ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
কোন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সুরে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪২ এএম
কথিত আছে, জার্মানির হ্যামিলন শহর একসময় ইঁদুরের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তখন এক অদ্ভূত বাঁশিওয়ালা আবর্ভূত হলেন এবং শহরের মেয়রকে প্রতিশ্রুতি দিলেন, তাঁর জাদুকরী বাঁশির সুরে শহরকে তিনি ইঁদুরমুক্ত করে দেবেন। বিনিময়ে চাইবেন মোটা পুরস্কার। মেয়র রাজি হয়ে গেলেন। বাঁশিওয়ালা্র বাঁশির সুরে হাজার হাজার ইঁদুর তাঁর পেছনে ছুটে নদীতে গিয়ে ডুবে মারা গেল। কিন্তু শহর ইঁদুরমুক্ত হওয়ার পর মেয়র তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখলেন না। তিনি বাঁশিওয়ালাকে তাঁর প্রতিশ্রুত পুরস্কার দিতে অস্বীকার করলেন। অপমানিত বাঁশিওয়ালা প্রতিশোধ নিতে কিছুদিন পর আবার তাঁর বাঁশীতে সুর তুললেন। এবার তাঁর বাঁশির সুরে শহরের সব শিশু ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁর পেছনে চলতে শুরু করল। বাঁশিওয়ালা তাদের নিয়ে পাহাড়ের এক গুহায় ঢুকে গেলেন। এরপর শিশুরা আর কখনো ফিরে এলো না। তারা চিরতরে হারিয়ে গেল। ভাবছি কোন বাঁশিওয়ালার জাদুর টানে দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শিশুরা!
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশে বিভিন্ন থানায় প্রায় ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন বাদে সবাই ফিরে তথ্যটি সঠিক ধরে নিলেও সাত মাসে দুই হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজ থাকার হিসাব কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। বরং প্রতিটি সংখ্যা আমাদের সামনে একেকটি শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, একেকটি পরিবারের অসহনীয় উৎকণ্ঠা এবং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন তুলে ধরে।
তথ্যটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এখনো থামেনি। এরই মধ্যে কুমিল্লায় হারিয়ে যাওয়া শিশু অপ্রতিমের নিথর দেহ লালমাই পাহাড়ের গভীর থেকে উদ্ধারের রক্ত হিম করা সংবাদটি যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে সবাইকে। শুধু অপ্রতিম নয়, শিশু হত্যা আর নিখোঁজের যেন মহোৎসব শুরু হয়েছে এই দেশে। সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে যদিও বলা হচ্ছে শিশুর প্রতি সহিংসতার এই ধারাটি নাকি নতুন নয়। কিন্তু বলতে চাই, পুরানো উদাহরণ আঁকড়ে থাকা নয়; বরং নতুন উদাহরণ সৃষ্টির জন্যই ২০২৪ শের জুলাইয়ের জন্ম হয়েছিল। তাই সাত মাস পেরিয়ে গেলেও সেই একই ধারার উদাহরণ টেনে আনার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জার।
প্রশ্ন হলো স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রে শিশুরা কেন নিখোঁজ হবে? স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এই দেশ কেন শিশুদের বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারল না? দেশ তো এখন কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেই। তাহলে কেন অকারণে হাজার হাজার মায়ের কোল খালি হবে? শিশুরা কারণ ছাড়া কেন হারিয়ে যাবে? স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আমরা কেন এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করতে পারলাম না, যেখানে একটি শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠবে। ঘরে, স্কুলে, মাদ্রাসায়, পথে, গণপরিবহনে; কোথায় নিরাপদ শিশুরা? মায়ের হাত একবার সন্তানের হাত থেকে ছুটে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা কোথাও নেই। একটি শিশু যখন হারিয়ে যায়, তখন সে অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা অন্য কোনো বিপদের ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে শিশুর নিখোঁজ হওয়া সরাসরি আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুর নিখোঁজ হবার বিষয়টি কেবল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না; বরং এটি হয়ে ওঠে শিশু সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন। বাংলাদেশে শিশু অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা আছে, আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা । কিন্তু এইসব আইন ও নীতিমালা সাজিয়ে রেখে কী লাভ, যখন তা শিশুকে নিরাপত্তা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
রাজা যায়, রাজা আসে; সরকার বদলায়, নতুন সরকার আসে। কিন্তু শিশুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আমরা শিশুদের জন্য একটি পৃথক, শক্তিশালী ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। এদেশে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন ২১টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু সমন্বিত নেতৃত্ব ও জবাবদিহির জায়গাটি আজও তৈ্রি হলো না। আমরা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করি। অথচ রাষ্ট্রের কাছে শিশুর নিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগ, দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হবার কথা ছিল। শিশুর বিপদে রাষ্ট্র তা্র সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে পাশে দাঁড়াবে; এটা স্বাভাবিক হবার কথা ছিল।
শিশুর নিরাপত্তায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় শিশু নিখোঁজ প্রতিরোধ ও অনুসন্ধান ব্যবস্থা, দ্রুত তথ্য বিনিময়ের কার্যকর কাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং উদ্ধার-পরবর্তী পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট প্রোটোকল। একই সঙ্গে পরিবার, স্কুল, পরিবহনকর্মী, স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিকে যুক্ত করে গড়ে তুলতে হবে একটি শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা বলয়। প্রতিটি শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। শিশুরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে রাষ্ট্রকে।
শিশুরা ভালো থাকলেই ভালো থাকবে বাংলাদেশ। শিশুরা রাষ্ট্রের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও আমানত। তাই শিশুর সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ। শিশুরা রাষ্ট্রের কাছে করুণা চায় না; তারা চায় অধিকার। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে তাদের হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না, এবং তারা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে।
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা গল্পে আমরা দেখেছি মেয়রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মূল্য চরম দিয়েছিল সে শহরের শিশুরা। আমাদের ক্ষেত্রে যেন তেমনটি না হয়। আমরা যেন শিশুদের কাছে দেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি, নিরাপত্তা, সুরক্ষা, মর্যাদা ও অধিকার ভঙ্গ করে তাদের হারিয়ে যেতে না দিই। কোনো অদৃশ্য বাঁশিওয়ালা যেন আমাদের শিশুদের নিয়ে অজানার পথে নিয়ে না যায়।
মন্তব্য করুন

