সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলে-মেয়েরাও প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে, পরিবার ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
৭ জুলাই ২০২৬ পরিবারের অজান্তে ঢাকা থেকে রাজবাড়ীর পাংশায় চলে যায় পঞ্চম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই শিশু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পুলিশ তৎপর হয়ে তাদের নিজ হেফাজতে নেয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শিশু দুজন আবেগের বশে একসঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারা একসঙ্গে থাকতে চাওয়ার কথা বলেছে।
৬ জুলাই ২০২৬ নাটোরের লালপুর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠীকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পর প্রত্যাখ্যান করায় বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী।
এক সময় প্রেম, ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনাকে আমরা কৈশোর বা তারও পরের বয়সের সংকট বলে ভাবতাম। কিন্তু আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এমন খবর ক্রমেই বাড়ছে, যেখানে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী, দশ-এগারো বছরের শিশু কিংবা সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলে-মেয়েরা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে, পরিবার ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্টে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে অথবা আত্মহত্যার চেষ্টা করছে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের শৈশবকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক নতুন সামাজিক বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আমরা এখনো সমস্যাটিকে প্রায়ই "অকালপক্বতা", "নৈতিক অবক্ষয়" বা "মোবাইল ফোনের দোষ" বলে ব্যাখ্যা করতে চাইছি। অথচ মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, এই ঘটনাগুলোর শিকড় অনেক গভীরে। শিশুর আচরণ কখনোই একক কোনো কারণের ফল নয়, পরিবার, বিদ্যালয়, ডিজিটাল পরিবেশ, সামাজিক সংস্কৃতি, আবেগগত নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সম্মিলিত প্রভাবেই তার মানসিক জগৎ গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হাজির করেছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এদের প্রায় অর্ধেকই স্কুলপড়ুয়া। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিষণ্নতা, আবেগগত আঘাত, প্রেম বা সম্পর্কজনিত সংকট, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং শিক্ষাগত চাপ- এসব কারণ বারবার ফিরে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। শিশুদের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কৌতূহল বা আকর্ষণ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মানবদেহের জৈবিক বিকাশের অংশ হিসেবেই এটা ঘটে। কিন্তু আজকের সংকটটি আকর্ষণের নয়, সংকটটি হলো, সেই অনুভূতিকে সামলানোর মতো মানসিক পরিপক্বতা, পারিবারিক দিকনির্দেশনা এবং সামাজিক সহায়তা শিশুদের নেই। ফলে সামান্য প্রত্যাখ্যানও তাদের কাছে পৃথিবী ভেঙে পড়ার মতো মনে হয়।
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথম বড় কারণ ডিজিটাল শৈশব। বাংলাদেশের অসংখ্য শিশু এখন স্মার্টফোন হাতে নিয়ে বড় হচ্ছে। তারা এমন এক ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করছে, যেখানে প্রেম, সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, নাটকীয় আবেগ এবং তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। TikTok-এর ছোট ভিডিও, Facebook Reels, YouTube Shorts কিংবা বিভিন্ন অনলাইন কনটেন্টে সম্পর্ককে এমনভাবে রোমান্টিক করা হয় যে, একজন শিশু বাস্তবতা ও অভিনয়ের পার্থক্য বোঝার আগেই সেই আচরণ অনুকরণ করতে শুরু করে।
আরও বড় সমস্যা হলো, শিশুর মস্তিষ্ক তখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি। আবেগ নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বিবেচনা করা কিংবা আকস্মিক সিদ্ধান্ত ঠেকানোর জন্য যে অংশটি দায়ী- প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স- তা কৈশোরের অনেক পর পর্যন্ত বিকাশমান থাকে। তাই এই বয়সে আবেগ প্রবল হয়, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক যেখানে সম্পর্ক ভাঙাকে জীবনের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, একজন শিশু সেটাকে নিজের অস্তিত্বের সমাপ্তি হিসেবেও ভাবতে পারে।
অন্যদিকে, আমাদের পরিবারও দ্রুত বদলে গেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার হয়েছে, বাবা-মা কর্মব্যস্ত, শিশুর সঙ্গে গল্প করার সময় কমে গেছে। অনেক পরিবারে সন্তানের পড়াশোনা, কোচিং ও পরীক্ষার ফল নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার অনুভূতি, বন্ধুত্ব, ভয়, অপমান বা একাকীত্ব নিয়ে ততটা কথা হয় না। ফলে শিশু যখন প্রথম কোনো আবেগগত সংকটে পড়ে, তখন সে সবচেয়ে বেশি যাকে প্রয়োজন- সেই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষটিকেই পাশে পায় না। তখন তার আশ্রয় হয়ে ওঠে সমবয়সী বন্ধু বা অনলাইন পরিচিত কেউ।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি সত্যিই শিশুদের বড় করছি, নাকি শুধু তাদের পড়াচ্ছি? আমরা কি তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি দিচ্ছি, নাকি জীবনের প্রস্তুতিও দিচ্ছি? কারণ শিশুকে গণিত শেখানো যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি তাকে শেখানো- প্রত্যাখ্যান কীভাবে মেনে নিতে হয়, কষ্ট কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, এবং বিপদের সময় কার কাছে সাহায্য চাইতে হয়।
বাংলাদেশের শিশুদের সংকট তাই প্রেমের নয়, সংকট হলো আবেগগত একাকীত্বের। আর এই একাকীত্ব যদি পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ একসঙ্গে ভাঙতে না পারে, তাহলে সংবাদপত্রে এমন খবর আরও বাড়বে- আর আমরা বারবার শুধু বিস্মিত হব।
প্রশ্ন হলো- এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আজও মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল, জিপিএ বা ভর্তি-প্রতিযোগিতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার মানসিক সুস্থতা, আত্মমর্যাদা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ কিংবা সামাজিক দক্ষতা নিয়ে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলো পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিরাপদে ব্যবহার করতে হয় কিংবা বিপদের সময় কার কাছে সাহায্য চাইতে হয়- এসব দক্ষতা শেখানোরও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে কোনো প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নেই। শিক্ষকরা আন্তরিক হলেও তাঁদের ওপর পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ ও পরীক্ষার চাপ এত বেশি যে, প্রত্যেক শিশুর মানসিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ বিশ্বের অনেক দেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং, সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা (Social and Emotional Learning) এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখন শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
পরিবারের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে। সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তাকে একা বড় হতে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আবার অতিরিক্ত নজরদারি বা কঠোর শাসনও কার্যকর হয় না। শিশুদের দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তারা ভয় ছাড়াই নিজের অনুভূতি বলতে পারে। কোনো শিশুর সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে অপমান, মারধর বা সামাজিকভাবে হেয় করা নয়, বরং বোঝানো, পাশে থাকা এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রভাব নিয়েও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা জরুরি। শিশুরা যে বিষয়বস্তু প্রতিদিন দেখছে, তা তাদের মূল্যবোধ, সম্পর্কের ধারণা এবং আত্মপরিচয় গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি শিশু সুরক্ষার অংশ। শুধু শিশু নয়, অভিভাবকদেরও ডিজিটাল প্যারেন্টিং সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। শিশুদের প্রেম বা আত্মহত্যার ঘটনা চটকদার শিরোনামে উপস্থাপন করলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে অনুকরণমূলক আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশে সতর্কতার যে নীতিমালা আছে, তা অনুসরণ করা জরুরি। ঘটনার নাটকীয় বর্ণনার পরিবর্তে মানসিক স্বাস্থ্য, সহায়তা পাওয়ার পথ এবং প্রতিরোধের বার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রেরও করণীয় আছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিশুদের সামাজিক-আবেগিক বিকাশকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে কাউন্সেলিং সেবা চালু, শিক্ষক প্রশিক্ষণে শিশু-মনোবিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা, শিশুদের জন্য সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা এবং পরিবারকে সহায়তা করার মতো নীতিগত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গা। যে শিশুকে আজ আমরা ‘অকালপক্ব’ বলে দোষ দিচ্ছি, সে হয়তো আসলে নিঃসঙ্গ। যে শিশুকে ‘অবাধ্য’ বলছি, সে হয়তো কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারছে না। আর যে শিশুর আচরণ দেখে আমরা শুধু বিস্মিত হচ্ছি, সে হয়তো অনেক দিন ধরেই নীরবে সাহায্যের অপেক্ষায় আছে।
শৈশবের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বই, খেলাধুলা, কৌতূহল, বন্ধুত্ব এবং নিরাপদ সান্নিধ্য। যদি সেই জায়গাগুলো ক্রমশ দখল করে নেয় একাকীত্ব, অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল জগৎ এবং আবেগগত অনিরাপত্তা, তাহলে শিশুদের কাছ থেকে আমরা শিশুসুলভ আচরণই বা কীভাবে প্রত্যাশা করি?
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিশুর প্রেমে পড়া আসল সংকট নয়। আসল সংকট হলো- সে এমন এক সমাজে বড় হচ্ছে, যেখানে তার আবেগকে বোঝার মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাই এই সমস্যার সমাধান শাস্তিতে নয়, সহানুভূতিতে, ভয় দেখিয়ে নয়, সংলাপে। আর দোষারোপে নয়, পরিবার, বিদ্যালয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব গ্রহণে।
শিশুরা হঠাৎ করে বড় হয়ে যায় না। আমরা যদি তাদের শৈশবকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হই, তাহলেই তারা সময়ের আগেই বড় হয়ে যেতে বাধ্য হয়। আর একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কিছু হতে পারে না।
যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুরা কত দ্রুত বড় হয়ে যায়, তার ওপর নয়, বরং তারা কত নিরাপদে শৈশব কাটাতে পারে, তার ওপর।
মন্তব্য করুন

