শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
কোনো জাতির বৌদ্ধিক পরিপক্বতার অন্যতম মানদণ্ড হলো—সে তার ইতিহাস, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় স্মৃতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করে। সভ্য সমাজে ইতিহাস কখনো অনালোচনীয় নয়; নিরন্তর পুনঃপাঠ, পুনর্বিবেচনা ও নতুন ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই ইতিহাস জীবন্ত থাকে। কিন্তু ইতিহাসের সমালোচনা আর ইতিহাসের অবমাননা এক নয়। গবেষণালব্ধ প্রশ্ন তোলা এবং বিদ্বেষপ্রসূত ভাষায় ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জনপরিসরে এই সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কেবল একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বৌদ্ধিক অবক্ষয় এবং ইতিহাসচর্চার বর্তমান দুরবস্থার এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি। গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক ভূমিকা, গণআদালত আন্দোলন কিংবা যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। সেই মতপার্থক্য যুক্তি, দলিল, গবেষণা ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকাশিত হলে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই সমৃদ্ধ করে। কিন্তু ব্যক্তিগত অবমাননাকে যখন রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, তখন তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চর্চা নয়; তা বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি না; একটি জাতির বৌদ্ধিক বিবেক নির্মাণের অন্যতম ভিত্তিও বিশ্ববিদ্যালয়। এখানেই ভবিষ্যতের শিক্ষক, গবেষক, বিচারক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, প্রশাসক, লেখক, সাংবাদিক ও রাষ্ট্রনায়কদের চিন্তার ভিত নির্মিত হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতার ভাষা নিছক ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তাঁর প্রতিটি উচ্চারণ অনিবার্যভাবেই একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে বহুদিন ধরেই যুক্তির পরিবর্তে বিশেষণ, বিতর্কের পরিবর্তে গালি এবং মতবিনিময়ের পরিবর্তে চরিত্রহননের যে সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই প্রবণতাকে বহুগুণে ত্বরান্বিত করেছে। আজ অনেকেই মনে করেন, যত বেশি উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে, তত দ্রুত জনদৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে চিন্তার গভীরতার চেয়ে শব্দের সহিংসতা যেন বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে। এতে করে কেবল ভাষারই নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও অবক্ষয় ঘটছে। কারণ একটি সমাজের রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ যদি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিপক্ষকে হেয় প্রতিপন্ন করার কৌশলে রূপান্তরিত হয়, তবে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য তখন আর নীতিগত বিরোধ থাকে না; তা ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়।
জাহানারা ইমাম বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, লেখক, মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্তান হারানো একজন শহীদ জননী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম মুখ। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক উপস্থিতিকে অস্বীকার করা কিংবা তাঁকে অবমাননাকর অভিধায় অভিহিত করা ইতিহাসের সমালোচনা নয়, বরং ইতিহাসকে আবেগপ্রসূত বিদ্বেষের মধ্যে আবদ্ধ করার প্রচেষ্টা। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে স্বাভাবিক হয়ে উঠলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও একইভাবে বিকৃত হবে।
যে শিক্ষাঙ্গন যুক্তি, তথ্য, পাঠ ও গবেষণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে যদি আবেগনির্ভর বিদ্বেষই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে, তবে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ অনিবার্যভাবেই সংকুচিত হবে।
ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, আবার ইতিহাসকে রাজনৈতিক বিদ্বেষের অস্ত্রেও পরিণত করা যায় না। ইতিহাসের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তথ্যের আলোকে, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং গবেষণার পদ্ধতিগত শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। যে সমাজ ইতিহাসকে স্লোগানে প্রতিস্থাপন করে, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এই স্বাধীনতা কখনোই সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষত জনপরিসরে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভাষার সংযম, যুক্তির শৃঙ্খলা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা আরও বেশি প্রত্যাশিত। কারণ ভাষা শুধু মত প্রকাশ করে না, ভাষা সমাজের মানসিকতাও নির্মাণ করে।
এই ঘটনার পর যে সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রমাণ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধ, তার স্মৃতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এখনো গভীর আবেগের বিষয়। কিন্তু এই আবেগকেও যুক্তির বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। কোনো উসকানিমূলক বক্তব্যের জবাব যদি আরেকটি উসকানিমূলক ভাষায় দেওয়া হয়, তবে কেবল মেরুকরণই বাড়বে; সমাজ আরও বিভক্ত হবে। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ইতিহাসকে রাজনৈতিক বিদ্বেষের উপকরণ না বানিয়ে বৌদ্ধিক অনুসন্ধানের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও গবেষণা হোক, আরও পাঠ হোক, আরও মুক্ত বিতর্ক হোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা কখনোই ইতিহাসের বিকল্প হতে পারে না।
ইতিহাসকে ঘিরে মতভেদ থাকবে, নতুন গবেষণা আসবে, পুরোনো ব্যাখ্যাও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু সেই পুনর্মূল্যায়নের ভাষা হতে হবে শালীন, তথ্যনির্ভর এবং বৌদ্ধিক সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ ইতিহাসের প্রতি অশ্রদ্ধা শেষ পর্যন্ত কোনো এক ব্যক্তিকে নয়, একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাসচেতনাকেই দুর্বল করে দেয়।
মতের বিরোধ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি, কিন্তু অবমাননা কখনোই গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। যে সমাজ যুক্তির পরিবর্তে গালিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করে, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের বৌদ্ধিক ভিত্তিকেই ক্ষয় করে। ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিমত থাকুক, তর্ক থাকুক, পুনর্মূল্যায়ন থাকুক—কিন্তু ইতিহাসের ভাষা যেন কখনো অবমাননার অভিধানে বন্দী না হয়। কারণ একটি জাতির সভ্যতার পরিচয় তার বিজয়ের ইতিহাসে যতটা নিহিত, তার চেয়েও বেশি নিহিত থাকে সে তার ভিন্নমত, স্মৃতি ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কতটা শালীন, যুক্তিনিষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে পারে।
শাহেদ কায়েস: কবি ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন

