Logo

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

×

Follow Us

শিশু ধর্ষণের মামলা ঊর্ধ্বমুখী: নিরাপদ নয় শিশুর ঘরও

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

শিশু ধর্ষণের মামলা ঊর্ধ্বমুখী: নিরাপদ নয় শিশুর ঘরও

দীপু মাহমুদ

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম

একজন শিশু মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফিরছিল। পথে ১০০ টাকা ভাঙতি করতে সে এক দোকানে গিয়েছিল। বিস্কুট দেওয়ার কথা বলে তাকে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। শুধু তা-ই নয়, ঘটনার ভিডিও ধারণ করে পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে শিশুকে আবারও কাছে ডাকা হয়েছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন নৃশংসতা নয়, বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নিরাপত্তার সংকট কতটা গভীর হয়ে গেছে তারই ভয়াবহ চেহারা।

সবচেয়ে উদ্বেগের খবর এসেছে পুলিশের পরিসংখ্যানে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই-মাত্র সাত মাসে সারা দেশে শিশুধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে শিশুধর্ষণের মামলা হয়েছিল ৯৯৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে মামলার সংখ্যা ছিল ৭৫১, সে তুলনায় দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। হিসাবটি আরও ভয়াবহ করে দেখলে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতটি শিশুধর্ষণের মামলা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার- এগুলো ধর্ষণের প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা নয়, পুলিশের কাছে নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা। সামাজিক লজ্জা, ভয়, পারিবারিক চাপ, প্রভাবশালী অপরাধীর হুমকি এবং শিশুর ওপরই দোষ চাপানোর সংস্কৃতির কারণে বহু ঘটনা থানায় পৌঁছায় না। ফলে পুলিশের পরিসংখ্যান যতটা ভয়াবহ, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পুলিশের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, অনেক পরিবার সামাজিক ও পারিবারিক চাপে ঘটনা গোপন রাখে বা মামলা করতে দেরি করে। 

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি শুধু সংখ্যায় নয়- অপরাধীদের পরিচয়ে। শিশুর নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি যে সব সময় অচেনা কেউ নয়, সেটাই বারবার সামনে আসছে। পুলিশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শিশুধর্ষণের বড় অংশ ঘটে পরিচিত ব্যক্তি, স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বিশ্বাসভাজন মানুষের মাধ্যমে।

অর্থাৎ যে মানুষের সঙ্গে শিশুকে নিরাপদে রেখে আমরা নিশ্চিন্ত হই, কখনো কখনো সেই মানুষটিই হয়ে উঠছে তার সবচেয়ে বড় বিপদ। যে আত্মীয়কে শিশুর অভিভাবক মনে করা হয়, যে প্রতিবেশীকে পরিবারের মানুষ ভাবা হয়, যে শিক্ষককে জ্ঞান ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয়- তাঁদের কারও কারও হাতে শিশুর শৈশব, শরীর ও মানসিক নিরাপত্তা ধ্বংস হচ্ছে। ইউনিসেফও বলেছে, বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার অপরাধীরা প্রায়ই ভুক্তভোগীর পরিচিত মানুষ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের এক গবেষণাও আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো। শিশু যৌন নির্যাতন নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের বড় অংশ অপরাধী হিসেবে পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষকে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় দেখিয়েছে, যৌন নির্যাতনের অভিঘাতে শিশুরা নিদ্রাহীনতা, ভয়, লজ্জা, হীনম্মন্যতা, দুশ্চিন্তা ও হতাশার মতো দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যায় ভোগে।

এই জায়গাটিতেই আমাদের সামাজিক ব্যর্থতাটি সবচেয়ে স্পষ্ট। আমরা শিশুকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে প্রায়ই তাকে শেখাই- ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’, ‘অচেনা কারও সঙ্গে যাবে না’। কিন্তু তাকে কি শেখাই, পরিচিত কেউ অনুপযুক্তভাবে শরীর স্পর্শ করলে কী করতে হবে? তাকে কি শেখাই, আত্মীয় হলেও কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে ‘না’ বলতে হবে? তাকে কি এমন পরিবেশ দিই, যেখানে ভয় না পেয়ে সে মা-বাবাকে সব কথা বলতে পারে? আর মা-বাবারাও কি সন্তানের কথাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন?

শিশু সুরক্ষা শুধু ‘সচেতনতা’ দিয়ে হবে না। কারণ সমস্যাটি এখন ব্যক্তিগত অপরাধের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য বলছে, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাস্তির অভিজ্ঞতা পেয়েছে। অর্থাৎ শিশুর প্রতি সহিংস আচরণ আমাদের সমাজে ব্যতিক্রম নয়, তা অনেকাংশে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে টিকে আছে।

শিশুধর্ষণের মামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্নটিও সামনে আসে। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল, এর মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

এমন বিচারজট অপরাধীদের জন্য কী বার্তা দেয়? একজন শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর যদি বছরের পর বছর বিচার না হয়, পরিবারকে যদি আদালত, থানা, তদন্ত ও সাক্ষ্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, তাহলে অপরাধীর কাছে আইনের ভয় কতটা কার্যকর থাকবে? দ্রুত বিচার মানে শুধু দ্রুত রায় নয়- শিশুবান্ধব তদন্ত, নিরাপদ সাক্ষ্যগ্রহণ, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং প্রমাণ সংগ্রহের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৬ সালের শুরুতেই শিশুদের ওপর সহিংসতার ধারাবাহিক ঘটনায় ইউনিসেফ বাংলাদেশ বলেছে, প্রতিরোধ, রিপোর্টিং, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, সামাজিক সেবা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি আছে।

তাই শুধু ধর্ষকের শাস্তি চাইলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। শিশু কেন নিরাপদ ছিল না- সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। পরিবারে শিশু সুরক্ষার শিক্ষা, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক safeguarding ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মচারীদের যথাযথ যাচাই, শিশুর অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত সমাজকর্মী ও কেসওয়ার্কার, পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শিশুবান্ধব প্রশিক্ষণ- এসবকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে মামলা প্রত্যাহার, সালিস বা সামাজিক চাপে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ধর্ষণ কোনো পারিবারিক বিবাদ নয়, সালিসযোগ্য বিষয়ও নয়।

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি- শিশুকে দোষী বা দায়ী করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিশুর পোশাক, চলাফেরা, কথা বলা, কার সঙ্গে মিশেছে- এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপরাধীর দায় শিশুর ওপর চাপানো শুধু অন্যায় নয়, অপরাধীকে আড়াল করারই আরেকটি পদ্ধতি। শিশু অপরাধের শিকার হলে তার প্রথম প্রয়োজন নিরাপত্তা, দ্বিতীয় প্রয়োজন বিশ্বাস, তৃতীয় প্রয়োজন চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচার।

আমরা উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়ে যাওয়ার হিসাব করি। কিন্তু একটি সমাজের প্রকৃত সভ্যতা বোঝা যায় সে সমাজ তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিকে কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তা দিয়ে। যে দেশে একজন শিশু ঘর থেকে বের হলে যেমন ঝুঁকিতে থাকে, আবার ঘরের ভেতর পরিচিত মানুষের কাছেও নিরাপদ নয়, সেখানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প দিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
শিশুধর্ষণের মামলা সাত মাসে ৪৯ শতাংশ বেড়েছে- এটা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটা আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি লাল সংকেত। আজই যদি রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ মিলে এই সংকেতকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে আগামী দিনের পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ হবে। একজন শিশুর শৈশব নষ্ট হওয়ার পর কোনো বিচার, কোনো ক্ষতিপূরণ, কোনো রাষ্ট্রীয় বিবৃতি সেই শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারে না।

শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, কোনো সামাজিক অনুগ্রহও নয়। নিরাপত্তা শিশুর মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একজন শিশুকে ব্যর্থ করা নয়- আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎকেই ব্যর্থ করে দেওয়া।

মন্তব্য করুন

Logo