Logo

৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা

মুস্তাফা মনোয়ার (১৯৩৫–২০২৬)

মত-দ্বিমত

মুস্তাফা মনোয়ার

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা

ড. লুবনা ফেরদৌসী

Icon

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১২:৫৩ এএম

ছোটবেলায় বিকেলের একটা নির্দিষ্ট সময় ছিল আমাদের জন্য অধীর আগ্রহের।
স্কুল থেকে ফিরে আসতাম, তাড়াহুড়ো করে গোসল, ভাত খাওয়া, তারপর টিভির সামনে বসে অপেক্ষা। তখন তো শত শত চ্যানেলের পৃথিবী না। ইউটিউব ছিল না, নেটফ্লিক্স ছিল না, অ্যালগরিদম ছিল না। ছিল একটা মাত্র বিটিভি, আর ছিল কিছু মানুষের জাদু।
সেই জাদুকরদের একজন ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
মনের কথা শুরু হতো। পর্দায় ভেসে উঠতেন তিনি, হাতে তুলি, সামনে সাদা কাগজ। আর আমরা বিস্ময়ে দেখতাম, কয়েকটি রেখা, কয়েকটি রঙ, কয়েকটি অনায়াস স্পর্শের মধ্য দিয়ে হঠাৎ জন্ম নিচ্ছে একটি পাখি, ফুটে উঠছে একটি ফুল, কিংবা হাসছে কোনো পরিচিত মুখ।
আর তাঁর সঙ্গে থাকত পাপেট পারুল, বাউল আর ষাঁড় হাম্বা। মিষ্টি পারুলের দেশের গান আর নাচ, বাউলের বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা, আর হাম্বার চিরচেনা সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়ার স্বভাব, এসব মিলেমিশে ছবি আঁকাকে পরিণত করেছিল কল্পনার, আনন্দের এবং শিশুমনের এক অনন্য জগতে। শিল্প তখন শুধু কাগজে থাকত না, আমাদের ভেতরেও বাসা বাঁধত।
এখনও কানে বাজে….
“সবুজ অনেক ধরনের হয়, হলুদ মেশানো, নীল মেশানো…”
তখন মনে হতো, ছবি আঁকা বুঝি খুব সহজ। বড় হয়ে বুঝলাম, ছবি আঁকা কঠিন। আর সবচেয়ে কঠিন হলো একটি জাতির শিশুমনকে সুন্দর করে গড়ে তোলা।
সেটাই করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।
আজকের শিশুরা হয়তো তাঁকে খুব বেশি চিনবে না। তারা জানবে না পারুল কে ছিল, বাউল কেন এত আপন ছিল, মনের কথা দেখার জন্য কীভাবে একটি প্রজন্ম টেলিভিশনের সামনে বসে থাকত। তারা হয়তো বুঝবে না কেন একজন মানুষের মৃত্যুতে এত মানুষের মনে একসঙ্গে শৈশবের দরজা খুলে যায়….
কিন্তু আমাদের প্রজন্ম জানে। আমরা জানি, তিনি ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে আমাদের কল্পনা করতে শিখিয়েছিলেন।
আমাদের সময়ে শিশুদের জন্য আলাদা সাংস্কৃতিক জগত খুব বেশি ছিল না। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন। তিনি আমাদের বলেছিলেন রঙেরও ভাষা আছে। পুতুলও কথা বলতে পারে। লোককথাও আধুনিক হতে পারে। শিল্প শুধু গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানো ছবিতেই থাকেনা, শিল্প থাকে শিশুর হাতে রঙ পেন্সিল তুলে দেয়াতে।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই উনার মৃত্যুর খবর শুনে মনে হলো, আমাদের শৈশবের একটা ঋতু শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের গল্প শুধু আমাদের শৈশবের গল্প না, বাংলাদেশের গল্পও।
১৯৭১ সালের মার্চে, যখন চারদিকে যুদ্ধের আবহ, যখন মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, তখন তিনি সরকারি টেলিভিশনের ভেতরে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পাকিস্তানের পতাকা আর দেখানো হবে না। সরকারি চাকরি, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ, সবকিছুর ঝুঁকি জেনেও তিনি সংস্কৃতির ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
যে মানুষ স্বাধীনতার সূচনালগ্নে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সাহস দেখাতে পারেন, তিনিই পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের জন্য নতুন কুঁড়ি তৈরি করেন, পারুল সৃষ্টি করেন, পাপেটকে শিক্ষার ভাষায় পরিণত করেন, শহীদ মিনারের পেছনে লাল সূর্যের প্রতীক নির্মাণে যুক্ত হন, আর একটি দেশের সাংস্কৃতিক কল্পনাশক্তিকে রঙিন করে তোলেন।
তিনি জানতেন, শিল্প একটি গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও মানবিক সমাজের ভিত্তি।
আজকে যখন আমরা শুনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষকের প্রয়োজন নেই, তখন মুস্তাফা মনোয়ারকে নতুন করে বুঝতে হয়। তিনি ছিলেন সেই জীবন্ত যুক্তি, কেন শিল্পশিক্ষা দরকার। কেন শিশুরা শুধু গণিত, বিজ্ঞান আর পরীক্ষার নম্বর দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে না। গান, ছবি, নাটক, পুতুল, গল্প, এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে মানুষ গড়ে, নাগরিক গড়ে, কল্পনাশক্তি গড়ে।
আজকের বাংলাদেশে, যখন শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকে ক্রমশ সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে , 
বারবার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আনুগত্যের মানদণ্ডে মাপা হচ্ছে সাংস্কৃতিক চর্চাকে, এবং শিশুর সৃজনশীলতাকে উন্নয়নের পরিবর্তে বিবেচনা করা হচ্ছে অতিরিক্ত কিছু হিসেবে;
তখন মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কাজ আরও বেশি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সংস্কৃতি একটি জাতির গণতান্ত্রিক কল্পনাশক্তির ভিত্তি, কোনো বিলাসিতা না।
যে সমাজে শিশুদের গান শেখানোর জন্য শিক্ষককে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়, কিন্তু তাদের শুধু পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা আর কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করার কথা বলা হয়, সেখানে মুস্তাফা মনোয়ার এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একটি শিশুর হাতে রঙ পেন্সিল তুলে দেওয়া রাষ্ট্রগঠনের কাজ; পুতুলকে কথা বলতে শেখানো নাগরিক শিক্ষার কাজ; কল্পনা করতে শেখানো ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজ।
আবার, আমরা এখন এমন এক সময়েও বাস করছি, যখন উন্নয়নকে প্রায়শই কেবল অবকাঠামো, দক্ষতা আর অর্থনীতির ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়। 
অথচ মুস্তফা মনোয়ার আমাদের শিখিয়েছিলেন, একটি জাতি শুধু অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে, তার গল্পে, তার শিশুর আঁকা বেঁকা সূর্যে। 
টিকে থাকে সেইসব মানুষের স্মৃতিতে, যারা শিশুদের বলেছিলেন, “পৃথিবীকে শুধু যেমন আছে তেমন দেখো না, তাকে নতুন করে কল্পনাও করো।”
সংগীত শিক্ষক দরকার নেই, এই সমস্যাটা বাজেটের না, অগ্রাধিকারের। যে রাষ্ট্র শিশুদের কল্পনাশক্তিতে বিনিয়োগ করতে চায় না, সে রাষ্ট্র এমন নাগরিকই তৈরি করে, যারা কী ভাবতে হবে তা জানে, কিন্তু কীভাবে ভাবতে হয় তা শেখে না। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সেই প্রমাণ, কেন শিল্পশিক্ষা অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং শিল্পকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করা একটি সমাজের সাংস্কৃতিক সংকটের লক্ষণ।
আমরা যারা তাঁর অনুষ্ঠান দেখে বড় হয়েছি, আমরা জানি,
তিনি আমাদের ভেতরেও এঁকে দিয়েছিলেন সৌন্দর্য, একটু মানবিকতা। আর অনেকখানি বাংলাদেশ। যিনি একটি প্রজন্মকে শিখিয়েছিলেন, বাংলাদেশ মানে রঙ, গান, পুতুল, লোককথা, উৎসব, কল্পনা আর বহুত্ববাদ।
তিনি চলে গেলেন, কিন্তু হয়তো কোনো এক শিশুর হাতে এখনও রঙ পেন্সিল আছে। হয়তো সে এখনও বিশ্বাস করে, কয়েকটি রেখা থেকে একটি পৃথিবী তৈরি করা যায়।
সেই বিশ্বাসটাই মুস্তাফা মনোয়ারের উত্তরাধিকার। ভালো থাকুন, আমাদের শৈশবের প্রিয় শিল্পী ভাই।🌿
সবুজের যেমন অনেক রং আছে, বাংলাদেশেরও অনেক রং আছে। সেই রংগুলোর একজন মহান রক্ষক ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

ইতি মনের কথার 
একজন ছোট্ট বন্ধু   ড. লুবনা ফেরদৌসী
শিক্ষক ও গবেষক

মন্তব্য করুন

Logo