা চাওয়া যাবে, আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো অপরাধীচক্রের জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক পরিবেশ আর কী হতে পারে!
তাই রাবির পাঁচ শিক্ষকের ঘটনা শুধু তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপার নয়। এটা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার ব্যাপার, শিক্ষকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপার এবং সর্বোপরি আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্রের সক্ষমতার ব্যাপার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পড়াবেন, গবেষণা করবেন, পরীক্ষা নেবেন- নাকি অপরিচিত নম্বর থেকে কখন ফোন আসবে, পরিবারকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যাবে, চাঁদা না দিলে কী হবে- এসব নিয়ে আতঙ্কে থাকবেন?
আরও বড় কথা, আজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ফোন করে ভয় দেখানো হচ্ছে, আগামীকাল একই কৌশল অন্য পেশার মানুষের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করবে। ইতিমধ্যে দেশের অন্য জায়গায় কলেজ শিক্ষকদের লক্ষ্য করেও একই ধরনের ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাই শুধু হুমকি পাওয়া শিক্ষককে নিরাপত্তা দেওয়া নয়, হুমকির উৎস খুঁজে বের করা। শুধু জিডি গ্রহণ করা নয়, জিডি থেকে তদন্ত, তদন্ত থেকে শনাক্তকরণ, শনাক্তকরণ থেকে মামলা এবং মামলা থেকে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান করা। কারণ জিডি কোনো নাগরিকের নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় নয়, এটা রাষ্ট্রের কাছে বিপদের আনুষ্ঠানিক সংকেত।
রাবির শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব আছে। যাঁরা হুমকি পেয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখার চাপ নয়, বরং তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ফোন নম্বর ও চলাফেরার তথ্য কীভাবে অপরাধীদের হাতে গেল, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।
সবচেয়ে জরুরি কাজ পুলিশের। ‘সর্বহারা’ নাম সত্যি কিনা, তা প্রমাণ করা তদন্তের অংশ। তার চেয়েও জরুরি হলো সেই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা, যে ফোনের ওপাশে বসে ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
কারণ অপরাধী যদি সত্যিই কোনো নিষিদ্ধ বা চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য হয়, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি কোনো প্রতারকচক্র কেবল সেই সংগঠনের নাম ব্যবহার করে থাকে, তাহলেও তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পরিচয় বদলালেও অপরাধ বদলায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই ‘সর্বহারা’ কে- এখানে থেমে থাকার নয়। প্রশ্নটি হলো, কারা এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে একজন শিক্ষককে বলতে পারে- "আপনি পুলিশ, প্রশাসন, র্যাব, ডিবি নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ করবেন, নাকি সহযোগিতা করবেন?"
এই প্রশ্নের উত্তর দ্রুত দিতে হবে। কারণ একজন শিক্ষককে ফোনের ওপাশ থেকে যে লোকটি ভয় দেখাচ্ছে, সে শুধু একজন মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে না। সে পরীক্ষা করে দেখছে- রাষ্ট্র কত দূর পর্যন্ত শুনতে পায়, কত দ্রুত পৌঁছাতে পারে এবং আইনকে পাশ কাটিয়ে নাগরিককে কতটা অসহায় করে রাখা যায়।
সেই পরীক্ষার উত্তর কথায় নয়, তদন্তে তথ্য প্রমাণ নিয়েই দিতে হবে। রিভলবারটি এখনো হয়তো কারও মাথায় ঠেকেনি। কিন্তু ভয় দেখানোর ভাষা ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে একজন শিক্ষক ও তার পরিবারের কাছে। রাষ্ট্রের কাজ হলো অপেক্ষা না করা- ভয়টি গুলির শব্দে পরিণত হওয়ার আগেই তার উৎস খুঁজে বের করা।
মন্তব্য করুন

