Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

দীর্ঘ নিরবতার নীরব বেদনা

'আধুনিকতা'র চাপে ভাঙছে আদিবাসি পরিবারও, হারিয়ে যাচ্ছে আদিবাসীদের বহু প্রজন্মের লালিত জ্ঞান

মত-দ্বিমত

নির্বাসনের বিস্রস্ত জার্নাল

দীর্ঘ নিরবতার নীরব বেদনা

ক্যবা মং মারমা

Icon

ক্যবা মং মারমা

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

কখনো কখনো একটি সংবাদ কেবল সংবাদ হয়ে আসে না; সে যেন নিঃশব্দে হেঁটে আসে, আর বুকের ভেতর রেখে যায় এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়া। সম্প্রতি জানলাম, একটি আদিবাসী মারমা দম্পতির ঘর ভেঙে গেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, আর তাঁদের দুই-তিন বছরের একটি ছোট্ট সন্তান রয়ে গেছে সেই ভাঙনের ঠিক মাঝখানে। যেন একটি নদীর দুই তীর হঠাৎ বিপরীত দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, আর শিশুটি যেন দাঁড়িয়ে আছে জলের ওপর, যেখানে মাটি নেই, আছে শুধু প্রতিফলন।

একটি সংসার ভাঙা মানে শুধু দুটি মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়। তার সঙ্গে ভেঙে যায় বহু স্বপ্ন, অপূর্ণ থেকে যায় বহু প্রতিশ্রুতি। অনিশ্চয়তার এক ছায়া নেমে আসে একটি শিশুর ভবিষ্যতের ওপর—যেন আকাশের একটি টুকরো কেউ কেটে নিয়ে গেছে, আর সেই ফাঁকা জায়গাটা আর কখনো নীল হয়ে ওঠে না। বিবাহবিচ্ছেদের কাগজে হয়তো কেবল দুটি নাম লেখা থাকে, কিন্তু তার আড়ালে জমে থাকে অগণিত না-বলা কথা, দীর্ঘ নীরবতা আর নীরব যন্ত্রণার এক ইতিহাস, যা সময়ের নিচে পলির মতো জমতে থাকে।

এই ঘটনা নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে এই ভাঙনের পেছনে স্বামীর কিছু আচরণ ও তাঁর পরিবারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সংসারের ভেতরের সব সত্য বাইরের কেউ পুরোপুরি জানতে পারে না—প্রত্যেক মানুষেরই থাকে নিজস্ব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব কষ্ট, নিজস্ব ব্যাখ্যা, যেন প্রত্যেকে দাঁড়িয়ে আছে আলাদা এক আয়নার সামনে, আর সেই আয়না তাকে দেখাচ্ছে নিজস্ব এক সত্য। তাই এই লেখা কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়; বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান। আমার কাছে একটি সত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে—একটি পরিবার বেঁচে থাকে ভালোবাসায়, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে সত্য আর ন্যায়ের ওপর। ভালোবাসা যদি সত্যকে আড়াল করে, আর পক্ষপাত যদি ন্যায়বোধকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে সেই সংসারের ভিত ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে, যেমন জোয়ারের জল নিঃশব্দে ভেঙে ফেলে বালির দুর্গ।

অনেক বাবা-মা সন্তানের ভুলকে অন্ধ স্নেহে ঢেকে রাখেন, মনে করেন এভাবেই সন্তানকে রক্ষা করছেন। কিন্তু বাস্তবে ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া সন্তানের জন্যও মঙ্গলজনক নয়—কারণ অন্যায়কে সমর্থন করলে অন্যায় আরও দৃঢ় হয়, আর চাপা দেওয়া সত্য একদিন কুয়াশার মতো ফিরে আসে, পুরো পরিবারকে আচ্ছন্ন করে  দিয়ে। বিয়ের পর যে মেয়েটি একটি পরিবারে আসে, সে আর "অন্যের মেয়ে" থাকে না—সে সেই পরিবারেরই একজন সদস্য। তাকে যদি সবসময় বাইরের মানুষ হিসেবে দেখা হয়, তবে হয়তো একটি বাড়ি গড়ে ওঠে, কিন্তু একটি পরিবার গড়ে ওঠে না—একটি খোলস তৈরি হয়, প্রাণহীন। একইভাবে, একজন স্ত্রীরও উচিত শ্বশুর-শাশুড়িকে যতটা সম্ভব নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান করার চেষ্টা করা। কারণ সংসার শুধু অধিকারের নাম নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব, সহমর্মিতা আর সম্মানেরও নাম।

যতটুকু জানা যায়, স্ত্রী তাঁর স্বামীকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন। পরিবারটি আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল না, কিন্তু সুখের ভিত্তি তো কেবল অর্থ নয়—মানুষ অল্প সম্পদ নিয়েও শান্তিতে বাঁচতে পারে, যদি সেখানে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অটুট থাকে। কিন্তু অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় দারিদ্র্যের কারণে নয়; ভেঙে যায় বিশ্বাসের সংকটে, যেন একটি প্রদীপের ভেতরের শিখা নিভে যায়, অথচ বাইরের কাচ অক্ষত থেকে যায়—দেখতে সবকিছু ঠিক থাকে, কিন্তু আলো আর থাকে না।

স্ত্রীর অভিযোগ ছিল—স্বামী অন্য এক নারীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখতেন এবং তাঁর জন্য অর্থ ব্যয় করতেন। এসব আচরণ হয়তো অন্য কারো কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু যে মানুষ গভীরভাবে ভালোবাসে, তার কাছে প্রিয় মানুষের অবহেলা বা বিশ্বাসের বিচ্যুতি সবচেয়ে গভীর আঘাত হয়ে আসে—যেন হৃদয়ের ভেতর একটি ঘণ্টা বেজে ওঠে, যার শব্দ কেউ শোনে না, শুধু যে বাজায় সে-ই শোনে। কারণ ভালোবাসা কেবল অনুভূতির নাম নয়, এটি বিশ্বাসেরও আরেক নাম।

বিষয়টি একসময় সামাজিক মধ্যস্থতার পর্যায়েও পৌঁছেছিল। পরে স্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিচার চলাকালে তিনি নিজের অভিযোগ পুরোপুরি তুলে ধরেননি—আশঙ্কা ছিল, এতে স্বামী কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন, তাই কিছু সত্য গোপন রেখেছিলেন, যেন নিজের ক্ষতস্থানের ওপর নিজেই একটি পাতা চাপা দিয়ে রাখলেন। ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে নিজের কষ্ট নীরবে সহ্য করতে শেখায়। কিন্তু যে ভালোবাসা বারবার নিজের সত্যকে অস্বীকার করে, শেষ পর্যন্ত সেই ভালোবাসাই সবচেয়ে বেশি আহত হয়।

স্থায়ী কোনো সমাধান না হওয়ায় স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান এবং দীর্ঘ সময় সেখানে থাকেন। জানা যায়, এই সময়ে পুনর্মিলনের আন্তরিক চেষ্টা কিংবা সন্তানের নিয়মিত খোঁজখবর তেমন দেখা যায়নি। আজকের পৃথিবীতে একটি ফোনকল করতে কয়েক মিনিটও লাগে না, অথচ মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা কিলোমিটারে নয়—মাপা যায় নীরবতায়।

পরে স্বামী তাঁর বাবা-মাকে নিয়ে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে যান। কিন্তু তখনও মূল সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। স্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, কেবল একই ছাদের নিচে ফিরে যাওয়াই সমাধান নয়—পরিবর্তনের নিশ্চয়তা ছাড়া সেই ফিরে যাওয়া মানে পুরোনো যন্ত্রণার কাছেই ফিরে যাওয়া। কিছুদিন পর বিবাহবিচ্ছেদের প্রস্তাব আসে, আর একদিন সম্পর্কটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে যায়—যেন একটি সেতু, যার নিচে বহুদিন জল বইছিল না, শেষ পর্যন্ত নিজের ভারেই ভেঙে পড়ল।

এই সংসারটি রক্ষা করার জন্য আমাকেও অনুরোধ করা হয়েছিল, আমি চেষ্টাও করেছিলাম। ছেলেটির কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চেয়েছিলাম, কারণ অনেক সময় বন্ধুর একটি আন্তরিক কথা পরিবারের বহু উপদেশের চেয়েও কার্যকর হয়—কিন্তু তেমন কাউকে খুঁজে পাইনি। মেয়ের পরিবারকে বলেছিলাম তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নিতে, আর তাঁরা অপেক্ষা করতেও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু যখন দুই তীরের মাঝখানের সেতুটি ভেঙে যায়, তখন নদী আর কেবল প্রবাহিত হয় না—সে দূরত্বও বাড়িয়ে দেয়, আর একদিন দুই তীর এতটাই দূরে সরে যায় যে একে অপরের কণ্ঠস্বরও আর পৌঁছায় না।

এই ঘটনা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে—দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি ধনসম্পদ নয়, বিশ্বস্ততা। একটি সংসারকে টিকিয়ে রাখে সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান, আর প্রতিদিন নতুন করে একে অপরকে ভালোবাসার ইচ্ছা। একজন লেখকের একটি কথা আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে—"বিয়ের পরই প্রেম শুরু।" কথাটি গভীর সত্য বহন করে। বিয়ে প্রেমের সমাপ্তি নয়, বরং তার প্রকৃত সূচনা—প্রতিদিন নতুন করে একে অপরকে জানা, ভুল স্বীকার করা, ক্ষমা করতে শেখা, একসঙ্গে বদলে যাওয়া, আর জীবনের দীর্ঘ পথ পাশাপাশি হেঁটে চলা।

মারমা সমাজে একটি সুন্দর প্রবাদ আছে—"ভালোবাসা থাকলে ডুমুর গাছের পাতার উপরেও দুজনে একসাথে ঘুমানো যায়।" এই প্রবাদ আমাদের শেখায়, প্রকৃত ভালোবাসা থাকলে অভাব মানুষকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু সম্পর্ককে ভাঙতে পারে না। আবার ভালোবাসা হারিয়ে গেলে রাজপ্রাসাদও মানুষের কাছে শূন্য এক গুহা মনে হয়, যেখানে শুধু নিজের পায়ের শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। মারমা সমাজ বহুগামিতা, নারীলোভ কিংবা একাধিক সংসার গড়ে তোলার প্রবণতাকে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করে—কারণ সমাজ জানে, একজন মানুষের অবিশ্বস্ততা কেবল একটি সম্পর্ককেই ভেঙে দেয় না, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিশ্বাসের ভিত্তিকেও নাড়া দেয়।

আর সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় সেই শিশুটি, যে কিছুই বোঝে না। সে জানে না কেন একদিন বাবা আর মা আলাদা হয়ে গেলেন। সে শুধু বড় হতে হতে অনুভব করে, তার শৈশবের কোথাও যেন একটি শূন্যতা রয়ে গেছে—একটি ঘর, যার দরজা আছে, জানালা আছে, কিন্তু ভেতরে কেউ থাকে না। অবশ্য সব সংসার যে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হবে, এমন নয়। যেখানে সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা মানুষের মর্যাদা বারবার লঙ্ঘিত হয়, সেখানে বিচ্ছেদই কখনো কখনো নিরাপদ ও মানবিক সিদ্ধান্ত—একটি ঝড়ের পর আকাশ পরিষ্কার হওয়ার মতো। কিন্তু যেখানে এখনও সংলাপের সুযোগ আছে, ভুল স্বীকারের সাহস আছে, আর পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে, সেখানে বিচ্ছেদের আগে সম্পর্ককে আরেকবার সুযোগ দেওয়া কি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব নয়?

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। সন্তানের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কোনো বাবা-মা শেষ পর্যন্ত সন্তানের উপকার করেন না। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস—পক্ষপাত, প্রতারণা কিংবা অহংকার নয়। আর সমাজের মধ্যস্থতাও তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের নয়, সত্য ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ায়।

আজও আমার মনে একটি নীরব প্রার্থনা জাগে: যদি কোনো এক সকাল মানুষকে নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, যদি আহত হৃদয় ক্ষমার শক্তি খুঁজে পায়, যদি ভালোবাসা আবারও পথ দেখাতে পারে অন্ধকারেও—তবে হয়তো কোনো ভাঙা সম্পর্ক নতুন করে জোড়া লাগতে পারে, যেমন শুকনো মাটিতে হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি নেমে আসে। আর যদি সেই সম্ভাবনা আর কখনো ফিরে না আসে, তবু অন্তত সেই ছোট্ট শিশুটি যেন বাবা-মা উভয়ের স্নেহ, দায়িত্ব ও মমতা থেকে বঞ্চিত না হয়। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব কান্না প্রায়ই সেই শিশুর, যে কোনো অপরাধ করেনি—তবু বড়দের ভাঙা আকাশের সবচেয়ে ভারী টুকরোটি তাকেই বহন করতে হয়, একা, নিঃশব্দে, নিজের ছোট্ট দুই হাতে।

ক্যবা মং মারমা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

মন্তব্য করুন

Logo