ছবিঃ প্রথমআলো পত্রিকা থেকে সংগৃহীত
আমার অবস্থান এখানে একেবারে নীতিগত এবং দ্ব্যর্থহীন
জাকির হোসেন খান
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
আজমেরী হক বাঁধন জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলে তাঁর অতীতের কোনো প্রশ্নবিদ্ধ কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না; আবার অতীতে তিনি কোনো বিতর্কিত (?) কাজ করে থাকলে আজ তাঁর ওপর হামলা, অপমান বা সহিংসতাও বৈধ হয়ে যায় না। ন্যায়বিচার যদি ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বদলে যায়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়।
এই একই নীতিতেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকার ইতিহাস বা দাবি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীকে হত্যা, গুম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস কিংবা অন্য কোনো প্রমাণিত অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দিতে পারে না। কোনো মহৎ রাজনৈতিক অবস্থান অপরাধের আগাম ক্ষমাপত্র নয়। ঠিক একইভাবে জুলাইয়ে অংশগ্রহণও কারও অতীতের জন্য দায়মুক্তির সনদ হতে পারে না। প্রত্যেক কাজকে তার নিজস্ব তথ্য, প্রমাণ, আইন ও নৈতিকতার ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
Khufiya নিয়ে সমালোচনার অবশ্যই জায়গা আছে। ছবিটির কাহিনিতে বাংলাদেশকে ভারত-পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বাঁধনের চরিত্র হীনা রহমান গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত। নেটফ্লিক্সের নিজস্ব বর্ণনাতেও বাংলাদেশকে ঘিরে ‘র’ ও ‘আইএসআই’ প্রতিযোগিতার এই রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে। এর আগে মেহজাবীন চৌধুরী ও বিদ্যা সিনহা মিম ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল; তাঁদের একজন বাংলাদেশের উপস্থাপন নিয়ে আপত্তির কথাও বলেছিলেন। কাজেই একজন বাংলাদেশি নাগরিক চাইলে বাঁধনের সেই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সিদ্ধান্তের কঠোর রাজনৈতিক বা নৈতিক সমালোচনা করতেই পারেন।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা দরকার। একটি চলচ্চিত্রে ‘র’-এর চরিত্রে বা ‘র’-ঘনিষ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করা আর বাস্তবে ‘র’-এর হয়ে কাজ করা এক বিষয় নয়। আমি এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাইনি যে Khufiya তে বাঁধন ‘র’--এর নির্দেশে কাজ করেছেন। ছবিটি একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র, সাবেক ‘র’- কর্মকর্তা অমর ভূষণের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। অভিনেত্রী হিসেবে একটি বিতর্কিত চরিত্র গ্রহণের জন্য তাঁকে প্রশ্ন করা যায়; কিন্তু সেখান থেকে বাস্তব গুপ্তচরবৃত্তির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রমাণ নয়, অনুমান।
কিছু অতিরঞ্জিত বক্তব্যে হীনাকে বিভিন্ন বর্ণনায় ‘র’ও ‘আইএসআই’-এর মধ্যে দ্বৈত ভূমিকার চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে; তাঁর লক্ষ্যকে কোনো নির্ভরযোগ্য উৎসে সরলভাবে “জামায়াতের একজন নেতাকে হত্যা”হিসেবে আমি নিশ্চিত করতে পারিনি। উৎসভেদে তাকে বাংলাদেশি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, আইএসআই - এর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা “Mirza” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কাজেই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশবিরোধী বয়ান তৈরি করেছে কি না, সেটি নিয়ে তর্ক আছে, কিন্তু কাল্পনিক চরিত্রের ঘটনাকে অভিনেত্রীর বাস্তব অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যুক্তিগতভাবে টেকে না।
জুলাইয়ের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা দরকার। বাঁধনের ১ আগস্ট ২০২৪-এর প্রকাশ্য অংশগ্রহণ নথিবদ্ধ। সেদিন তিনি অন্য শিল্পীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন। সরকার পতন হয় ৫ আগস্ট। কেউ বলতে পারেন তিনি আরও আগে কেন নামেননি, এটি ন্যায্য রাজনৈতিক প্রশ্ন। কিন্তু “তিনি নির্দেশ ছাড়া কোনো আন্দোলনে যান না” বা তাঁকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য ‘র/লীগ’ সামনে রেখে দিয়েছিল, এই সিদ্ধান্তের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দরকার। সন্দেহ তদন্তের সূচনা হতে পারে; সন্দেহ নিজে প্রমাণ নয়।
ভেনিসের ঘটনাতেও একই মানদণ্ড প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনে হামলাকারীদের কয়েকজনকে আওয়ামী লীগ/নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সমর্থক বা কর্মী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে শোনা গেছে এবং তারা বাঁধনকে “জুলাই জঙ্গি/যোদ্ধা” বলে আক্রমণ করেছে। শিশুর উপস্থিতিতেও উত্তেজনামূলক আচরণের ভিডিও রয়েছে। এটুকু তদন্তযোগ্য দৃশ্যমান ঘটনা। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয় ভেনিসে ছিলেন, এ কথা বাঁধন নিজেও উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং বাঁধনকে “জুলাই যোদ্ধা” বলে পবিত্র বানানোরও প্রয়োজন নেই, আবার Khufiya দেখিয়ে তাঁকে গুপ্তচর বানানোরও প্রয়োজন নেই। তাঁর অতীতের প্রতিটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের সমালোচনা হোক; কোনো আইনভঙ্গের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তদন্ত হোক। একই সঙ্গে তাঁর ওপর হামলাকারী এবং হামলার পেছনে কোনো সংগঠক বা নির্দেশদাতা থাকলে তাদেরও শনাক্ত করে বিচার করতে হবে।
ন্যায়বিচারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি এখানেই, আমি যার অতীতের সমালোচক, তার বর্তমান অধিকারও কি সমানভাবে রক্ষা করতে পারি?
একটি ভালো কাজ দশটি অপরাধ মুছে দেয় না। আবার দশটি ভুলও কাউকে মারধর করার লাইসেন্স দেয় না।
জুলাইয়ের পক্ষে থাকা দায়মুক্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা দায়মুক্তি নয়। বিরোধী রাজনীতি করা দায়মুক্তি নয়। ক্ষমতায় থাকা দায়মুক্তি নয়। আর কারও অতীত পছন্দ না হওয়াও তার ওপর সহিংসতার অনুমতি নয়।
ব্যক্তি নয়—কর্মের বিচার; পরিচয় নয়—প্রমাণের বিচার। এটাই ন্যায়বিচার।
মন্তব্য করুন

