Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

ডাকসুর সংগ্রহশালা কি ইতিহাসের সংগ্রহশালা, নাকি রাজনৈতিক পছন্দের ফটো অ্যালবাম?

ছবিঃ সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

ডাকসুর সংগ্রহশালা কি ইতিহাসের সংগ্রহশালা, নাকি রাজনৈতিক পছন্দের ফটো অ্যালবাম?

ড. লুবনা ফেরদৌসী

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

ডাকসুর সংগ্রহশালা কি ইতিহাসের সংগ্রহশালা, নাকি রাজনৈতিক পছন্দের ফটো অ্যালবাম? 

এই সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা হয়েছে, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কার্যত অদৃশ্য। আমি জিন্নাহর ছবি সরানোর পক্ষে নই। একটা ইতিহাসের সংগ্রহশালায় জিন্নাহ অবশ্যই থাকতে পারেন। এমনকি ১৯৪৮ সালের সেই ছবিটিও থাকা উচিত, যেখানে ঢাকার রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। 

ইতিহাসের জাদুঘর ইতিহাসের নায়ককে দেখায়, এবং যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল সেই ক্ষমতার মুখও দেখায়। এখানে জিন্নাহর উপস্থিতি সমস্যা না। সমস্যা হলো, কাকে কোন অধ্যায়ে দৃশ্যমান করা হচ্ছে, আর কাকে কোন অধ্যায় থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে অদৃশ্য করা হচ্ছে। যার কারণে এই নতুন সংগ্রহশালাকে ইতিহাস সংরক্ষণের জায়গার চেয়ে ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে সম্পাদনা করার একটা প্রকল্প বলে বেশি মনে হচ্ছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে সাজানো ডাকসু সংগ্রহশালায় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য কোনো ছবি নেই। অথচ ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ অংশে তাঁর ছবি আছে এমন সংবাদ কাটিং, “বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই” ধরনের শিরোনাম, ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের ছবি এবং তাঁর দুই ছেলের বিয়ের ছবি রাখা হয়েছে। 

মোট কথা মুজিবকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া হয়নি। তাঁকে বেছে বেছে রাখা হয়েছে ঠিক সেই সময়টিতে, যেটি দিয়ে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত করা সবচেয়ে সহজ। ইতিহাসবিদেরা এটাকে ইতহাসতত্ত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখেন: শুধু কী দেখানো হয়েছে সেটার সাথে সাথে কী বাদ দেওয়া হয়েছে, কোন সময় থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং বাদ দেওয়ার ফলে দর্শকের সামনে কী বয়ান তৈরি হচ্ছে, সেটাও ইতিহাস নির্মাণের অংশ। এখানে সবচেয়ে চমকপ্রদ উত্তরটি  ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদকের নিজের: ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অংশে মুজিবের ছবি কেন নেই, কারণ, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।”  বাক্যটি ছোট। কিন্তু ইতিহাসচর্চার জন্য অসাধারণ একটি কেস স্টাডি। পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যও এটা। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা কারও ব্যক্তিগত ড্রইং রুম নয়, যেখানে আজ কারও ছবি ভালো লাগল বলে টাঙালাম, কাল “ইচ্ছা হয়নি” বলে নামিয়ে দিলাম। 

ইতিহাসচর্চায় “ইচ্ছা” কোনো পদ্ধতি না। সেখানে লাগে তথ্য-উপাত্ত, কনটেক্সট, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আনুপাতিকতার জ্ঞান। একজন কিউরেটরের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ যদি নির্ধারণ করে কোন ঘটনাকে দৃশ্যমান করা হবে, তাহলে সেটা আর নিরপেক্ষ কিউরেশন থাকে না; বাছাইয়ের রাজনীতি হয়ে ওঠে।

ইতিহাসতত্ত্ব আমাদের শেখায়, ইতিহাসের বয়ান শুধু যেটা বলা হয় তা দিয়ে তৈরি হয় না; যেটা বাদ দেওয়া হয়,সেটাও বয়ানের অংশ। কাউকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করেও তার জীবনের এমন অধ্যায়গুলো বেছে রাখা যায়, যাতে দর্শক একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে। এ কারণে এখানে সমস্যা হলো, কোন মুজিবকে রাখা হচ্ছে এবং কোন মুজিবকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। 

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর বিতর্কিত মুজিব দৃশ্যমান, কিন্তু ১৯৬৬ এর ছয় দফার মুজিব নেই; আগরতলা মামলার মুজিব নেই; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মুজিব নেই; ১৯৭০-এর নির্বাচনের মুজিব নেই; ৭ মার্চের মুজিব নেই। তার মানে হচ্ছে, মানুষটিকে পুরোপুরি মুছে দেওয়া হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের খতিয়ান রাখা হয়েছে, আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রমাণ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আপনি যদি বলেন, “আমরা ব্যক্তিকে না, ঘটনা দেখাচ্ছি,” তাহলে একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। 

জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের ভাষানীতি একটি ঘটনা হলে ছয় দফা ঘটনা নয় কেন? আগরতলা মামলা ঘটনা নয় কেন? ঊনসত্তর  নয় কেন? ১৯৭০ এর নির্বাচন কোন ঘটনা নয়? ৭ মার্চ ঘটনা নয় কেন? নাকি ঐতিহাসিক ঘটনার এর নতুন সংজ্ঞা হলো: যে ঘটনায় মুজিবকে সমালোচনা করা যায় সেটা ইতিহাস, আর যে ঘটনায় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা স্বীকার করতে হয় সেটা ব্যক্তিপূজা?

১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাজনৈতিক centrality নথিভুক্ত ইতিহাস। ছয় দফা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের দাবি সামনে আনে এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্র সেটাকে এতটাই গুরুতর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছিল যে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামি করা হয়। সেই মামলা ও তাঁর মুক্তির দাবিই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। 

আর এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের ইতিহাস সবচেয়ে বড় সাক্ষী। বাংলাপিডিয়া বলছে, ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ ছিল ছাত্ররাজনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছয় দফাকে এগারো দফার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে, শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিকে গণআন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করে এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে বড় ভূমিকা নেয়। মুক্তির পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আয়োজিত গণসংবর্ধনাতে তোফায়েল আহমেদ তাঁর জন্য “বঙ্গবন্ধু” উপাধি প্রস্তাব করেন। এখন ডাকসু যখন ১৯৬৯ এর ইতিহাস থেকে মুজিবকে সরিয়ে দিচ্ছে, তখন সে নিজের ছাত্রআন্দোলনের ইতিহাসের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্ব বা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ছিন্ন করছে।  আপনি আপনার পারিবারিক ছবিতে দাদাকে কেটে দিয়ে বলছেন, “আমরা তো ফ্যামিলি হিস্ট্রি রেখেছি, শুধু উনাকে রাখতে ইচ্ছা হয়নি।”

১৯৭০ এর নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬৭টি পায়। বাংলাপিডিয়া এই নির্বাচনের ফলকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ছয় দফার পক্ষে বিশাল ম্যান্ডেট হিসেবে বর্ণনা করে। তবে কি আপনি ১৯৭০ এর নির্বাচন দেখাবেন, কিন্তু সেই নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা থাকবে না, এটা কি ইতিহাস, নাকি ম্যাজিশিয়ান এর হাতসাফাই? ভোট আছে, ফল আছে, পাকিস্তানের সংকট আছে, কিন্তু যে ব্যক্তিকে ঘিরে ফলটির রাজনৈতিক অর্থ তৈরি হয়েছিল তিনি নেই। ইতিহাসে এমন অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল দলিল সংরক্ষণের কাজ না, আদর্শিক রাজনীতির কাজ।

৭ মার্চের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও হাস্যকর। ইউনেস্কো শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণকে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ভাষণটিকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানে কেউ শেখ মুজিবকে ভালোবাসতে বাধ্য নয়। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা যদি ১৯৭১ এর রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায় আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মূল বক্তাকেই সচেতনভাবে অদৃশ্য করা হয়, তাহলে সেটাকে “ব্যক্তিপূজা-বিরোধিতা” বললে চলে না। সেটা ঐতিহাসিক অনুপাতিকতার সমস্যা।

জিন্নাহর ছবি রাখুন। শুধু একটা অনুরোধ: তাঁকে সত্যিকারের ইতিহাসসহ রাখুন। ১৯৪৮ সালের রেসকোর্সের ছবি রাখুন এবং লিখুন কেন তাঁর ভাষানীতি পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল, এবং ভাষাভিত্তিক বা ভাষা আন্দোলনের পরম্পরা দেখান। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয়করণ এবং বাঙালি রাজনৈতিক অসন্তোষের সম্পর্ক দেখান। জিন্নাহকে খলনায়ক বানাবেন না, আবার অলংকারিক পূর্বপুরুষ ও বানাবেন না। 

একইভাবে মুজিবের ক্ষেত্রেও পূর্ণতা দরকার। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর শাসনামলও দেখান। একটি ম্যাচিওর সংগ্রহশালা বলবে, এই মানুষটি পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন; আবার স্বাধীনতার পর তাঁর শাসন কর্তৃত্বপরায়ণ হয়েছিল। দুটি সত্য পাশাপাশি থাকবে। যে সমাজ দুটি সত্য একসঙ্গে ধারণ করতে পারে না, সে ইতিহাস পড়ে না, সে একটা পক্ষ বেছে নেয়। জিন্নাহর ভূমিকা স্বীকার করে মুজিবের ভূমিকা মুছে দেওয়া হলে তা আর ইতিহাস থাকে না, তখন সেটা মুভির এডিটিং এর মতোই হয়, আইডিওলজিক্যাল এডিটিং ।

এখানে জিন্নাহ বনাম মুজিবের চেয়েও বড় প্রশ্ন আছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের ফার্নিচার বদলে ফেলার এই পুরোনো রোগ।এক সরকার এলে একজনকে প্রায় দেবতায় উন্নীত করা হয়। আরেক পক্ষ ক্ষমতায় এলে তাঁকে দেয়াল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তারপর তৃতীয় পক্ষ আসে এবং নিজের কুলজি তৈরি করে। ফলে আর্কাইভ আর আর্কাইভ থাকে না। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি বিজয়ীর ড্রইং রুম হয়ে যায়।

আরও একটা রাজনৈতিক বিদ্রুপ আছে। জামায়াত ও জিন্নাহর ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আজকের সুবিধামতো খুব সহজ বংশলতিকা বানানোও বৃদ্ধিবৃত্তিক অসততা। 

ইতিহাসবিদ আলী উসমান কাসমি গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মওদুদীর রাজনৈতিক চিন্তা মুসলিম লীগের জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সঙ্গে অভিন্ন ছিল না। বরং মুসলিম লীগ, জিন্নাহর নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান কী ধরনের রাষ্ট্র হবে, তা নিয়ে তাঁর মৌলিক আদর্শিক আপত্তি ছিল। এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট করেছেন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী Seyyed Vali Reza Nasr, তাঁর গবেষণায়।

তিনি দেখান, মওদুদী মুসলিম লীগকে এমনকি একটি ওয়ান ম্যান শো হিসেবেও দেখতেন এবং মুসলিম লীগ থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। ১৯৪৫ সালের নির্বাচনে জামায়াত মুসলিম লীগকে সমর্থনও করেনি। কারণ মওদুদীর প্রকল্প মুসলমানদের জন্য একটি ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠন। 

তবে এখানেও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে: Nasr সতর্ক করেন যে মওদুদীর অবস্থানকে সরলভাবে পাকিস্তান বিরোধী বলা ঠিক না। তাঁর বিরোধিতার বড় অংশ ছিল মুসলিম লীগ কী ধরনের পাকিস্তান নির্মাণ করছে এবং সেই রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জামায়াত সেই নতুন রাষ্ট্রের ভেতরেই নিজের ইসলামী রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে শুরু করে। এই ইতিহাস জানলে আজকের মজার রাজনৈতিক বৈপরীত্য চোখ এড়ানো কঠিন। মওদুদী, জিন্নাহ এবং বর্তমান বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিকে একটি সোজা আদর্শিক বংশলতিকা বানিয়ে ফেললে ইতিহাস নিজেই সম্ভবত একটু বিব্রত হবে। 

কারণ যে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রকল্পনার সঙ্গে মওদুদীর এত মৌলিক বিরোধ ছিল, সেই জিন্নাহকেই কয়েক দশক পরে মওদুদীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দাবিদারদের কেউ যদি নতুন করে নিজেদের স্বাভাবিক ঐতিহাসিক পূর্বপুরুষ হিসেবে হাজির করেন, তাহলে প্রশ্ন এটা কি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, নাকি বর্তমানের প্রয়োজন অনুযায়ী অতীতের নতুন কাস্টিং? তাই আজ যদি কেউ মওদুদী, জিন্নাহ এবং বর্তমান বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিকে এক সরল মতবাদপুষ্ট বংশলতিকা বানাতে চান, ইতিহাস সেখানে হাসাহাসি করবে।

সুতরাং এখন যদি কেউ জিন্নাহকে খুব আবেগের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক পূর্বপুরুষ হিসেবে আবিষ্কার করে, একটু আর্কাইভ দেখা ক্ষতি করবে না। নতুন দাদা গ্রহণের আগে পুরোনো পারিবারিক মামলা-মোকদ্দমা পড়ে নেওয়া ভালো। তবে আমার মূল আপত্তি জামায়াত, শিবির, আওয়ামী লীগ বা কোনো একটি দলের বিরুদ্ধে নয়। আপত্তি এই পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যেখানে ক্ষমতা বদলালেই দেয়ালে ইতিহাস বদলে যায়। এ কারণে “ইচ্ছা হয়নি” বাক্যটি আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ।

৫ আগস্ট ২০২৪ কি টাইম মেশিনে চড়ে পেছনের ইতিহাস বদরে দেয়া? শেখ হাসিনার পতনের পর কি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টে গেছে? ছয় দফার নথি কি বদলে গেছে? আগরতলা মামলার রেকর্ড কি অদৃশ্য হয়েছে? ঊনসত্তরের ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে লেখা হয়েছে? ইউনেস্কো কি ৭ মার্চের ভাষণকে রেজিস্টার থেকে সরিয়ে নিয়েছে?

না হয়নি, অতীত বদলায়নি, তবে রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলেছে। এবং এটাই আসল পার্থক্য, পলিটিক্স বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু প্রমাণের ওপর ভূতাপেক্ষ খবরদারিত্ব করতে পারে না। ডাকসুর মতো প্রতিষ্ঠানের দায় তাই আরও বড়। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর, ১৯৭১ এবং পরবর্তী গণআন্দোলনের actor। সে শুধু ইতিহাস প্রদর্শন করছে না; সে নিজের ইতিহাসও প্রদর্শন করছে। সেই জায়গায় “ইচ্ছা হয়নি” কোনো গ্রহণযোগ্য কিউরেটোরিয়াল ব্যাখ্যা না।

বিশ্ববিদ্যালয় যদি প্রমানের বদলে পক্ষপাত দিয়ে ইতিহাস সাজায়, তাহলে সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীর কাছে আমরা আর কী বৃদ্ধিবৃত্তিক মান আশা করব? জিন্নাহকে সরাবেন না। মুজিবকেও কেটে কুটে বানাবেন না। দুজনকেই কনটেক্সট সহ রাখুন। ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন, ওসমানী, জিয়া, ছাত্রনেতা, ভাষাশহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, বিরোধী কণ্ঠ, সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, সব রাখুন। যেখানে প্রশংসা প্রাপ্য সেখানে প্রশংসা, যেখানে অভিযোগ প্রাপ্য সেখানে অভিযোগ। আর যদি কোনো সংগ্রহশালার সবচেয়ে শক্তিশালী কিউরেটোরিয়াল নীতি সত্যিই হয়, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি”, তাহলে দেয়ালে একটা ছোট ফলক লাগানো যেতে পারে:

“ডাকসু সংগ্রহশালা: এখানে ইতিহাস দলিল অনুযায়ী নয়, মুড অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।”


মন্তব্য করুন

Logo