Logo

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

×

Follow Us

জিন্নাহ ফিরে এলেন, জনগণ গেল কোথায়?

ছবিঃ The Daily Star থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

জিন্নাহ ফিরে এলেন, জনগণ গেল কোথায়?

চিররঞ্জন সরকার

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বেঁচে নেই। তিনি মারা গেছেন ১৯৪৮ সালে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির এক অসাধারণ প্রতিভা হলো—মৃত মানুষকে প্রয়োজনমতো জীবিত করে তোলা। জীবিত মানুষ প্রশ্ন করে, জবাব চায়, হিসাব চায়। মৃত মানুষ এসবের কিছুই করে না। তাই রাজনীতির জন্য মৃত মানুষ বেশ নিরাপদ। তাঁকে দেয়ালে টাঙানো যায়, মঞ্চে তুলে আনা যায়, তাঁর নামে আবেগ জাগানো যায়, তাঁকে নিয়ে ঝগড়া করা যায়। তিনি নিজে এসে জিজ্ঞেস করেন না, “আমার নামে এত রাজনীতি করছেন কেন?” এবার সেই নিরাপদ মৃত মানুষটির নাম জিন্নাহ। তিনি ফিরে এসেছেন—অবশ্য পায়ে হেঁটে নয়, ইতিহাসের ফ্রেমে চড়ে।

মুসলিম লীগের নেতৃত্বে তিনি পৃথক মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান স্থপতি হয়ে ওঠেন। অনেক অর্বাচিন এমনভাবে বলছেন—জিন্নাহ পাকিস্তান সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ জিন্নাহ না হলে পাকিস্তান হতো না, আর পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না। কী চমৎকার যুক্তি! তাহলে তো ব্রিটিশদের পির মানতেই হয়। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে না এলে ভারত ভাগ হতো না। ভারত ভাগ না হলে পাকিস্তান হতো না। পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশও হতো না। অতএব বাংলাদেশের স্বাধীনতার কৃতিত্বের একটি অংশ ব্রিটিশদেরও দিতে হবে! আরও একটু পিছিয়ে গেলে হয়তো ইউরোপীয় নাবিকদেরও ধন্যবাদ দিতে হবে। তাঁরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে না এলে উপনিবেশবাদ আসত না; উপনিবেশবাদ না এলে ভারত ভাগ হতো না; ভারত ভাগ না হলে পাকিস্তান হতো না। বাহ! ইতিহাসের নতুন সূত্র আবিষ্কৃত হলো—যে আগে এসেছে, কৃতিত্ব তার!

এই যুক্তির সৌন্দর্য হলো, এতে ইতিহাসের কারণ, সংঘাত, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সব বাদ পড়ে যায়। ইতিহাস যেন একটি ট্রেন। প্রথম বগিতে ব্রিটিশ, দ্বিতীয় বগিতে জিন্নাহ, তৃতীয় বগিতে পাকিস্তান, চতুর্থ বগিতে বাংলাদেশ। প্রথম বগির যাত্রীকে ধন্যবাদ না দিলে শেষ বগির অস্তিত্বই নাকি অসম্ভব! তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্মারকফলকে একদিন হয়তো লেখা হবে: “ভারত ভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ধন্যবাদ; পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য জিন্নাহকে ধন্যবাদ; আর মাঝখানে বাঙালিরাও একটু যুদ্ধ করেছিল।”

জিন্নাহ পাকিস্তান চেয়েছিলেন; বাঙালিরা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ পেল। তিনি এক রাষ্ট্রের ঐক্য চেয়েছিলেন; সেই রাষ্ট্রের ভেতরেই পূর্ব বাংলার মানুষ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবি তুলল। তিনি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর ওপর জোর দিয়েছিলেন; বাঙালি ছাত্ররা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করল। যে জিন্নাহর রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, তাঁর উত্তরাধিকারই পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি হয়ে দাঁড়াল। ইতিহাস কখনো কখনো সত্যিই বড় রসিক।

যে জিন্নাহ বলেছিলেন, “উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান”—তাঁর ভাষানীতি বাঙালির কাছে অন্য এক বাস্তবতার দরজা খুলেছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সেই বাস্তবতার বিস্ফোরণ। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ শহীদদের রক্ত প্রমাণ করেছিল, ভাষা কোনো দয়া করে দেওয়া অলংকার নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব ও মর্যাদার অংশ। তাই আজ দেয়ালে জিন্নাহর ছবি ঝুললেই ইতিহাস বদলে যাবে—এমন ধারণা ইতিহাসের প্রতি যেমন অবিচার, তেমনি জনগণের বুদ্ধির প্রতিও অবিশ্বাস।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—২০২৬ সালের বাংলাদেশে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আসলে কী? জিন্নাহর ছবি? বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে জিজ্ঞেস করুন। তিনি হয়তো বলবেন, “জিন্নাহ কে, সেটা জানি। কিন্তু ভাই, চালের কেজি কত?” আরেকজন বলবেন, “ছবি কার, সেটা পরে দেখব; আগে বলেন, গ্যাস কখন আসবে?” আরেকজন বলবেন, “ডিগ্রি শেষ করেছি, চাকরি কোথায়?” অর্থাৎ জনগণের কাছে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, কিন্তু পেটের সঙ্গেও আছে। দুর্ভাগ্য, পেটের সমস্যা সমাধান করতে পোস্টার টাঙানো যায় না।

রাজনীতিবিদদের অবশ্য সমস্যা কম। দ্রব্যমূল্য নিয়ে কথা বললে বাজারের হিসাব দিতে হয়। কর্মসংস্থান নিয়ে কথা বললে পরিকল্পনা দেখাতে হয়। বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে উৎপাদন ও সরবরাহের হিসাব দিতে হয়। শিক্ষা নিয়ে কথা বললে বাজেটের কথা বলতে হয়। জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে হাসপাতাল, ডাক্তার ও ওষুধের কথা বলতে হয়। কিন্তু জিন্নাহর ছবি? আহা! সেখানে কোনো হিসাব নেই। শুধু আবেগ আছে। ফলে একটি ছবি টাঙান, তারপর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন। প্রতিবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিবাদ করুন। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিন। টকশো ডাকুন। বিশেষজ্ঞ বসান। জাতীয় সংকটের নতুন অধ্যায় খুলুন। আর জনগণ বাজারে গিয়ে হিসাব করুক—আজ মাছ কিনবে, না সবজি।

এটাই সম্ভবত আমাদের রাজনৈতিক “বিষয়ান্তর ব্যবস্থাপনা”র চমৎকার সংস্করণ। যখন বাস্তব প্রশ্ন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের এমন একটি চরিত্র বের করে আনুন যিনি নিজে এসে কোনো জবাব দিতে পারবেন না। জিন্নাহ এ কাজে আদর্শ। তাঁকে গ্যাসের দাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা যাবে না। বেকারত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা যাবে না। দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা যাবে না। ফলে মৃত রাজনীতিক জীবিত রাজনীতিকের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা আর ইতিহাসের কৃতিত্ব এক জিনিস নয়। কোনো ঘটনার আগে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে বলেই আগের ঘটনাটিকে পরের ঘটনার কৃতিত্ব দেওয়া যায় না। পাকিস্তান সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল—কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন-পরবর্তী সংকট, মুক্তিযুদ্ধ এবং অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। এই পার্থক্যটুকু বুঝতে খুব বেশি ইতিহাস পড়ার প্রয়োজন নেই; শুধু কারণ ও ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।

তাই জিন্নাহর ছবি টাঙানো নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ইতিহাস পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তাঁর ব্যক্তিত্বের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই ছবিকে বর্তমান রাজনীতির প্রধান জাতীয় ইস্যু বানানোর মধ্যে এক ধরনের হাস্যকর দেউলিয়াপনা আছে। কারণ জনগণের কাছে দেয়ালে কার ছবি আছে তার চেয়ে ঘরে চুলা জ্বলছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। তরুণের কাছে জিন্নাহর প্রতিকৃতি নয়, চাকরির বিজ্ঞপ্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের কাছে রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে বাজারের দাম বেশি বাস্তব। রোগীর কাছে টকশোর ইতিহাস নয়, হাসপাতালের চিকিৎসা জরুরি।

ডাকসু যদি সত্যিই ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, তাহলে প্রশ্ন হওয়া উচিত—ছাত্রদের আবাসন কোথায়, শিক্ষার মান কেমন, ক্যাম্পাস কতটা নিরাপদ, স্নাতক হওয়ার পর কর্মসংস্থানের পথ কোথায়, শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত। জিন্নাহর ছবি নিয়ে ঝগড়া করা এসব প্রশ্নের তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক সহজ।

শেষ পর্যন্ত জনগণ জিন্নাহর ছবির নিচে বসে জীবনযাপন করে না। তারা বাজারে যায়, বাসে ওঠে, চাকরি খোঁজে, সন্তানকে স্কুলে পাঠায়, হাসপাতালে যায়, বিদ্যুতের বিল দেয়, গ্যাসের অপেক্ষা করে এবং মাসের শেষে হিসাব মেলায়। তাদের কাছে ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইতিহাসের নামে বর্তমানের দুর্ভোগ ঢেকে রাখার কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে তারা একদিন প্রশ্ন করবেই।

সেই প্রশ্নটি খুব সরল: জিন্নাহ পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন—ঠিক আছে। ব্রিটিশরা ভারত ভাগের পথ তৈরি করেছিল—ঠিক আছে। তাহলে ইতিহাসের সব কৃতিত্ব তাঁদের দিয়ে দিলাম। কিন্তু বাংলাদেশটা কে সৃষ্টি করল? সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে দেয়ালের ছবি যথেষ্ট নয়; বলতে হবে ভাষা শহীদদের কথা, গণমানুষের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা। আর তখনই বোঝা যাবে—ইতিহাস কোনো একজন নেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

তাই জিন্নাহকে নিয়ে আলোচনা হোক। কিন্তু তাঁকে নিয়ে বর্তমানের রাজনীতি যেন জনগণকে আড়াল না করে। কারণ জিন্নাহ ফিরে আসতে পারেন, ব্রিটিশরাও ইতিহাসের পাতা থেকে ফিরে আসতে পারেন, পাকিস্তানও স্মৃতির অ্যালবাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। শুধু জনগণকে যেন আবার নির্বাসনে পাঠানো না হয়। দেয়ালে যত ছবি টাঙানো হোক, বাজারের হিসাব বদলায় না। বেকারের চাকরি হয় না। গ্যাসের চুলা নিজে থেকে জ্বলে না। বিদ্যুতের লাইন নিজে থেকে ঠিক হয় না। আর জনগণের পেট ইতিহাসের পোস্টারে ভরে না।

জিন্নাহ ফিরে এসেছেন। তাঁকে স্বাগত জানানোর আয়োজনও বেশ জমজমাট। এখন শুধু একটি ছোট প্রশ্ন—জিন্নাহ ফিরে এলেন ঠিকই, কিন্তু জনগণ গেল কোথায়?

মন্তব্য করুন

Logo