সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে আবুল কাসেম ফজলুল হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে কিছু মানুষের অবদান কালজয়ী হয়ে থাকে। তারা কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং সমাজকে আলোড়িত করেন তাদের চিন্তা, দর্শন ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রাজ্ঞ চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন ঠিক তেমনই একজন অগ্রপথিক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কেবল শিক্ষক হিসেবেই নন, বরং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক তত্ত্ব গঠন এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। গতকাল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এই মণীষীর প্রয়াণ বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনের সিংহভাগ কেটেছে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান বিতরণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি শিক্ষার্থীদের শেখাতেন কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে ব্যবচ্ছেদ করতে হয় বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন-পাঠনকে তিনি সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল সমাজের দর্পণ এবং সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগকে সমৃদ্ধ করার পেছনে এবং কয়েক প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষক তৈরিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি জ্ঞানচর্চার জগৎ থেকে কখনো দূরে সরে যাননি। আমৃত্যু তিনি যুক্ত ছিলেন মননশীল কর্মকাণ্ডে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক কেবল তাত্ত্বিক গবেষক ছিলেন না, তিনি বাংলা ভাষার অধিকার ও বিকাশের প্রশ্নে ছিলেন এক নিরলস চিন্তক ও সক্রিয় কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি থাকলেও জীবনের সর্বস্তরে—বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা, উচ্চ আদালত এবং প্রশাসনিক কাজে বাংলার শতভাগ প্রচলন না হওয়ায় তিনি গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ এবং রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনা না করলে একটি জাতি কখনোই তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না। "সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার অর্থ কেবল আবেগ প্রকাশ করা নয়, এটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম শর্ত।" এই দর্শনকে বুকে ধারণ করে তিনি বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং লেখার মাধ্যমে আজীবন সোচ্চার ছিলেন। একুশের চেতনাকে তিনি কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে বন্দি না রেখে সারা বছরের কর্মপ্রেরণায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানাতেন।
বর্তমান মেরুকরণের রাজনীতিতে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন স্বতন্ত্র অবস্থানের একজন বুদ্ধিজীবী। তিনি কোনো দলীয় সংকীর্ণতার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁর ‘নিরপেক্ষ রাজনীতি চিন্তা’ ও রাজনৈতিক তত্ত্ব দেশের বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষভাবে সমাদৃত ছিল। তিনি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন অত্যন্ত নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁর মতে, অন্ধ দলপ্রীতি সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। তিনি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, পরমতসহিষ্ণুতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের পক্ষে সবসময় প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল—জনকল্যাণ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে বাংলা মননশীল সাহিত্যের পরিধিকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করেছেন। পত্রিকা সম্পাদনা থেকে শুরু করে মৌলিক গ্রন্থ রচনা—সবখানেই তাঁর পাণ্ডিত্যের ছাপ স্পষ্ট। তিনি মেধা ও মননের বিকাশের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকপত্র সম্পাদনা করতেন: ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’। ‘সুন্দরম’ সাহিত্য ও শিল্পকলার একটি মানসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে; ‘লোকায়ত’ প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক এবং সমাজ-বিশ্লেষণধর্মী লেখার জন্য বুদ্ধিজীবী মহলে বিপুল সমাদর লাভ করেছিল। প্রবন্ধ, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থসহ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিরিশের অধিক। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কিছু বই হলো: মুক্তিসংগ্রাম, কালের যাত্রার ধ্বনি, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন, উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাঙলা সাহিত্য, মাও সেতুঙের জ্ঞানতত্ত্ব, মানুষ ও তার পরিবেশ, রাজনীতি ও দর্শন, বাঙলাদেশের প্রবন্ধ সাহিত্য, সাহিত্যচিন্তা, বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে, সংস্কৃতির সহজ কথা, রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ, বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : রাজনৈতিক আদর্শ, বার্ন্ট্রান্ড রাসেল প্রণীত : নবযুগের প্রত্যাশায়, ইতিহাসের আলোকে বাঙলাদেশের সংস্কৃতি ও স্বদেশচিন্তা। এই গ্রন্থগুলো বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গতিপথ বুঝতে ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে একাডেমির গবেষণা, প্রকাশনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম নতুন গতি লাভ করে। তিনি তরুণ গবেষকদের মৌলিক গবেষণা ও স্বাধীন চিন্তার চর্চায় নিয়মিত উৎসাহ দিতেন। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমিকে একটি নিরপেক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার মনে করতেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের সংস্কৃতির উন্নয়ন, চিন্তার আধুনিকায়ন এবং নৈতিক স্খলন থেকে মুক্তি। বর্তমান যুগে যখন ভোগবাদ ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করছে, তখন তাঁর 'সংস্কৃতির সহজ কথা' বা 'স্বদেশচিন্তা'র মতো ধারণার প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায়। তিনি সবসময় নতুন প্রজন্মকে শেকড় সন্ধান করার এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিতেন।
জাগৃতি প্রকাশনীর সত্ত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সন্তান। বই, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি প্রকাশনার জগতে নিজের পথ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালে জঙ্গিদের নৃশংস হামলায় তাঁকে প্রাণ দিতে হয়। সেই হত্যাকাণ্ড ছিল বই, যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির ওপর এক বর্বর আঘাত। দীপন হত্যার ছয় বছর পর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আটজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও, সেই রায় কার্যকর হয়নি। একজন পিতার জন্য সন্তানের মৃত্যু যতটা অসহনীয়, তার চেয়েও কঠিন ছিল সেই হত্যার বিচার কার্যকর হতে না দেখা। বছরের পর বছর কেটে গেলেও দীপনের হত্যার রায় কার্যকর হলো না। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অপূর্ণ ন্যায়বিচার এবং সন্তানের শূন্যতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গিয়েছিল। বাইরে থেকে তিনি ছিলেন দৃঢ়, চিন্তাশীল ও সংযমী; কিন্তু একজন পিতার বুকের ভেতরের কান্না কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না।
আজ তিনি নিজেও আমাদের ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন। বুকের ভেতর বহন করে নিয়ে গেলেন সন্তানের অসমাপ্ত বিচার পাওয়ার দীর্ঘ বেদনা। তাঁর প্রয়াণ আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে শুধু একটি পরিবার নয়, আহত হয় একটি জাতির বিবেকও। দীপনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি গভীর ভালোবাসা জানিয়ে আমাদের একটাই প্রত্যাশা—এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন পূর্ণতা পায়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক অবসান নয়; এর মধ্য দিয়ে একটি প্রাজ্ঞ ও নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বরও নীরব হয়ে গেল। যখনই দেশের রাজনীতি, ভাষা কিংবা সংস্কৃতি কোনো সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই তাঁর মতো অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বরা দিশা দেখিয়েছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীল কাজ, গ্রন্থ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দর্শন চিরকাল বেঁচে থাকবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তা বাস্তবায়ন করতে পারলেই এই মহান শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও গবেষকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বাঙালি জাতি তাঁর অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রাখবে।
শাহেদ কায়েস: কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী
মন্তব্য করুন

