Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

ইতিহাসবিরোধী বয়ানে নীরবতার রাজনীতি

১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, প্রকৌশলীসহ দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজার ও মিরপুরে হত্যা করা হয়, সেখানে আল-বদরের ভূমিকা বারবার উঠে এসেছে।

মত-দ্বিমত

ইতিহাসবিরোধী বয়ানে নীরবতার রাজনীতি

লুবনা ফেরদৌসী ও আসিফ বিন আলী

Icon

লুবনা ফেরদৌসী ও আসিফ বিন আলী

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি এই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ন্যায়-অন্যায়, প্রতিরোধ ও বিশ্বাসঘাতকতারও ইতিহাস। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও সেই ইতিহাসকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানে আল-বদরের বন্দনা, মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা, সে বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলের নীরবতা এবং এসব ঘটনা ঘিরে ইতিহাস ও রাজনীতির জটিল সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন দুই লেখক। একই বিষয়ের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁদের দুটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো।


নির্বাচিত প্রতিবাদ, নির্বাচিত নীরবতা

লুবনা ফেরদৌসী

গত এক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর ভারতবিরোধী মিছিল হয়, “আগ্রাসন” শব্দটি এত ঘনঘন উচ্চারিত হয় যে মনে হয় দক্ষিণ এশিয়ায় নৈতিক উদ্বেগের একমাত্র উৎস ভারত। 

কিন্তু পাকিস্তানের প্রসঙ্গ উঠলেই যেন হঠাৎ রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নরম হয়ে যায়। প্রতিবাদের জায়গা নেয় নীরবতা, আর নৈতিক ক্ষোভের জায়গা নেয় কৌশলগত সৌজন্য। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া গুলোও কম্ফোর্টেবলি সাইলেন্ট।

ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম পাকিস্তান সফরে গেলেন। সফর করা অপরাধ না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কও অপরাধ না। কিন্তু এখানে প্রশ্ন: কার সঙ্গে, কোন আদর্শিক পরিবারের সঙ্গে, এবং কোন ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়ে সেই সম্পর্ক গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ইসলামী ছাত্রশিবির জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশ শাখার ছাত্রসংগঠন। আর ইসলামি জমিয়ত-এ-তালাবা হলো জামায়াতে ইসলামীর পাকিস্তান শাখার ছাত্রসংগঠন। অর্থাৎ একই আদর্শিক পরিবারের দুই শাখার পুনর্মিলন।

আর সেই সফরের প্রেক্ষাপটে এমন একটা গান প্রচারিত হচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে, 

“মুক্তিবাহিনী কে গুন্ডো সে, কোন লাড়া থা ঢাকা মে?

মুল্‌ক কি ওয়াহ্‌দাত কো নাজরানে 

আল-বাদ্‌রে বাঙ্গাল দিয়ে,

জমিয়ত নে ইস ধারতি কো 

হীরে-মতি-নাল দিয়ে”

যার বাংলা অর্থ:

মুক্তিবাহিনীর গুন্ডাদের বিরুদ্ধে ঢাকায় কে লড়েছিল? দেশের ঐক্যের জন্য আল-বদর বাংলায় নিজেদেরকে উৎসর্গ করেছিল। জমিয়ত এই মাতৃভূমিকে হীরা, মুক্তা ও রত্ন উপহার দিয়েছে।

অবশ্যই এই বক্তব্যকে কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উচ্ছ্বাস বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। 

এটা এমন একটা রাজনৈতিক ধারার সাংস্কৃতিক বয়ান, যারা আজকের দিনেও মুক্তিবাহিনীকে “গুন্ডা” এবং আল-বদরকে “ঐক্যের রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করতে লজ্জা পায় না।

তারপরও আশ্চর্যজনকভাবে, সফর আছে। আলিঙ্গন আছে। দাঁত বের করা হাসি আছে। ছবি আছে। আতিথেয়তা আছে।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধিদল কি অন্তত একবার বলেছিল,

“দুঃখিত, আপনারা যে আল-বদরকে গৌরবান্বিত করছেন, তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত একটি সহযোগী বাহিনী হিসেবে পরিচিত। আমরা এই বয়ানের সঙ্গে একমত নই।” 

রাজনীতিতে নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষতা না, অনেক সময় নীরবতাই সবচেয়ে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান।

এই ঘটনাটি বোঝার জন্য memory politics বুঝতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক আন্দোলন শুধু বর্তমান ক্ষমতার জন্য লড়াই করে না, তারা অতীতের অর্থ নিয়েও লড়াই করে। 

Maurice Halbwachs এর collective memory তত্ত্ব, Pierre Nora র Lieux de Mémoire এবং Jan Assmann এর cultural memory বিষয়ক গবেষণা বলে যে,

রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণে স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতকে মুছে ফেলা সবসময় সম্ভব হয় না; তাই তাকে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়।  নতুন ভাষায়, নতুন নৈতিকতায়, নতুন বীর-খলনায়কের তালিকায় সাজানো হয়।

আজকে সেটাই হচ্ছে। সেই ১৯৭১ ই আবার হাজির হয়, শুধু চরিত্রগুলো বদলে যায়। নায়ক হয়ে যায় খলনায়ক, খলনায়ক হয়ে যায় শহীদ। মুক্তিযোদ্ধারা হয়ে যাচ্ছে ‘গুন্ডা’। আল-বদর হয়ে যাচ্ছে ‘ঐক্যের রক্ষক’। গণহত্যার সহযোগীরা হয়ে যাচ্ছে ‘আত্মত্যাগী’। আর সত্যকে করা হচ্ছে বিতর্কিত। এটা স্রেফ ইতিহাস পুনর্লিখনের রাজনৈতিক প্রকল্প। 

কিন্তু সব কিছুরই বিকল্প ব্যাখ্যা হয় না। পৃথিবীতে যেমন কেউ Holocaust এর জন্য নাৎসি এসএস বাহিনীকে “মানবতার রক্ষক” বলে না, তেমনি বাংলাদেশের ইতিহাসেও আল-বদরকে “দেশরক্ষক” বলার জায়গা নেই।

কারণ আল-বদরের ভূমিকা কোনো রাজনৈতিক গুজব না, কোনো দলীয় প্রচারণাও না। এটা এমন একটা ঐতিহাসিক প্রশ্ন, যার উত্তর বহু দশক ধরে ইতিহাসবিদ, গবেষক, বিচারিক প্রতিষ্ঠান এবং দলিলপত্র প্রায় একইভাবে নথিভুক্ত করেছে।

হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দলিল, Richard Sisson ও Leo Rose এর War and Secession, Rounaq Jahan এর গবেষণা, Gary J. Bass এর The Blood Telegram এবং অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য একই বাস্তবতার কথা বলে।

আল-বদর ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহযোগী বাহিনী, যারা বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখক, প্রকৌশলীসহ দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে রায়েরবাজার ও মিরপুরে হত্যা করা হয়, সেখানে আল-বদরের ভূমিকা বারবার উঠে এসেছে।

এই কারণেই আল-বদরকে “ঐক্যের রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করা প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ যাকে বলে historical denialism and revisionism। ইতিহাসচর্চায় মতপার্থক্য থাকতে পারে, কোনো ঘটনার কারণ, প্রেক্ষাপট বা ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু যখন বিচারিক নথি, গবেষণা, দলিল এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য একই দিকে নির্দেশ করে, তখন সেই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে উল্টে দেওয়া আর ইতিহাসচর্চা থাকে না, সেটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি।

পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক সমাজেই গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সহযোগী বাহিনীকে জাতীয় বীর বানানোর চর্চাকে “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” বলা হয় না। যেমন জার্মানিতে এসএস বাহিনীকে “জাতীয় ঐক্যের রক্ষক” বলা ইতিহাসের বিকল্প পাঠ না, সেটা Holocaust denial এর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একইভাবে বাংলাদেশেও আল-বদরকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপরীতে “ঐক্যের রক্ষক” হিসেবে উপস্থাপন করা ১৯৭১ সালের নৈতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিকে পুনর্লিখনের রাজনৈতিক কূটচাল।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের বয়ানের লক্ষ্য শুধু অতীতকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা না; বরং নতুন প্রজন্মের কাছে অপরাধী ও প্রতিরোধকারীর নৈতিক অবস্থান অদলবদল করে দেওয়া। 

বিষয়টা হয়ে দাঁড়ায় কাদের নায়ক আর কাদের খলনায়ক হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখানো হবে সেখানে। আর ঠিক সেখানেই ইতিহাস আর রাজনীতির সীমারেখা মুছে গিয়ে শুরু হয় memory politics, যেটা বলছিলাম।

এখানে অতীতকে নিয়ন্ত্রণ করেই বর্তমানের রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে ইতিহাস বদলাও। তারপর বলো, ইতিহাস নিয়ে কথা বলা বিভাজন সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক পুনর্বাসনের একটা আন্তর্জাতিক নিয়ম আছে।জার্মানি নাৎসিবাদ থেকে দূরত্ব তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এপারথাইডকে নৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

রুয়ান্ডা গণহত্যাকে অস্বীকার করেনি।

কারণ reconciliation begins with truth, not revision. কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রথম শর্ত হলো,সত্য স্বীকার, দায় স্বীকার, এবং অপরাধের সঙ্গে নৈতিক বিচ্ছেদ। যদি সেই বিচ্ছেদই না ঘটে, তাহলে পরিবর্তনের দাবি কেবল ভাষার পরিবর্তন হয়, আদর্শ আদর্শের জায়গাতেই থাকে।

আরেকটা বিষয় আমাকে সত্যিই অবাক করে। ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। কিন্তু পাকিস্তানের একটি সহযোগী সংগঠন যখন মুক্তিযোদ্ধাদের “গুন্ডা” বলে গান গায়, তখন প্রতিবাদের বদলে দেখা যায়, নীরবতা, কৌশলগত চুপ থাকা।

এই নীরবতা কি কূটনীতি? না কি আদর্শগত অস্বস্তি? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একে বলে selective outrage, প্রতিবাদও নীতির ভিত্তিতে হয় না, রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে বেছে নেওয়া হয়। যে আগ্রাসন রাজনৈতিকভাবে লাভজনক, তার বিরুদ্ধে মিছিল হয়। যে ইতিহাস আদর্শগতভাবে অস্বস্তিকর, তার সামনে নীরবতা পালন করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একটা ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বয়ান যদি আজকেও প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করে, তাহলে বাংলাদেশের সেই আদর্শিক সহযোগীদের অবস্থান কি হওয়া উচিত?

মনে রাখবেন,ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বিচার আদালতে হয় না, হয় স্মৃতিতে। 


“মুক্তিবাহিনীর গুন্ডাদের সঙ্গে ঢাকায় কারা লড়েছিল? আল-বদর বাহিনী”

আসিফ বিন আলী

জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত একটি গানে এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গুন্ডা’ বলা হচ্ছে এবং আল-বদর বাহিনীর জয়গান গাওয়া হচ্ছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখলাম, বাংলাদেশের শিবিরের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা পাকিস্তানে গেছেন, আর তাকে বিমানবন্দর থেকে মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ জামায়াত-শিবিরের নেতারা পাকিস্তানে গিয়ে নিয়মিত তাদের পিতৃসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন, যোগাযোগ রাখেন এবং রাজনৈতিক আতিথেয়তা নেন। কিন্তু তারা কি কখনো তাদের পিতৃসংগঠনের নেতাদের বলেছেন যে, আল-বদর ঢাকায় গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাই এদের জয়গান এখন না গাইলেও চলে? তারা কি এই গানের নিন্দা করেছেন? না, করেননি। বরং কয়েকজনকে দেখলাম গানটি শেয়ার করছেন।

আল-বদর কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ছিল না। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত এই বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে এবং বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যায় ভূমিকা রেখেছে। এই ইতিহাস দলিল, গবেষণা এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নথিতে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত আছে। সামান্যতম রাজনৈতিক লজ্জা ও ঐতিহাসিক দায়বোধ থাকলে জামায়াত-শিবিরের বাংলাদেশের নেতারা এই গানের প্রতিবাদ করতেন। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর থিম সংয়ে কুখ্যাত আল-বদর বাহিনীর জয়গান গাইছে, এর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা শুধু প্রতিবাদ করেন না তা নয়, পাকিস্তানের জামায়াতের সঙ্গে সেই আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়েই গর্ব করেন।

এরপর আমাদের বলা হয়, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন না তুলে ‘সুস্থ রাজনৈতিক আলাপ’ করতে হবে। কিন্তু যে দল এখনো মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের গুন্ডা এবং গণহত্যায় সহযোগিতাকারী আল-বদরকে মহান বাহিনী হিসেবে দেখে, তাদের সঙ্গে সুস্থ আলাপের ভিত্তিটা কী হবে? আলাপ মানে কি ইতিহাস ভুলে যাওয়া? সহাবস্থান মানে কি গণহত্যার সহযোগীদের বীর বানানোর অধিকার মেনে নেওয়া?

শাহবাগ আন্দোলনের পর ঢাকার কয়েকজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, যারা এখন জামায়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সহযোগিতা করছেন, এই তত্ত্ব দিয়েছিলেন যে জামায়াত-শিবিরকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে ‘স্টিগমাটাইজ’ করা বন্ধ করলে তারা বদলে যাবে। তাদের আদর, ভালোবাসা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিলে তারা গণতান্ত্রিক ও উদার হয়ে উঠবে। গত কয়েক বছরে কার্যত সেই তত্ত্বেরই পরীক্ষা হয়েছে। ঘোরতর আওয়ামী লীগপন্থী না হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি কথা বলা হয়নি। এই বুদ্ধিজীবী বর্গ জামায়াতের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে মিলে জামায়াতকে তার অতীতের জন্য প্রশ্ন করাকে ‘স্টিগমাটাইজেশন’, এমনকি কখনো কখনো ‘ফ্যাসিবাদী বয়ান’ হিসেবেও হাজির করেছেন। এই অংশ এখন জামায়াতের প্রায় চিয়ারলিডারের ভূমিকায় নেমেছে।

কিন্তু ফলাফল কী হলো? জামায়াত কি একাত্তরের ভূমিকা এবং আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী থেকে নিজেদের রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেছে? বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় স্বীকার করেছে? মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়সংগত স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে মেনে নিয়েছে? উল্টো এখন আরও প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘গণ্ডগোল’, স্বাধীনতা ছিল ভারতের ষড়যন্ত্র, মুক্তিযোদ্ধারা ছিল গুন্ডা, আর পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী আল-বদর ছিল একটি মহান বাহিনী। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অতীতের অপরাধ অস্বীকার করা নয়। সমস্যা হলো, সেই অপরাধকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে গৌরবের ইতিহাস হিসেবে পুনর্লিখন করা।

একটি রাজনৈতিক দলকে তার অতীতের জন্য অনন্তকাল নিষিদ্ধ বা একঘরে করার কথা কেউ বলছে না। কিন্তু রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার, দায় গ্রহণ এবং অপরাধের সঙ্গে স্পষ্ট বিচ্ছেদ। জামায়াত-শিবির সেই তিনটির কোনোটিই করেনি। বরং তারা গণহত্যার সহযোগীদের বীর বানিয়ে নিজেদের পুরোনো রাজনীতিকেই নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনছে।

তাই প্রশ্নটা জামায়াতকে ‘স্টিগমাটাইজ’ করা হবে কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সহযোগীদের মহিমান্বিত করার রাজনীতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হবে কি না।

যে প্রজন্ম আল-বদরের জয়গান গায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গুন্ডা বলে, তাদের সঙ্গে আলাপ কিসের? এদের সঙ্গে আলাপ সুস্থ রাজনৈতিক সংলাপ নয়; বরং তা গণহত্যার রাজনীতিকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার আয়োজন।


মন্তব্য করুন

Logo