লুবনা ফেরদৌসী
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
একজন শিক্ষিকার হাসি কেন সমাজের নৈতিক আতঙ্ক?একজন শিক্ষক হিসেবে আরেকজন শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো আমার কাছে শুধু সহমর্মিতার বিষয় নয়; এটি আমার নারীবাদী অবস্থান, আমার নৈতিক দায়িত্ব। তাই গ্রীস থেকে এই কয়েকটি কথা। আর এই ভিডিওটি ফেঞ্চুগঞ্জের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পালের প্রতি আমার সংহতি।
আমাদের সমাজের একটি অসাধারণ প্রতিভা আছে। শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। শিশুরা শেখার সংকটে থাকতে পারে। হাজার হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য থাকতে পারে। বিদ্যালয়ে টয়লেট নাও থাকতে পারে, শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের অভাব থাকতে পারে, শিক্ষকদের বেতন নিয়ে বছরের পর বছর প্রশ্ন থাকতে পারে। এসব নিয়ে জাতির ঘুম নষ্ট হয় না। কিন্তু একজন নারী শিক্ষিকা যদি শাড়ি পরে বাতাসে বা বৃষ্টিতে হাঁটেন, একটি গান যুক্ত করে নিজের ফেসবুকে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও আপলোড করেন, তখন পুরো জাতি যেন হঠাৎ নৈতিকতার নোবেল কমিটিতে পরিণত হয়।
এমন দ্রুত জাতীয় ঐক্য আমরা নির্বাচনেও দেখি না। মনে হয়, দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত সংকট হলো—একজন শিক্ষিকা কেন হাসলেন, কেন রিল বানালেন, কেন খোলা চুলে গানের তালে হাঁটলেন। যাঁরা এটিকে একজন নারী শিক্ষকের নাচ-গানের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক বলতে চাইছেন, তাঁদের কাছে দুঃখিত। এটি কখনোই নাচ বা গান নিয়ে ছিল না। এটি সবসময়ই ছিল নারীর শরীর, দৃশ্যমানতা এবং আনন্দকে নিয়ন্ত্রণ করার রাজনীতি নিয়ে।
একজন নারী কোথায় যাবেন, কী পরবেন, কীভাবে হাসবেন, কত জোরে হাসবেন, ছবি তুলবেন কি না, ভিডিও দেবেন কি না, নাচবেন কি না—সবকিছুর ওপর যেন সমাজের এক অদৃশ্য মালিকানা প্রতিষ্ঠিত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই একই সমাজ শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় গান, আবৃত্তি, অভিনয়, নাচসহ সাংস্কৃতিক দক্ষতাকে সহশিক্ষা কার্যক্রমের উৎকর্ষ (এক্সট্রা-কারিকুলার এক্সেলেন্স) হিসেবে মূল্যায়ন করে। অর্থাৎ চাকরি পাওয়ার আগে শিল্পী হওয়া যোগ্যতা, আর চাকরি পাওয়ার পরে শিল্পী থাকা অপরাধ। এর চেয়ে বড় সামাজিক ভণ্ডামি আর কী হতে পারে?
আরেকটি বিষয় আমাকে আরও বেশি ভাবায়। বাংলাদেশে একজন শিক্ষক সম্পর্কে আমাদের কল্পনা কেমন? ক্লান্ত, গম্ভীর, আর্থিকভাবে দুর্বল, সাধারণ পোশাকের একজন মানুষ? যার কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই? শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি তাঁকে নাগরিকত্বও জমা দিতে হবে?
আমি মনে করি, এই ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এখানে আরও গভীর একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করছে। সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন 'রেসপেক্টেবিলিটি পলিটিকস'। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু পেশার মানুষকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে শুধু দক্ষ হলেই চলে না; তাঁদের একটি নির্দিষ্ট নৈতিক চরিত্রও অভিনয় করতে হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতা সেই পেশাগুলোর অন্যতম। একই সঙ্গে আমি বিষয়টিকে শ্রেণিগত প্রশ্ন হিসেবেও দেখি। আমাদের সমাজ এখনও শিক্ষকদের নিয়ে এক ধরনের রোমান্টিক দারিদ্র্যের কল্পনা পোষণ করে। যেন একজন 'ভালো' শিক্ষক মানেই অল্পে সন্তুষ্ট, সাধারণ পোশাকের, নিঃস্বার্থ এবং ব্যক্তিগত আনন্দবিহীন মানুষ।
শিক্ষক যদি ভালো পোশাক পরেন, ভ্রমণ করেন, সুন্দর ছবি তোলেন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান, তখন অনেকের মনে হয় তিনি যেন শিক্ষকতার অলিখিত সামাজিক চুক্তি ভেঙে ফেলেছেন।
আমরা শিক্ষককে সম্মান করি, তাঁর জ্ঞান চাই; কিন্তু তাঁর মানবিক জীবনকে স্বীকৃতি দিতে চাই না। যেন শিক্ষক হওয়া মানেই মানুষ হওয়া থেকে অবসর নেওয়া। কিন্তু এখানেই আরেকটি গভীর নারীবাদী প্রশ্ন রয়েছে। এই নৈতিক অভিনয়ের চাপ কি নারী ও পুরুষ শিক্ষকের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে? বাস্তবতা বলছে—না।
একজন পুরুষ শিক্ষককে ভালো শিক্ষক প্রমাণ করতে মূলত তাঁর পেশাগত দক্ষতা বিচার করা হয়। কিন্তু একজন নারী শিক্ষিকার ক্ষেত্রে দক্ষতার পাশাপাশি তাঁর পোশাক, শরীরী ভাষা, হাসি, ব্যক্তিগত জীবন, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতিও মূল্যায়নের অংশ হয়ে যায়। তাঁর শুধু শিক্ষকতাই নয়, তাঁর নারীত্বও সারাক্ষণ পরীক্ষার মধ্যে থাকে।
খেয়াল করে দেখুন, এই ধরনের নৈতিক আতঙ্ক প্রায় সবসময় নারীদের ঘিরেই তৈরি হয়। কোনো পুরুষ শিক্ষক সমুদ্রসৈকতে ঘুরছেন, বন্ধুদের সঙ্গে গান গাইছেন কিংবা ভ্রমণের ছবি দিচ্ছেন—তা নিয়ে কি জাতীয় বিতর্ক হয়? বরং বলা হয়, শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ; তাঁরও আনন্দ-বেদনা আছে। কিন্তু একজন নারী শিক্ষিকা কয়েক সেকেন্ড হাঁটলেন, আর পুরো সমাজ তাঁর চরিত্র, পেশাগত যোগ্যতা এবং নৈতিকতা বিচার করতে বসে গেল। এটিই হলো জেন্ডারভিত্তিক নজরদারি (Gendered Surveillance)।
একজন নারী শিক্ষিকার পেশাগত যোগ্যতা আর তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেন একজন মানুষ একই সঙ্গে দায়িত্বশীল শিক্ষক এবং আনন্দপ্রিয় মানুষ হতে পারেন না। অথচ শিক্ষা গবেষণা বলছে, শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে সেই শিক্ষকের কাছ থেকে, যিনি প্রাণবন্ত, সৃজনশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং মানবিক। তাহলে একজন শিক্ষকের হাসি, শিল্পচর্চা বা আনন্দকে কেন তাঁর পেশাগত দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হবে? এই যুক্তির কোনো শিক্ষাবিজ্ঞান নেই; আছে শুধু নৈতিক আতঙ্ক।
আসলে পিতৃতন্ত্র শুধু নারীদের নিয়ন্ত্রণ করে না, তাদের অবিরাম পর্যবেক্ষণও করে। তারা কী পরলেন, কী বললেন, কীভাবে হাঁটলেন, কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে গেলেন—এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা আনন্দ করছেন কি না।
কারণ আনন্দিত নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে কঠিন। যে নারী নিজের আনন্দের মালিক, সে কম ভয় পায়। আর যে কম ভয় পায়, তাকে শাসন করাও কঠিন। তাই ইতিহাসজুড়ে নারীর হাসি, নাচ, গান, শরীর, সৌন্দর্য—সবকিছুকেই নৈতিকতার আদালতে দাঁড় করানো হয়েছে।
তবে এই ঘটনার আরেকটি দিক আমাকে আশাবাদী করেছে। হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা নিজেদের ভিডিও পোস্ট করেছেন। কেউ নেচেছেন, কেউ শুধু হেঁটেছেন, কেউ গান গেয়েছেন। অনেকেই কোনো ব্যাখ্যাও দেননি। এটাই সবচেয়ে সুন্দর অংশ। কারণ স্বাধীনতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হলো স্বাভাবিক জীবনযাপন।
যে সমাজ একজন নারীর হাঁটাকেই রাজনৈতিক করে তোলে, সেখানে হাঁটাই প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। যে সমাজ একজন শিক্ষিকার হাসিকে অপরাধ বানায়, সেখানে সেই হাসিই প্রতিরোধ।
আবার একটি পোস্টে দেখলাম, বলা হচ্ছে—এটিকে এত বড় বিষয় বানানোর কী আছে? আমি বলব, সমাজবিজ্ঞান আমাদের ঠিক উল্টো কথাই শেখায়। ক্ষমতা সবসময় বড় বড় আইন দিয়ে কাজ করে না। ক্ষমতা মানুষের চোখ দিয়েও কাজ করে; কাজ করে মন্তব্যের ঘর, লজ্জা, উপহাস এবং চরিত্রহননের মধ্য দিয়ে।
এখানে মিশেল ফুকোর ক্ষমতা ও নজরদারির তত্ত্ব উল্লেখ করা জরুরি। ফুকো দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ক্ষমতা শুধু আইন বা শাস্তির মাধ্যমে কাজ করে না; বরং মানুষকে এমন এক স্থায়ী পর্যবেক্ষণের অনুভূতির মধ্যে রাখে, যাতে মানুষ নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই ডিজিটাল প্যানঅপটিকন-এর নতুন রূপ। শুধু বিউটি পালকে ট্রল করেই বিষয়টি শেষ হয় না। এই ট্রলিং দেখে ভবিষ্যতে আরও কত নারী শিক্ষিকা নিজের ছবি পোস্ট করার আগে, হাসার আগে, নাচার আগে, এমনকি নিজের আনন্দ প্রকাশের আগেও দুবার ভাববেন। এভাবেই ক্ষমতা কাজ করে—একজনকে শাস্তি দিয়ে হাজারজনকে নীরব করে।
যেখানে নারীরা জানেন, তাঁরা সবসময় দেখা হচ্ছেন, বিচার করা হচ্ছে, স্ক্রিনশট নেওয়া হচ্ছে, ভাইরাল করা হচ্ছে; সেখানে বাইরের নজরদারি ধীরে ধীরে আত্ম-নজরদারিতে (Self-policing) পরিণত হয়।
এই কারণেই আমি বিউটি পালের পাশে দাঁড়াচ্ছি। একজন শিক্ষক হিসেবে এটি আমার পেশাগত সংহতি, একজন সচেতন নারীবাদী নারী হিসেবে এটি আমার স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান এবং একজন গবেষক হিসেবে আমি জানি, এই ঘটনা কোনো একক ব্যক্তিকে ঘিরে নয়।
এটি এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে একজন নারী শিক্ষিকার কয়েক সেকেন্ডের হাঁটা বা নাচকে পেশাগত সংকট হিসেবে দেখা হয়, অথচ শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সংকট নিয়ে সমাজের একই নৈতিক অস্থিরতা, একই ক্ষোভ কিংবা একই তৎপরতা কখনোই দেখা যায় না।
আর একটি কথা। আমরা যদি সত্যিই শিক্ষকদের সম্মান করতে চাই, তাহলে তাঁদের দেবতার আসনে বসাবেন না; মানুষ হতে দিন। কারণ একজন ভালো শিক্ষক রোবট নন। তিনি পড়ান, হাসেন, ভ্রমণ করেন, নাচেন, কাঁদেন, ভালোবাসেন। আর এই মানবিকতাই তাঁকে একজন ভালো শিক্ষক করে তোলে।
মন্তব্য করুন

