সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বদলে যাচ্ছে শিশুদের ভাষা ও আচরণ
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
যেকোনো সমাজের সভ্যতা শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না, বিচার করা হয় তার ভাষা দিয়েও। মানুষ যখন মত প্রকাশ করে, ভিন্নমতকে সমালোচনা করে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে, তখন সে কেবল কোনো একটি বক্তব্য দেয় না- সে সমাজের ভাষা-সংস্কৃতিকেও নির্মাণ করে। সেই কারণেই রাজনৈতিক ভাষা কখনো কেবল রাজনীতির বিষয় হয়ে থাকে না, এটা সেই জাতির নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষারও বিষয়।
বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রাজনৈতিক ভাষা উদ্বেগজনকভাবে বদলে যাচ্ছে। যুক্তির জায়গা দখল করছে বিদ্রূপ, বিদ্রূপের জায়গা নিচ্ছে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর ব্যক্তিগত আক্রমণ ক্রমেই রূপ নিচ্ছে যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ, নারীবিদ্বেষী ও অশ্লীল ভাষায়। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য নীতি বা তথ্য নয়, বরং শরীর, যৌনতা কিংবা লজ্জাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক নানা হ্যাশট্যাগ, ট্রল, মিম ও মন্তব্য এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষ নয়- বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পক্ষই এই ভাষার আশ্রয় নিয়েছে। ফলে এই সংকটকে কোনো একটি দলের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এটা স্থিরভাবে সামাজিক সংকট।
গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এই বদলে যাওয়া ভাষার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সেই মানুষগুলো, যারা এসব বিতর্কের অংশই নয়- আমাদের শিশু, কিশোর ও নতুন প্রজন্মের তরুণেরা।
শিশুরা ভাষা শেখে অভিধান থেকে নয়, পরিবেশ থেকে। তারা শেখে পরিবারে, বিদ্যালয়ে, বন্ধুমহলে এবং এখন সবচেয়ে বেশি শেখে মোবাইলের স্ক্রিনে। যে কিশোর কয়েক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটায়, সে শুধু তথ্য দেখে না, সে ভাষাও শেখে। কোন শব্দে মানুষ হাসে, কোন শব্দে লাইক কমেন্ট বেশি পড়ে, কোন ভাষা ভাইরাল হয়- এসবও সে শেখে। যখন সে দেখে অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে লেখা পোস্ট লাখো মানুষ শেয়ার করছে, তখন তার কাছে সেই ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীরা সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ- বিশেষ করে শিশু ও কিশোর- পর্যবেক্ষণ এবং অনুকরণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। অর্থাৎ সমাজে যাকে পুরস্কৃত করা হয়, মানুষ সেটাই অনুকরণ করে। যদি অশ্লীলতা জনপ্রিয়তা এনে দেয়, তবে অশ্লীলতাই হয়ে ওঠে নতুন সামাজিক ভাষা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। ক্ষোভ, বিদ্বেষ, অপমান বা যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট সাধারণত বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে সেগুলো আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এতে একটি বিপজ্জনক চক্র তৈরি হয়েছে- যত অশালীন ভাষা, তত বেশি প্রচার, যত বেশি প্রচার, তত বেশি অনুকরণ।
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল করার আছে। তা হলো, এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান করতে গিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বৃহৎ অংশ নারীবিদ্বেষী। নারীদেহ, নারীর যৌনতা কিংবা ধর্ষণ-সংকেতকে অপমানের উপকরণ বানানো হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে নারীকেই অবমাননার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়, সমাজে নারীর মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন কিশোর যখন বারবার দেখে যে নারীর শরীরকে অপমানের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন তার মনোজগতে নারী সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যায়।
সংকট তৈরি হয় অতি-সরলভাবে। এই ভাষা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে চলে আসে বিদ্যালয়ের মাঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, বন্ধুমহলের আড্ডায়, এমনকি পারিবারিক কথোপকথনেও। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের ভাষা আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রাসী হয়ে গেছে। অভিভাবকেরা বিস্মিত হন- সন্তান এমন শব্দ কোথায় শিখল! উত্তরটি খুব কঠিন নয়। সে শিখেছে আমাদের কাছ থেকেই।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু নৈতিক শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই দিয়ে হয় না। সমাজের প্রভাবশালী মানুষ- রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, মিডিয়া, ধর্মীয় ওয়াজ, কনটেন্ট নির্মাতা- সবার ভাষাই শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক পাঠ্যবই। একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি যখন অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন, তখন সেটা কেবল একটি বক্তব্য থাকে না, সেটা একটি সামাজিক অনুমোদনে পরিণত হয়।
ভাষার এই অবক্ষয়ের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো, এড়া যুক্তিকে দুর্বল করে। যখন তথ্যের বদলে অশ্লীলতা, যুক্তির বদলে কুরুচি এবং বিতর্কের বদলে চরিত্রহনন জায়গা করে নেয়, তখন গণতান্ত্রিক আলাপের ভিত্তিই ক্ষয়ে যায়। মানুষ তখন আর মতের জবাব মত দিয়ে দেয় না, অপমান দিয়ে দেয়। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হয়, আর সমাজে সহনশীলতা কমে গিয়ে অসহিষ্ণুতা বাড়ে।
আমরা প্রায়ই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলি, এবং অবশ্যই সেটা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও অবিচ্ছেদ্য। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই অশ্লীলতা, বিদ্বেষ বা মানবিক মর্যাদা নষ্ট করার লাইসেন্স হতে পারে না। সভ্য সমাজে কঠোর সমালোচনা সম্ভব, তীব্র ব্যঙ্গও সম্ভব, কিন্তু তা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর এবং মানবিক।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ তাদের নেতাদের ভাষাই কর্মীদের ভাষা হয়ে ওঠে। একইভাবে গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে- ক্লিক বাড়ানোর জন্য কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যকে অযথা প্রচার না করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে ঘৃণামূলক ও যৌন-ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর নীতি প্রয়োগ করা। বিদ্যালয়ে ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ নিয়ে আলোচনা বাড়ানোও সময়ের দাবি।
আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন- আমি যে ভাষায় লিখছি, বলছি বা শেয়ার করছি, সেটা যদি আমার নিজের সন্তান, ছোট ভাই-বোন বা শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চারিত হয়, তবে কি আমি স্বস্তি বোধ করব?
এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আমাদের পথ দেখাতে পারে।
কারণ ভাষা শুধু শব্দের সমষ্টি নয়, ভাষা একটি সমাজের চরিত্র। আমরা আজ যে ভাষা ব্যবহার করছি, আগামী প্রজন্ম আগামীকাল সেই ভাষাতেই কথা বলবে। আমরা যদি তাদের জন্য যুক্তির বদলে অশ্লীলতা, সম্মানের বদলে অপমান এবং সংস্কৃতির বদলে কুরুচির উত্তরাধিকার রেখে যাই, তবে তার দায় কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়- সেই দায় হবে আমাদের সকলের।
শিশুরা আমাদের কথা শোনে কম, আমাদের আচরণ অনুকরণ করে বেশি। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর ভাষা শেখাতে চাইলে প্রথমে আমাদের নিজেদের ভাষাকে সুন্দর করতে হবে।
মন্তব্য করুন

