Logo

৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

একটি ঘর, চারটি রক্তাক্ত দেহ, আমাদের ভেঙে পড়া সমাজ

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বাবা, ঘাতকের হাতে মা ও তিন মেয়ের মৃত্যুতে শেষ একটি পরিবার, ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

একটি ঘর, চারটি রক্তাক্ত দেহ, আমাদের ভেঙে পড়া সমাজ

শাহেদ কায়েস

Icon

শাহেদ কায়েস

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম

কিছু সংবাদ পড়া যায়। আর কিছু সংবাদ পড়ার পর দীর্ঘক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে হয়—শব্দের চেয়েও গভীর হয়ে বুকের ভেতর নেমে আসে এক অসহনীয় নীরবতা। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের ধানহাটার ঘটনাটি তেমনই। একটি ভাড়া বাড়ি। নদীর পাড়ের সাধারণ একটি পরিবার। কয়েক বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি। স্বামীর মৃত্যুর পর একজন মা তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হয়তো মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য চাননি। কিন্তু খুব কষ্টে হলেও নিজের মতো করেই বাঁচতে চেয়েছিলেন। দুপুরবেলা সেই ঘর রক্তে ভরে গেল। প্রথমে মা, তারপর একে একে তিন মেয়ে। দশ বছরের সিপা আর কখনো স্কুলে যাবে না। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়া ছায়মার বইগুলো আর কেউ খুলবে না। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইকরা—যে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার জন্য লড়ছিল—ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই পথে থেমে গেল জীবন।
 
আমি বারবার ভাবছিলাম, ওই বাড়ির ভেতরে শেষ কয়েক মিনিটে কী ঘটছিল? মায়ের চিৎকার? মেয়েদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা? বড় বোন কি ছোট বোনকে আড়াল করতে গিয়েছিল? নাকি সবাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো কোনো দিন জানা যাবে না। সংবাদে পড়লাম, হত্যার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। হামলাকারীরও মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে। তদন্ত চলবে। পুলিশ আলামত সংগ্রহ করবে। ময়নাতদন্ত হবে। মামলা হবে। এসব প্রয়োজনীয় কাজ। তবু মানুষের ভেতরে যে ক্ষত তৈরি হলো, তার তদন্ত কে করবে?
 
আমার শৈশবের দিনগুলো বারবার ফিরে আসে মনে। তখন গ্রামের জীবন ছিল অনেক সরল, আর মানুষের সম্পর্ক ছিল অদ্ভুত রকমের উষ্ণ। খুব দূরে কোথাও না গেলে বাড়ির দরজায় তালা দেওয়ার প্রয়োজনই পড়ত না। দুপুরে কেউ দরজায় কড়া নাড়লে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই দরজা খুলে দেওয়া হতো। প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই আদর এবং শাসন করা ছিল একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। কারও বাড়িতে বিপদ হলে আশপাশের মানুষ ছুটে যেত সাহায্যের জন্য। বিশ্বাস, সহমর্মিতা আর মানবিকতাই ছিল সেই সমাজের আসল ভিত্তি। এমন নয় যে তখন অপরাধ বলে কিছু ছিল না। খুন হতো, ডাকাতিও ঘটত, নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সেসব মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে আজকের মতো অবিরাম আতঙ্কে আচ্ছন্ন করে রাখত না। 
 
এখন তালাবদ্ধ ঘরের ভেতরেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মেলে না। সন্তানকে একা বাইরে পাঠাতে বুক কেঁপে ওঠে। কখনো কখনো নিজের ঘরটিও আর পুরোপুরি নিরাপদ বলে মনে হয় না। দিনের আলোয়, মানুষের ভিড়ের মধ্যেও এক অজানা শঙ্কা যেন আমাদের অনুসরণ করে। মনে হয়, কখন কোথায় কী ঘটবে, তার কোনো ভরসা নেই। এই পরিবর্তন কেবল আইন-শৃঙ্খলার অবনতির গল্প নয়। এর চেয়েও বড় ক্ষয় ঘটেছে মানুষের ভেতরে—একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ এবং মানবিক সম্পর্কের সেই গভীর বন্ধন আজ অনেক বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সেই হারিয়ে যাওয়া আস্থার শূন্যতাই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।
 
এই ঘটনায় আরেকটি মৃত্যু ঘটেছে—অভিযুক্ত যুবকের। তাকে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। মানুষের ক্ষোভ আমি বুঝি। চারটি রক্তাক্ত দেহ দেখে কে-ই বা শান্ত থাকতে পারে! একজন মায়ের নিথর শরীর, পাশে শিশু কন্যা—এ দৃশ্য মানুষের বিচারবোধকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিতে পারে। তবু গণপিটুনি কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না। কারণ তখন সত্য জানার পথও বন্ধ হয়ে যায়। অপরাধের পেছনে কী ছিল, মানসিক অসুস্থতা, মাদক, ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি অন্য কোনো অজানা কারণ—সবই মৃত মানুষের সঙ্গে কবরের নিচে চাপা পড়ে যায়। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা দুর্বল হলে মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে শুরু করে। এই প্রবণতা অনেক সময় নিরপরাধ মানুষের জীবনও কেড়ে নেয়।
 
এই ঘটনার আরেকটি দিক আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। প্রায় প্রতিটি বড় হত্যাকাণ্ডের পর আমরা খুব দ্রুত একটি শব্দ উচ্চারণ করি—'মাদকাসক্ত'। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এই শব্দটি যেন ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়। যদি সত্যিই মাদক জড়িত থাকে, তা প্রমাণ হোক। আর যদি না থাকে, তবে অপরাধের গভীর কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি। সমাজবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বলছেন, আকস্মিক নৃশংসতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে—মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতার সংস্কৃতি, সহজে অস্ত্র হাতে পাওয়া, পারিবারিক ভাঙন, আসক্তি, অর্থনৈতিক চাপ। একটিমাত্র শব্দ দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা যায় না।
 
কয়েক দিন পর আরেকটি হত্যার খবর আসবে। এই ঘটনাটিও একদিন আমরা ভুলে যাবো। টেলিভিশনের পর্দা বদলে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনা শুরু হবে। লক্ষ্মীপুরের সেই ভাড়া বাড়িতে তখন হয়তো শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগের ওপর নতুন রঙ লাগানো হবে। অন্য কেউ এসে ঘরটি ভাড়া নেবে। শুধু একটি ছেলেশিশু তার মা আর তিন বোনকে আর কখনো ফিরে পাবে না। আমাদের সংবাদপত্রে এই ঘটনাটি একদিনের শিরোনাম, কিন্তু তার জন্য সারাজীবনের শূন্যতা। রায়পুরের সেই ঘরে এখন আর কোনো শব্দ নেই। শুধু চারটি অসমাপ্ত জীবনের নীরবতা। এই নীরবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদেরকেই জিজ্ঞেস করা উচিত—আমরা আসলে কেমন সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে এক বিধবা মা তার তিন মেয়েকে নিয়ে ঘরের ভেতরও নিরাপদ থাকতে পারেন না?
 
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের প্রত্যাশা শুধু এই নয় যে, অপরাধীকে খুঁজে বের করে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। সেটি অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া, যেটি আমরা বারবার এড়িয়ে যাই—একজন মানুষ কীভাবে এমন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে? কোন সামাজিক, মানসিক কিংবা পারিবারিক বাস্তবতা তাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়াও তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় না? আরেকটি জরুরি প্রশ্ন— কেন মানুষ ক্রমে আদালতের রায়ের অপেক্ষা না করে গণপিটুনিকেই বিচার বলে ধরে নিতে শুরু করেছে? এই প্রবণতা কেবল কয়েকজন উত্তেজিত মানুষের আচরণ নয়; বরং আইন, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। যে সমাজে মানুষ বিশ্বাস হারায়, সেখানে প্রতিশোধই অনেক সময় বিচারের জায়গা দখল করে নেয়।
 
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আজ বহু নারী নিজের ঘরেও নিশ্চিন্ত নন। যে ঘর নিরাপত্তা, ভালোবাসা আর আশ্রয়ের প্রতীক হওয়ার কথা, অনেকের কাছে সেটিই ভয়ের আর অনিশ্চয়তার জায়গায় পরিণত হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে শুধু বিচ্ছিন্ন পারিবারিক ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক স্বাস্থ্যসংকট, মাদকাসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, নারীর প্রতি বৈরী মানসিকতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সহিংসতাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি—সবকিছুই এখানে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
 
তাই কেবল একটি মামলার তদন্ত শেষ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। পুলিশের পাশাপাশি প্রশাসন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধতত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ, শিশু ও নারী অধিকারকর্মী, এমনকি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদেরও একই টেবিলে বসতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কী শেখাচ্ছে, পরিবারে সন্তানরা কী পরিবেশে বড় হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা সহজলভ্য—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। কারণ শাস্তি অপরাধের পর আসে; কিন্তু একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে অপরাধের জন্মের আগেই তার বীজ শনাক্ত করা দরকার।
 
মনে রাখতে হবে, এমন হত্যাকাণ্ডের রক্ত শুধু একটি বাড়ির মেঝে বা দেয়ালে শুকিয়ে যায় না। তার দাগ পড়ে আমাদের সামষ্টিক বিবেকে, রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধে এবং সমাজের নৈতিক কাঠামোতেও। যদি আমরা প্রতিটি ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখে এগিয়ে যাই, তাহলে একই ট্র্যাজেডি বারবার ফিরে আসবে। এখন সময় এসেছে ঘটনাগুলোর পেছনের গভীর সংকটকে স্বীকার করার, নিজেদেরও প্রশ্ন করার এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার, যেখানে সহিংসতা নয়, মানবিকতাই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।

শাহেদ কায়েস: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য করুন

Logo