বাজারে আগুন—এটা এখন আর খবর নয়, স্বাভাবিক বাস্তবতা। ছবি: সংগৃহীত
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১০:৫১ পিএম
বাংলাদেশে একটা অদ্ভুত সময় চলছে। টেলিভিশন খুললে উন্নয়নের গল্প, ফেসবুক খুললে সংস্কারের গল্প, আর মানুষের ঘরে ঢুকলে টেনশনের গল্প। কাগজে-কলমে সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, রিজার্ভ সামলে উঠছে, সংস্কার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মহল প্রশংসা করছে। কিন্তু বাজারে গেলে মানুষ এখনো ডিমের দাম দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চাল, ডাল, তেল, ওষুধ—সবকিছুর হিসাব কষতে কষতে সাধারণ মানুষের জীবন এখন এক ধরনের স্থায়ী মানসিক ক্লান্তিতে পরিণত হয়েছে।
গত তিন বছরে দেশে শুধু কিছু মুখ বদলেছে, কিছু স্লোগান বদলেছে, কিছু ব্যানারের রং বদলেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তার ধরন খুব একটা বদলায়নি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এখন নিয়মিত বলছে—বাংলাদেশে দারিদ্র্যের চাপ আবার বাড়ছে। মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ এখন মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হিমশিম খায়। আর গ্রামের দরিদ্র মানুষের অবস্থা আরও কঠিন। আগে যারা কোনোভাবে টিকে ছিল, তাদের অনেকেই এখন ধার, কিস্তি আর কম খেয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে আটকে গেছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমাদের দেশে গরিবিও এখন যেন কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। শুধু গরিব হলেই হয় না, এখন আছে ‘অতি গরিব’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ গরিব’, ‘নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিন্তু বাস্তবে গরিব’, আবার ‘সম্মান রক্ষার্থে গরিবি লুকানো মানুষ’ও আছে। অর্থাৎ আয় কমলেও মানুষ চেষ্টা করছে অন্তত বাইরে থেকে যেন বোঝা না যায়।
ঢাকার অনেক পরিবারে এখন নতুন এক অর্থনীতি চালু হয়েছে। আগে যেখানে মাসে একবার রেস্টুরেন্টে যাওয়া হতো, এখন সেখানে ইউটিউব দেখে বাসায় ‘রেস্টুরেন্ট স্টাইল’ রান্না হয়। আগে যিনি রিকশায় যেতেন, তিনি এখন হাঁটেন। আগে যিনি গরুর মাংস কিনতেন, তিনি এখন মুরগির মাংসের দাম শুনে ডিমে চলে যান। ডিমের দাম বাড়লে আবার আলুভর্তা। অর্থনীতির বইয়ে এটাকে হয়তো ‘ভোক্তার অভিযোজন’ বলা যায়। সাধারণ মানুষ একে বলে, ‘কী আর করব ভাই, চলতে তো হবে!’
কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থের নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো অনিশ্চয়তা। মানুষ এখন জানে না সামনে কী হবে। চাকরি থাকবে কি না, ব্যবসা টিকবে কি না, সন্তানের পড়ার খরচ চালানো যাবে কি না—এই দুশ্চিন্তা মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে ব্যালেন্স নেই। ফ্রিজ আছে, কিন্তু ভেতরে খাবার কম। সন্তানকে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন, কিন্তু নিজের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। বাইরে থেকে জীবন মোটামুটি স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে অনেক পরিবার ভয়ংকর চাপে আছে।
এই বাস্তবতায় ঋণ এখন অনেক মানুষের জীবনের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছে। ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ, মোবাইল লোন, দোকানের বাকি—সব মিলিয়ে মানুষ যেন কিস্তির ভেতর জীবন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র নারীদের বড় একটি অংশ এখনও উচ্চ সুদের ক্ষুদ্রঋণের চক্রে আটকে আছেন। ক্ষুদ্রঋণ একসময় ক্ষমতায়নের ভাষা ছিল। এখন অনেক ক্ষেত্রে সেটি টিকে থাকার আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
অনেক পরিবারে এখন মাসের শুরু মানেই কিস্তির ফোন। কিস্তি না দিলে লোক আসবে, কথা শুনতে হবে, সামাজিক অপমান হবে। ফলে মানুষ অনেক সময় নিজের খাবার কমিয়ে হলেও কিস্তি দেয়। কারণ আমাদের সমাজে দরিদ্র হওয়া যতটা কষ্টের, তার চেয়েও বেশি কষ্টের হলো ‘অবিশ্বস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া।
এদিকে রাজনীতিতেও গরিব মানুষকে নিয়ে কথার অভাব নেই। সবাই গরিবের পক্ষে কথা বলে। কেউ ‘মানুষের অর্থনীতি’র কথা বলে, কেউ ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’র কথা বলে, কেউ ‘নতুন বাংলাদেশ’র কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে গরিব মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো একই—বাজারে গিয়ে টিকে থাকা।
আমাদের দেশে এখন উন্নয়নের ভাষাও অনেক সময় অদ্ভুত হয়ে গেছে। বড় বড় প্রকল্প, মেগা অবকাঠামো, স্মার্ট সিটি—এসব নিয়ে প্রচুর কথা হয়। কিন্তু একজন দিনমজুরের কাছে উন্নয়ন মানে হলো আজকে পুরো দিন কাজ পাওয়া গেছে কি না। একজন গার্মেন্টস কর্মীর কাছে উন্নয়ন মানে বাসাভাড়া দিয়ে সন্তানের দুধ কেনা যাবে কি না। একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর কাছে উন্নয়ন মানে মাস শেষে ধার না করা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এই কষ্টের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। বাজারে আগুন—এটা এখন আর খবর নয়, স্বাভাবিক বাস্তবতা। তরুণদের বেকারত্ব—এটাও স্বাভাবিক। চিকিৎসার খরচে পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া—এটাও যেন দৈনন্দিন ঘটনা। হামে শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, হাসপাতালের আইসিইউ-এ সিট মিলছে না, তবু কোনো ক্ষোভ নেই! যেন আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের কী করার আছে? সমাজ যখন অন্যায়, বৈষম্য বা কষ্টকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট থাকে না; সেটি নৈতিক সংকটেও পরিণত হয়।
আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে মানুষের মানসিক ক্লান্তি ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। রাস্তায় মানুষের ধৈর্য কমে গেছে, পরিবারে উত্তেজনা বেড়েছে, প্রকৃত সামাজিক যোগাযোগ কমেছে। কারণ অর্থনৈতিক চাপ কখনও শুধু পকেটে আঘাত করে না; সেটি মানুষের আচরণ, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। মাসের শেষে টাকার হিসাব মেলাতে না পারা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, চাকরি হারানোর ভয়, চিকিৎসার খরচের আতঙ্ক—এসব মানুষকে ভেতরে ভেতরে ক্রমাগত ক্ষয় করে। ফলে মানুষ ছোটখাটো বিষয়েও দ্রুত রেগে যায়, অস্থির হয়ে ওঠে, সহনশীলতা হারায়। শহরের যানজটে আটকে থাকা মানুষটির রাগের পেছনেও অনেক সময় জমে থাকা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ কাজ করে।
তারপরও বাংলাদেশি মানুষ বেঁচে থাকে। হাসে। রসিকতা করে। ব্যঙ্গ করে। এটাই এই সমাজের অদ্ভুত শক্তি। ভয়ংকর বাস্তবতার মধ্যেও আমরা কৌতুক খুঁজে নিই। হয়তো এ কারণেই এখনও চায়ের দোকানে বসে মানুষ হাসতে পারে। এখনও কেউ মজা করে বলতে পারে—‘ভাই, এখন গরিবিও প্রিমিয়াম প্যাকেজে চলে গেছে!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা যায়, মানুষ কষ্টকে ব্যঙ্গের ভাষায় প্রকাশ করছে। কারণ অনেক সময় হাসি এখানে বিনোদন নয়, টিকে থাকার কৌশল।
কিন্তু এই হাসির ভেতরেও একটা গভীর ক্লান্তি আছে। এমন এক ক্লান্তি, যা মানুষ প্রকাশ করে না, কিন্তু বহন করে।
আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে উন্নয়নের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবা দরকার। শুধু জিডিপি বাড়লেই হবে না, শুধু বড় বড় প্রকল্প হলেই হবে না। মানুষ যদি নিরাপদ না বোধ করে, যদি ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকে, যদি পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারে, যদি শিক্ষিত তরুণ চাকরি না পায়—তাহলে সেই উন্নয়ন কাগজে থাকতে পারে, মানুষের জীবনে নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি দেশের শক্তি শুধু তার অবকাঠামোয় নয়; তার মানুষের মানসিক স্থিতি, মর্যাদা ও স্বস্তিতেও নিহিত। মানুষ যদি প্রতিদিন বেঁচে থাকার হিসাব কষতে কষতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে এক ধরনের নীরব ক্ষয় শুরু হয়।
আর সেই ক্ষয় কোনো আন্তর্জাতিক সূচকে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কিন্তু মানুষের চোখে, কথায়, আচরণে—সবখানেই তার ছাপ থেকে যায়।
চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

