ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত
দানব যখন বহুবচন
অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম
চারপাশে এখন ঘৃণার চাষ, বিদ্বেষের পরিচর্যা এবং প্রতিশোধের রাজনৈতিক বৈধতা। প্রত্যেকে অন্যের অপরাধের বিচারক, অথচ নিজের ভুলের সামনে প্রায় সবাই নির্বাক। ভুল স্বীকারকে দুর্বলতা এবং আত্মসমালোচনাকে পরাজয় মনে করা হচ্ছে। ফলে আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না; বরং নতুন ভাষা ও নতুন মুখোশে পুরোনো ব্যর্থতাকেই পুনরুৎপাদন করছি।
আমাদের রাজনীতির মাঠে কেউ প্রতিপক্ষকে ল্যাং মেরে নিজে প্রবেশ করতে চায়, কেউ আবার সবাইকে সরিয়ে মাঠের একচ্ছত্র মালিক হতে চায়। উভয়ের চিন্তার কেন্দ্রে একই ভ্রান্তি—মাঠটি যেন দেশ নয়, কেবল ক্ষমতা দখলের জায়গা। অথচ প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার বাসনা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই নিরাপদ করে না; এটি শুধু এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে নীতি অপ্রয়োজনীয়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল এবং শক্তিই সত্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সামনে দানবটি ছিল ভয়ংকর, কিন্তু শনাক্তযোগ্য। তার অস্ত্র, অবস্থান এবং উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল। তাই তার বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ঐক্য নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল। আজ দানব আর একবচন নয়—বহুবচন। সে কখনো রাষ্ট্রের ভেতরে, কখনো দলের ভেতরে, কখনো ধর্মের ব্যাখ্যায়, কখনো দেশপ্রেমের দাবিতে, আবার কখনো নিপীড়িতের ভাষা ধার করেও আবির্ভূত হয়। এখনকার দানব কেবল মানুষ হত্যা করে না; সে সত্যের অর্থ বদলে দেয়, স্মৃতিকে সুবিধামতো সাজায়, প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির অধীন করে এবং প্রতিশোধকে ন্যায়বিচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
আরও বিপজ্জনক হলো, বড় দানবেরা একা জন্মায় না। তাদের চারপাশে তৈরি হয় অসংখ্য ক্ষুদ্র রাক্ষস—অন্ধ অনুগত, সুবিধাভোগী, অপপ্রচারক এবং নীরব সমর্থকের দল। তারা প্রত্যেকে হয়তো নিজেকে নির্দোষ মনে করে; কিন্তু তাদের সম্মিলিত আনুগত্যই অন্যায়কে ব্যবস্থা, মিথ্যাকে জনমত এবং নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিকতায় পরিণত করে। দানবের প্রকৃত শক্তি তার নিজের ক্ষমতায় যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি মানুষের বিবেক স্থগিত রাখার সম্মতিতে।
এ কারণেই আজকের সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি গভীরভাবে নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। আমরা ন্যায় চাই, কিন্তু শুধু প্রতিপক্ষের জন্য শাস্তি হিসেবে; স্বাধীনতা চাই, কিন্তু কেবল নিজের পক্ষের জন্য; সত্য চাই, তবে তা আমাদের বিশ্বাসের অনুগত হওয়া পর্যন্ত। এই দ্বৈততা মানুষকে নাগরিক থেকে অনুসারীতে এবং রাজনীতিকে জনকল্যাণের প্রক্রিয়া থেকে প্রতিশোধের যন্ত্রে পরিণত করে।
এই দেশ অসংখ্য মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নির্মিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা কেবল একটি ভূখণ্ড অর্জন নয়; মানুষের মর্যাদা, সাম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। সেই মূল্যবোধ রক্ষা না করে শুধু ইতিহাসের মালিকানা দাবি করা যায়, ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করা যায় না।
আমরা যখন পরস্পরকে মাঠ থেকে সরাতে ব্যস্ত, তখন দানবেরা আর মাঠের বাইরে অপেক্ষা করছে না; তারা আমাদের ভাষা, প্রতিষ্ঠান ও বিচারবোধের ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে। এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো কোনো পক্ষই জয়ী হবে না। কারণ সবাই যখন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাকেই বিজয় মনে করে, তখন নিঃশব্দে পরাজিত হতে থাকে দেশ।
শেষে হয়তো দেখা যাবে—আমরা কেউ কাউকে সম্পূর্ণ হারাতে পারিনি; শুধু দানবকে বহুগুণে বাড়িয়েছি এবং নিজেদের হাতে বাংলাদেশকে তার কাছে সমর্পণ করেছি।
মন্তব্য করুন

