দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১০:২২ পিএম
মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ জলাবদ্ধতার চিরন্তন ছবিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। গত ১৬ জুন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বিদ্যালয়ের মাঠ, প্রবেশপথ, এমনকি শ্রেণিকক্ষের আশপাশও পানিতে তলিয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের কেউ জুতা হাতে নিয়ে, কেউ হাঁটুসমান কাদা-পানি মাড়িয়ে স্কুলে এসেছে। অনেকে আবার আসতেও পারেনি। প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ না হলেও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত ব্যাহত হয়ে পড়েছে। এক ঘণ্টার বৃষ্টি কয়েক দিনের ভোগান্তি ডেকে এনেছে।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের বর্ষাকালের এক পরিচিত বাস্তবতার চিত্র। প্রতি বছর বর্ষা এলেই দেশের কোথাও না কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতা, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে সংকটে পড়ে। স্কুল খোলা থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী সেখানে পৌঁছাতে পারে না। ফলে কাগজে-কলমে শিক্ষা কার্যক্রম চললেও বাস্তবে শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
শিক্ষা হচ্ছে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই ধারাবাহিকতার ওপরই নির্ভর করে শিশুর জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিক বিকাশ। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বয়সে শিশুরা শুধু বইয়ের তথ্য শেখে না, তারা ভাষা আয়ত্ত করে, গণনার ভিত্তি তৈরি করে, সামাজিক আচরণ শেখে, মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলে। ফলে শিক্ষাজীবনের এই পর্যায়ে দীর্ঘ কিংবা ঘন ঘন বিরতি ভবিষ্যতের শিক্ষাগত সক্ষমতার ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে ‘লার্নিং লস’ বা শেখার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। করোনা মহামারির দীর্ঘ শিক্ষা-বিরতির পর এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক শিশুই বয়সোপযোগী পাঠ দক্ষতা ও গণিত দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে। সেই ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। এর মধ্যে প্রতি বছরের মৌসুমি শিক্ষা-বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বর্ষার প্রভাব সব অঞ্চলে সমান নয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওর, চর, উপকূল ও নদীবেষ্টিত অঞ্চল। বর্ষার সময় অনেক হাওর এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় নৌকা। নদীর স্রোত, ঝড়ো আবহাওয়া কিংবা দীর্ঘ জলপথের কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে। ফলে শ্রেণিকক্ষ প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
কিছু এলাকায় বিদ্যালয়কে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা প্রয়োজনীয় মনে হলেও শিক্ষা কার্যক্রম তখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বন্যা সরে যাওয়ার পরও বিদ্যালয় পরিষ্কার, মেরামত ও পুনরায় চালু করতে সময় লাগে। ফলে শিক্ষা-বিরতির সময় আরও দীর্ঘ হয়।
শুধু গ্রাম বা প্রত্যন্ত অঞ্চল নয়, নগরাঞ্চলও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সড়কে পানি জমে, যানজট বাড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রাথমিক শ্রেণির শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক অভিভাবক তাদের স্কুলে পাঠাতে চান না। ফলে উপস্থিতির হার কমে যায়। পাঠদান চললেও শেখার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ক্ষতি শুধু একাডেমিক নয়। দীর্ঘ বা ঘন ঘন শিক্ষা-বিচ্ছিন্নতা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশেও প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত না গেলে পড়াশোনার অভ্যাস দুর্বল হয়, মনোযোগ কমে যায় এবং শেখার আগ্রহ হ্রাস পায়। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। তারা অনেক সময় শ্রমে যুক্ত হয়ে পড়ে বা বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে ঝরে পড়ার আশংকাও বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঘটনা আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ বর্ষাকালীন শিক্ষা-বিঘ্ন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা থাকছে না, এটা ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত শিক্ষা-চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
অনেকে ডিজিটাল শিক্ষাকে এর সমাধান হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এখনো নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল ডিভাইস এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা সমানভাবে পৌঁছেনি। ফলে অনলাইন শিক্ষা একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু একক সমাধান নয়। বরং প্রযুক্তি, কমিউনিটি অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বিত প্রয়োগ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক উদাহরণও আছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাসমান বিদ্যালয় পরিচালনার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। নৌকাভিত্তিক স্কুল, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, মোবাইল শিক্ষা কার্যক্রম কিংবা বিকল্প শ্রেণিকক্ষের মতো উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে- সঠিক পরিকল্পনা থাকলে দুর্যোগের মধ্যেও শেখা থেমে থাকতে হয় না।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা দুর্যোগ-সহনশীল? বাস্তবে শিক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এখনো অনেকাংশে পৃথক খাত হিসেবে পরিচালিত হয়। অথচ বাংলাদেশে এই দুই খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য। বর্ষায় বিদ্যালয় বন্ধ হলে কীভাবে শেখার কার্যক্রম চলবে, কীভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকবে, কীভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হবে- এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো প্রয়োজন।
এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে জরুরি। প্রথমত, জলাবদ্ধতা ও বন্যা-সহনশীল শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা ও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাক্রমে দুর্যোগকালীন নমনীয়তা রাখতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে। চতুর্থত, ডিজিটাল ও অফলাইন শিক্ষাসামগ্রীর সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ের জলাবদ্ধতার ঘটনা তাই কেবল একটি স্থানীয় সংবাদ নয়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। বৃষ্টি আমাদের জন্য আশীর্বাদ, কৃষির প্রাণশক্তি এবং প্রকৃতির পুনর্জাগরণের উৎস। কিন্তু সেই বৃষ্টি যদি বারবার শিশুদের শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমস্যাটিকে আর মৌসুমি দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিটি হারানো পাঠদিবস মানে শুধু একটি ক্লাস কম হওয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিশুর শেখার গতি, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তাই বর্ষা মৌসুমে শিক্ষা অব্যাহত রাখা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটা শিশুদের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন এমন একটি স্থিতিস্থাপক শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে বৃষ্টি নামলেও শেখা থেমে থাকবে না।
দীপু মাহমুদ: কথা সাহিত্যিক, চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ
মন্তব্য করুন

