Logo

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

গম, গণিত ও বন্ধুত্বের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ছবি - সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

গম, গণিত ও বন্ধুত্বের অর্থনীতি

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বড় সুবিধা হলো, সেখানে সাধারণ অঙ্কের সব নিয়ম সব সময় প্রযোজ্য হয় না। স্কুলে আমরা শিখেছিলাম, একই মানের দুটি জিনিসের মধ্যে কম দামেরটিই বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সংসারের বাজেটও সেই নিয়মেই চলে। একজন গৃহিণী বাজারে গিয়ে দুটি দোকানে দাম মিলিয়ে দেখেন। একজন কৃষক সার কেনার আগে হিসাব করেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিটি টাকার ব্যয়ের খাতা রাখেন। কিন্তু রাষ্ট্রের জীবন বোধহয় একটু ভিন্ন। রাষ্ট্র মাঝে মাঝে এমন এক উচ্চতর গণিতের চর্চা করে, যার উত্তর সাধারণ মানুষের ক্যালকুলেটরে ধরা পড়ে না।

সম্প্রতি জানা গেল, একই সময়ে দুটি উৎস থেকে গম কেনা হচ্ছে। একটির দাম অন্যটির তুলনায় প্রতি টনে প্রায় ২৪ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার টাকা বেশি। সংখ্যাটি খুব বড় নয়, আবার একেবারে ছোটও নয়। কারণ তিন হাজার টাকা যদি একটি টনের সঙ্গে গুণ করা হয়, তখন তা কয়েক কোটি টাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষের মনে তাই একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে—যদি কম দামে কেনা সম্ভব হয়, তাহলে বেশি দামে কেন?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থাকাকালে ড. ইউনূসের করা বাণিজ্য চুক্তির কারণে আমেরিকা থেকে আরও ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন গম বেশি দামে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে প্রতি টনে গড়ে ২৫ ডলার করে বেশি দিতে হবে। আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি বলে কথা! 

এ চুক্তি যদি দেশের স্বার্থের বিপক্ষে হয়, তাহলে এটা বাতিল করা হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্নেরও উত্তর আছে। উত্তরটি অর্থনীতির বইয়ে পাওয়া যাবে না; পাওয়া যাবে কূটনীতির অভিধানে।

রাষ্ট্রেরও বন্ধু থাকে। আবার কিছু বন্ধু থাকে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ককে সব সময় উষ্ণ রাখতে হয়। পৃথিবীতে এমন কিছু শক্তিধর দেশ আছে, যাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অনেক রাষ্ট্রই নানাভাবে আগ্রহী থাকে। এই আগ্রহ কখনো নিরাপত্তার জন্য, কখনো বাণিজ্যের জন্য, কখনো আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য। ফলে কোনো কোনো সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু টাকায় মাপা যায় না।

অবশ্য এখানেই একটি কৌতূহল জন্ম নেয়। যদি কোনো সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে অর্থনীতিবিদদের এত কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় কেন? তাঁদের হয়তো এখন থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগেই ভর্তি হওয়া উচিত। সেখানে শিখবেন—বাজারদর একটি বিষয়, আর সম্পর্কদর আরেকটি বিষয়।

আমাদের দেশে বহু বছর ধরে একটি কথা প্রচলিত আছে—'সস্তার তিন অবস্থা'। এখন হয়তো নতুন একটি প্রবাদ চালু করা যেতে পারে—'দামি জিনিসের বহু অবস্থা'। তার একটি অর্থনৈতিক, একটি কূটনৈতিক, একটি কৌশলগত এবং একটি মনস্তাত্ত্বিক।

ভাবুন তো, কোনো একদিন একজন বাবা তাঁর ছেলেকে নিয়ে বাজারে গেলেন। একই মানের দুটি খাতা। একটি ৮০ টাকা, আরেকটি ১০০ টাকা। ছেলে স্বাভাবিকভাবেই ৮০ টাকার খাতাটি হাতে নিল। বাবা তাকে থামিয়ে বললেন, 'না, আমরা ১০০ টাকারটাই নেব।'

ছেলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেন?'

বাবা গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন, 'ওই দোকানদারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে।'

ছেলেটি হয়তো সেদিন কিছুই বুঝবে না। কিন্তু বড় হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়লে বুঝবে, তার বাবা আসলে সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। 

অর্থনীতির ভাষায় একটি শব্দ আছে—Opportunity Cost। অর্থাৎ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে আরেকটি সম্ভাবনা ত্যাগ করার মূল্য। আমাদের বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, নতুন আরেকটি শব্দ যুক্ত করা দরকার—Friendship Cost। এটি সেই অতিরিক্ত অর্থ, যা কোনো পণ্যের জন্য নয়; বরং একটি সম্পর্কের সম্ভাব্য উষ্ণতার জন্য ব্যয় করা হয়।

তবে সম্পর্কেরও একটি মজার স্বভাব আছে। সেটি যদি বারবার কেবল একজনই রক্ষা করেন, তাহলে অন্যজন একসময় সেটিকে সম্পর্ক না ভেবে অভ্যাস মনে করতে পারেন। বন্ধুত্ব সাধারণত সমতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে একজন সব সময় দেবে, আর অন্যজন শুধু নেবে—এমন হলে তাকে বন্ধুত্বের চেয়ে পৃষ্ঠপোষকতা বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের মতো সরল নয়। রাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শত্রুও নেই; আছে স্থায়ী স্বার্থ। এই কথাটি বহু পুরোনো। কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে মনে করি, স্থায়ী স্বার্থের জায়গায় স্থায়ী আবেগ বসানো যায়। ইতিহাস অবশ্য এমন ধারণার প্রতি খুব একটা সহানুভূতিশীল নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। যখন সাধারণ মানুষের জীবনে দ্রব্যমূল্য বাড়ে, তখন তাদের বলা হয় সাশ্রয়ী হতে। বিদ্যুতের বিল কমাতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে, হিসাব করে চলতে। পরিবারের বাজেট সামলাতে। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, একজন পোশাকশ্রমিক, একজন ক্ষুদ্র কৃষক—সকলের কাছেই মিতব্যয়িতা একটি নৈতিক শিক্ষা।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও কি সেই নীতিটি কখনো প্রযোজ্য হতে পারে?

প্রশ্নটি অশোভন নয়। কারণ রাষ্ট্রের অর্থও শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। সরকারি কোষাগারের প্রতিটি টাকায় একজন শ্রমিকের ঘাম, একজন উদ্যোক্তার ঝুঁকি, একজন কৃষকের পরিশ্রম এবং একজন চাকরিজীবীর কর জমা থাকে। ফলে সেই অর্থ ব্যয়ের ব্যাখ্যাও স্বাভাবিকভাবেই জনগণ জানতে চাইবে।

কিন্তু প্রশ্ন করারও একটি বিপদ আছে। প্রশ্ন করলে অনেক সময় মনে হতে পারে, প্রশ্নকারী আন্তর্জাতিক রাজনীতি বোঝেন না। তিনি হয়তো কেবল বাজার বোঝেন। অথচ বাজার আর বিশ্বরাজনীতি এক নয়। বাজারে চাল-ডাল বিক্রি হয়; বিশ্বরাজনীতিতে বিক্রি হয় আস্থা, প্রভাব, অবস্থান এবং কখনো কখনো নীরবতাও।

তাই হয়তো আমাদেরও ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উচিত।

ভবিষ্যতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে হয়তো নতুন একটি খাত যোগ হবে: ‘কৌশলগত সৌহার্দ্য সংরক্ষণ ব্যয়’। এর আওতায় থাকবে এমন সব ব্যয়, যেগুলো ক্যালকুলেটরে ব্যাখ্যা করা কঠিন, কিন্তু বক্তৃতায় ব্যাখ্যা করা সহজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও নতুন সিলেবাস পড়তে হতে পারে। সেখানে প্রথম অধ্যায়ের নাম হবে—'বাজারদর ও সম্পর্কদর: একটি তুলনামূলক আলোচনা'। পরীক্ষার প্রশ্ন আসতে পারে: ‘একই পণ্য দুটি উৎস থেকে ভিন্ন দামে কেনা হলে কোন পরিস্থিতিতে বেশি দামই অধিক লাভজনক বলে বিবেচিত হতে পারে? উদাহরণসহ আলোচনা করুন।’

উত্তরপত্রে যে শিক্ষার্থী লিখবে, ‘কারণ সম্পর্ক অমূল্য’; সে হয়তো পূর্ণ নম্বর পেয়ে যাবে।

তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার। সম্পর্কের মূল্য অবশ্যই আছে। আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বও প্রয়োজন। কোনো রাষ্ট্র একা চলতে পারে না। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় তখনই, যখন সেটি অযথা ব্যয় দাবি করে না; বরং পারস্পরিক আস্থা, ন্যায্যতা এবং সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে সম্পর্কের ভিত্তি সব সময় অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ, সেটি বাণিজ্য হতে পারে, কৌশল হতে পারে, প্রয়োজনও হতে পারে; কিন্তু তাকে বন্ধুত্ব বলা যাবে কি না, সেই প্রশ্নটি ইতিহাসের জন্য রেখে দেওয়াই বোধহয় ভালো।

কারণ ইতিহাসের একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে। সে শেষ পর্যন্ত সব হিসাব মেলাতে বসে। কে কত দামে গম কিনেছিল, তা হয়তো ইতিহাসের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু কেন কিনেছিল, সেই প্রশ্নটি ইতিহাস কখনো ভুলে যায় না। 

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo