কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই মিলল অপ্রতিমের মরদেহ ছবিঃ ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত
১৩ বছরের অপ্রতিমের মৃত্যু: রাষ্ট্রকে উত্তর দিতে হবে
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
গতকাল দুপুরেও অপ্রতিমের মা ছেলেকে খুঁজছিলেন। ফেসবুকে তাঁর আকুতি ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। ১৩ বছরের ছেলেটি মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। মা লিখেছিলেন, “আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি আমার ছেলেকে বাঁচান।” একদিনও পেরোয়নি। ছেলেকে বাঁচানোর সেই আকুতি বদলে গেল মৃত্যুর সংবাদে।
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ীর বাসা থেকে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই এলাকার জঙ্গলে পাওয়া গেল তার রক্তাক্ত মরদেহ। আগের বিকেলে যে কিশোর ছবি তুলতে বের হয়েছিল, পরের দুপুরে তার নিথর দেহ পড়ে আছে জঙ্গলে। এই দুই দৃশ্যের মাঝখানে কয়েকটি ঘণ্টা। অপ্রতিমের মৃত্যুর সত্য লুকিয়ে আছে সেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।
এখন তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ অপ্রতিমের শেষ সময়ের পূর্ণ ঘটনাক্রম বের করা। সে বাসা থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছিল? কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল? শেষবার তাকে জীবিত কে দেখেছিল? তার সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না? যে জায়গায় মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে সে নিজে গিয়েছিল, নাকি তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল? ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে, নাকি মৃত্যুর পর মরদেহ সেখানে ফেলা হয়েছে? তার ফোন কোথায়? শরীরের আঘাত কী ধরনের? মৃত্যুর আনুমানিক সময় কখন?প্রতিটি উত্তরের পেছনে তথ্য ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সমর্থন থাকতে হবে।
অপ্রতিমের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরই মধ্যে নানা কথা ছড়াতে পারে। এমন ঘটনায় সেটাই ঘটে। রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া গেলে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়, সন্দেহ তৈরি হয়। কিন্তু সন্দেহ আর তদন্তে পাওয়া তথ্য এক জিনিস নয়। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি দ্রুত কোনো একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তদন্তের অন্য সম্ভাবনাগুলো বন্ধ করে দেওয়াও ঠিক হবে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, আঘাত কখন করা হয়েছে, একাধিক আঘাত থাকলে সেগুলোর প্রকৃতি, মৃত্যুর আনুমানিক সময়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে সহায়তা করবে।
একই গুরুত্ব দিতে হবে ঘটনাস্থলের ফরেনসিক পরীক্ষায়। রক্ত, পোশাক, চুল, আঙুলের ছাপ, সম্ভাব্য ডিএনএ, মাটি, পায়ের ছাপ, ব্যবহৃত কোনো বস্তু পাওয়া গেলে প্রতিটি আলামত যথাযথ নিয়মে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। মরদেহ যে অবস্থায় পাওয়া গেছে, আশপাশে কী ছিল, কোন জিনিস কোথায় পড়ে ছিল, সেসবের ছবিসহ বিস্তারিত নথি থাকা প্রয়োজন। অপ্রতিমের ফোনও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। ফোনটি পাওয়া গেলে আইনসম্মত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা যেতে পারে। ফোনটি না পাওয়া গেলে সেটিও তদন্তের অংশ। সেটি কোথায় গেল, শেষবার কখন সক্রিয় ছিল, কে ব্যবহার করেছে, মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ফোন হারিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক আছে কি না, এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে অপ্রতিমের শেষ কয়েক ঘণ্টার একটি পূর্ণ সময়রেখা তৈরি করা। বাসা থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকে মরদেহ পাওয়ার সময় পর্যন্ত যত তথ্য পাওয়া যায়, সময় ধরে সাজাতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, প্রয়োজনীয় ভিডিও ফুটেজ, ফোনের তথ্য, যাতায়াতের পথ, ফরেনসিক আলামত ও ময়নাতদন্তের তথ্য পাশাপাশি রাখলে কোথায় তথ্যের ফাঁক রয়েছে, সেটিও পরিষ্কার হবে।
একটি শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক জবাবদিহি। একটি শিশু বিকেলে বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হলো, পরিবার থানায় জানাল, পরদিন তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া গেল। এখানে রাষ্ট্রের দায় শুধু মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু করার মধ্যে শেষ হয় না। শিশু নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পুলিশ কত দ্রুত সক্রিয় হয়েছিল, সম্ভাব্য পথ ও স্থানগুলোতে অনুসন্ধান কতটা বিস্তৃত ছিল, ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা কীভাবে হয়েছে, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহে কত দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, এসবেরও জবাব প্রয়োজন। কারণ শিশুর জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অপ্রতিমকে জীবিত খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ সেই সময় ছিল কি না, অনুসন্ধানে কোনো বিলম্ব, গাফিলতি বা সমন্বয়ের ঘাটতি ঘটেছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। মৃত্যুর জন্য কে দায়ী, তদন্ত তার উত্তর খুঁজবে; একই সঙ্গে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করেছে, তার উত্তরও পরিবার ও নাগরিকদের জানার অধিকার রয়েছে। পরিবারের জানার অধিকার রয়েছে তদন্ত কত দূর এগিয়েছে। সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখার প্রয়োজনও হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ পরিবারকে অন্ধকারে রাখা নয়। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরিবারকে নিয়মিত জানানো উচিত।
কারণ সন্তান হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিবারের কষ্ট আরও বাড়ে। কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, এসব উত্তর জানার অপেক্ষা বছরের পর বছর চলতে পারে না। বাংলাদেশে আলোচিত কোনো মৃত্যুর পর দ্রুত কাউকে আটক করার খবর প্রায়ই মানুষের মনোযোগ পায়। কিন্তু কাউকে আটক করা আর অপরাধের পূর্ণ ঘটনাক্রম প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। একটি ভালো তদন্তকে আদালতের পরীক্ষার কথাও মাথায় রাখতে হয়। সন্দেহভাজনের বক্তব্যের পাশাপাশি বস্তুগত আলামত, ফরেনসিক ফল, সাক্ষ্য এবং ঘটনাক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হয়।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও তদন্তের লক্ষ্য শুধু একজন সন্দেহভাজন খুঁজে পাওয়া হতে পারে না। যদি অপরাধ ঘটে থাকে, তাহলে পুরো ঘটনাটি বের করতে হবে। কেন তাকে ওই এলাকায় যেতে হয়েছিল, কারা তার সঙ্গে ছিল, অপরাধের পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না, একাধিক ব্যক্তি যুক্ত ছিল কি না, ঘটনার পর আলামত সরানো হয়েছে কি না, প্রতিটি দিক তদন্তে আসা দরকার।
একই সঙ্গে কোনো অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলে সেটিও তথ্য ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিষ্কার করতে হবে। একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে অস্পষ্টতা রেখে তদন্ত শেষ করা পরিবারের প্রতি সুবিচার হবে না। অপ্রতিমের বয়স মাত্র ১৩ বছর। সে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ আর দিতে পারবে না। এখন তার হয়ে কথা বলবে ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের তথ্য, ডিজিটাল সূত্র, তার শেষ যাত্রাপথ এবং তাকে শেষবার দেখা মানুষের বক্তব্য। সেই তথ্যগুলো যেন হারিয়ে না যায়, বদলে না যায়, অবহেলায় নষ্ট না হয়। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। অপ্রতিমের মৃত্যুর সংবাদ এখন মানুষের গভীর মনোযোগে রয়েছে। কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জায়গা নিয়ে নেবে। জন-মনোযোগ সরে যাওয়ার সঙ্গে তদন্তের গতিও যেন কমে না যায়। কারণ সংবাদ পুরোনো হয়, সন্তানের মৃত্যু মা-বাবার কাছে পুরোনো হয় না।
অপ্রতিমের মা গতকালও মানুষের কাছে ছেলের জীবন চেয়েছিলেন। আজ সেই আবেদন পূরণ করার ক্ষমতা কারও নেই। তাঁর সামনে এখন সন্তানের স্মৃতি আর অসংখ্য অজানা মুহূর্ত। শেষ বিকেলে অপ্রতিম কোথায় গিয়েছিল? কার সঙ্গে ছিল? তারপর কী ঘটেছিল? এই উত্তরগুলো একটি ফৌজদারি তদন্তের প্রয়োজনের মধ্যেই সীমিত নয়। সন্তান হারানো পরিবারের কাছে জীবনের বাকি সময়ের জন্য উত্তরগুলো দরকার। অপ্রতিমকে আর ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর ঘটনাক্রম অস্পষ্ট থেকে যেতে দেওয়া যাবে না। তদন্তকে দ্রুত, স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক ও জবাবদিহিমূলক পথে এগোতে হবে। পাওয়া প্রতিটি তথ্য যাচাই করতে হবে। অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ১৩ বছরের একটি ছেলে এক বিকেলে ছবি তুলতে বের হয়েছিল। পরদিন তার মা ছেলেকে ফিরে পেলেন মৃত অবস্থায়।এই দুই মুহূর্তের মাঝখানে ঠিক কী ঘটেছিল, অপ্রতিমের পরিবারকে তার পূর্ণ সত্য জানতে দিতে হবে।
মন্তব্য করুন

