Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

বন্যা শুধু প্রকৃতির নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরীক্ষা

এবারের বর্ষা মৌসুমের বন্যা দেশের দক্ষিণ পূর্ব ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

মত-দ্বিমত

বন্যা শুধু প্রকৃতির নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতারও পরীক্ষা

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:১২ এএম

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। বর্ষা এলেই নদীর পানি বাড়ে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। তাই বন্যা আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে, পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে, দীর্ঘদিন পানি নামছে না, আর মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। প্রতি বছরই আমরা দেখি বাড়িঘর ডুবে গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে, স্কুল বন্ধ হয়েছে, মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু এবার আরেকটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। কেন বন্যা এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে?

বন্যা একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির সবটুকু প্রকৃতির কারণে হয় না। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, প্রাকৃতিক বিপদকে বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করে মানুষের অপ্রস্তুতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা। একই ধরনের বন্যায় কোনো দেশে খুব কম প্রাণহানি হয়, আবার অন্য দেশে শত শত মানুষ মারা যায়। পার্থক্যটি তৈরি করে আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত, দক্ষ সমন্বয় এবং কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা।

এবারের বর্ষা মৌসুমের বন্যা দেশের দক্ষিণ পূর্ব ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করেছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার, সিলেট ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং ১০ লাখেরও বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে যাওয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঘটনাই বেশি। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও গ্রামীণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকার আমন চাষের জমি, মাছের ঘের এবং গবাদিপশুও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের অনেক এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী, কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে পাহাড়ি অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি যেমন থাকবে, তেমনি নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও নদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার নয়, দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ প্রস্তুতি ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশকে একসময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের সফল দেশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হতো। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বের অনেক দেশের জন্যও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যাগুলো দেখাচ্ছে, শুধু অভিজ্ঞতা থাকলেই হবে না। সেই অভিজ্ঞতাকে প্রতিনিয়ত কাজে লাগাতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ধরনও বদলে যাচ্ছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে দ্রুত নেমে আসা ঢল, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ফলে আগের মতো চিন্তা করে এখন আর দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে বন্যা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় সাধারণত ত্রাণ বিতরণকে কেন্দ্র করে। কে কত ট্রাক ত্রাণ পাঠালেন, কোন সংগঠন কত টাকা সংগ্রহ করল, কোন স্বেচ্ছাসেবক দল কোথায় পৌঁছেছে, এসব খবরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ত্রাণই সবচেয়ে বড় বিষয় নয়। এটি পুরো ব্যবস্থার একটি ছোট অংশ মাত্র।

একটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুরু হয় অনেক আগে। আবহাওয়া ও নদীর পানির পূর্বাভাস সংগ্রহ করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করা হয়। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। প্রয়োজন হলে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়। উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত রাখা হয়। দুর্যোগের সময় দ্রুত উদ্ধার এবং ত্রাণ বিতরণ করা হয়। এরপর শুরু হয় আরও কঠিন কাজ, পুনর্বাসন।

বাস্তবে বন্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় পানি নেমে যাওয়ার পরে। তখন কৃষক দেখেন তার জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। দিনমজুর কাজ হারান। দোকানদারের পুঁজি শেষ হয়ে যায়। গবাদিপশু মারা যায়। অনেক শিশু স্কুলে ফিরতে পারে না। পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। একটি পরিবারকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে মাসের পর মাস, কখনো কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়। তাই কয়েক কেজি চাল বা কিছু শুকনো খাবার দিয়ে দুর্যোগের সমাধান হয় না।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুসংগঠিত আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড আগাম তথ্য দেয়। জেলা প্রশাসন স্থানীয় প্রস্তুতি নেয়। উপজেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে। স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে। ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরি করে। কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠায়। অর্থাৎ এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা।

কিন্তু কাগজে সুন্দর পরিকল্পনা থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ। স্থানীয় প্রশাসন যদি সময়মতো সক্রিয় না হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যদি সমন্বয়ের ঘাটতি থাকে, তথ্য আদানপ্রদানে দেরি হয় অথবা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঠিক তালিকা তৈরি না হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক বন্যায় বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ এসেছে। কোথাও একই পরিবার একাধিকবার সাহায্য পেয়েছে, আবার কোথাও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সহায়তা পায়নি। কোথাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লেগেছে। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের সময় শুধু সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশে আরও বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করছেন। এর অর্থ হলো ভবিষ্যতে বন্যা আরও ঘন ঘন হতে পারে, আরও তীব্র হতে পারে। তাই শুধু পুরোনো অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ, নগর পরিকল্পনা, ডিজিটাল পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত দুর্যোগ স্বেচ্ছাসেবক বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখাও জরুরি। দুর্যোগের সময় সরকারের কাজ নিয়ে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। আবার সরকারের ভালো কাজের স্বীকৃতিও দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ বা প্রশংসা, দুটিই হওয়া উচিত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ দুর্যোগ কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, পুরো জাতির সমস্যা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দুর্যোগে মানুষের জীবন বাঁচানোই প্রথম কাজ। তারপর আসে ক্ষতি কমানো, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া। প্রতিটি বন্যা আমাদের শেখায় কোথায় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল, কোথায় সমন্বয় দুর্বল ছিল এবং কোথায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। যদি সেই শিক্ষা আমরা কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে একই ভুল বারবার ফিরে আসবে।

বন্যা থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বন্যাকে বড় মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। সেটি করতে হলে দরকার শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ প্রশাসন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের শক্তি বোঝা যায় শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়, বরং সংকটের সময় সে তার সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের পাশে কত দ্রুত এবং কত দক্ষতার সঙ্গে দাঁড়াতে পারে, তার মধ্য দিয়েই।

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী


মন্তব্য করুন

Logo