Logo

৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

অঙ্কের খাতায় ভালোবাসা, রাজনীতির খাতায় কাঁপুনি

ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ

অঙ্কের খাতায় ভালোবাসা, রাজনীতির খাতায় কাঁপুনি

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

রাজনীতিতে কিছু কথা আছে, যেগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে বক্তা ভাবেন তিনি ফুল ছুড়েছেন, কিন্তু শ্রোতাদের একাংশের মনে হয় ইট ছোড়া হয়েছে। আবার এমন কিছু কথা আছে, যেগুলো একদল মানুষের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের মতো মধুর শোনায়, আরেক দলের কানে সেগুলো সাইরেনের শব্দের মতো লাগে। ঢাকায় নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্য সম্ভবত সেই দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যেই পড়ে।

ভদ্রলোক বাংলাদেশে এসেছেন অভিনব ভঙ্গিতে। বিমানে চড়ে ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে নয়, স্থলপথে হেঁটে। যেন তিনি কূটনীতিক নন, বরং কোনো সাহিত্য উৎসবে আসা চারণ কবি। সীমান্ত পেরিয়ে তিনি বললেন, ‘আমাদের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি যোগ করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না।’

ব্যস! এরপর আর কিছু লাগে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাজারে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কাঁচামাল খুব কমই পাওয়া যায়। যে দেশে একটি কমা এদিক-ওদিক হলেই টকশোতে তিন দিন ধরে আলোচনা চলে, সেখানে ‘১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করেছি’—এই বাক্য তো একেবারে সোনার খনি।

একদল বললেন, ‘দেখেছেন! এ তো স্পষ্ট ইঙ্গিত! অঙ্ক দিয়ে শুরু, পরে মানচিত্রে গিয়ে শেষ হবে না তো?’

আরেক দল বললেন, ‘আরে না না, এটা তো ভালোবাসার ভাষা। মানুষে মানুষে সম্পর্কের কথা বলেছেন। এত সন্দেহ কেন?’

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য সন্দেহ একটি জাতীয় সম্পদ। আমাদের এখানে কেউ যদি বলে, ‘চা খাবেন?’, তাহলেও অন্তত তিনজন জিজ্ঞেস করবে, ‘চায়ের আড়ালে উদ্দেশ্যটা কী?’

ত্রিবেদীর বক্তব্য শুনে সেই চিরন্তন প্রবাদের কথাই মনে পড়ে—‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল।’ ভদ্রলোক হয়তো বলতে চেয়েছেন দুই দেশের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতার কথা। কিন্তু উপমহাদেশের রাজনীতিতে হৃদয় খুব কমই একা হাঁটে; তার সঙ্গে ইতিহাস, ভূরাজনীতি, সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য ঘাটতি, ভিসা জটিলতা, নির্বাচন এবং আবেগ—সব একসঙ্গে হাঁটে।

সবচেয়ে মজার অংশ হলো ‘আমরা সবাই ভাই-বোন’ তত্ত্ব।

উপমহাদেশে ‘ভাই’ শব্দটির ইতিহাস বড় বিচিত্র। যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন আমরা ভাই। যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হয়, তখন আমরা প্রতিবেশী। আর যখন ঝগড়া বেড়ে যায়, তখন আমরা একে অপরকে ইতিহাস পড়াতে শুরু করি। 

কূটনীতিকদের ভাষা সাধারণত মাপা হয় মাইক্রোমিটার দিয়ে। তারা ‘হ্যাঁ’ বলতেও এমনভাবে বলেন যে, শুনে মনে হয় ‘হয়তো’। আর ‘না’ বললেও মনে হয় ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যাবে’। সেখানে একজন হাইকমিশনার যদি সীমান্ত পেরিয়েই ১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করে ফেলেন, তাহলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তো ঈদের আগে গরুর হাট পেয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হবেই।

বাংলাদেশে এখন দুই ধরনের মানুষ দেখা যাচ্ছে। একদল ত্রিবেদীর বক্তব্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। অন্যদল মহুয়ার সুবাস খুঁজে পাচ্ছেন। প্রথম দলের যুক্তি, ‘আকাশ এক, বাতাস এক’—এসব কথা ইতিহাসে অনেক সময় বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের ভূমিকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই সাবধান। দ্বিতীয় দল বলছেন, ‘আরে ভাই, এত ভয় পাওয়ার কী আছে? মানুষটা ভালোবাসার কথা বলেছেন। পৃথিবীতে যখন ঘৃণা বাড়ছে, তখন অন্তত একজন ভালোবাসার কথা বলছেন।’

দুই পক্ষের মাঝখানে সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে ভাবছে, ‘ভিসাটা আগে সহজ করেন, তারপর ভালোবাসার বাকিটা দেখা যাবে।’ কারণ উপমহাদেশে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন আর কবিতা নয়, ভিসা। আপনি যতই বলুন ‘একই আকাশ, একই বাতাস’, যদি ভিসার লাইনে তিন দিন দাঁড়াতে হয়, তাহলে আকাশের রংও একটু ফ্যাকাসে লাগে।

ত্রিবেদী বলেছেন, ‘আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব।’ এই বাক্যটিই সম্ভবত তাঁর পুরো বক্তব্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ। কারণ কূটনৈতিক প্রেমপত্রের চেয়ে ভিসা অনুমোদনের এসএমএস অনেক বেশি হৃদয়স্পর্শী। আমাদের অঞ্চলের মানুষ খুব বাস্তববাদী। তারা জানে, ‘ভাই-বোন’ শব্দটি শুনতে ভালো। কিন্তু সীমান্তে ট্রাক আটকে গেলে, রপ্তানি জটিলতা তৈরি হলে কিংবা চিকিৎসার জন্য ভিসা না পেলে সেই ভাইবোনত্বের উষ্ণতা কিছুটা কমে যায়।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। ত্রিবেদী নিজে কিন্তু রাজনৈতিক জীবনে অনেক অভিজ্ঞতার সমাহার। একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে ছিলেন, পরে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি ভারতের রাজনীতির নানা স্বাদ গ্রহণ করেছেন। ফলে তিনি জানেন, একটি বাক্য কীভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে বিভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে। হয়তো তিনি সত্যিই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কথা বলেছেন। কিন্তু রাজনীতির বাজারে বক্তব্যের মালিকানা বক্তার হাতে থাকে না; ব্যাখ্যার মালিকানা চলে যায় শ্রোতার হাতে।

এ যেন সেই পুরোনো গল্পের মতো। এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমি শান্তির কথা বলছি।’ সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন দাঁড়িয়ে গেল। একজন বললেন, ‘এটা নিশ্চয় যুদ্ধের প্রস্তুতি।’ দ্বিতীয়জন বললেন, ‘না, এটা নির্বাচনী কৌশল।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘না, এটা আন্তর্জাতিক বার্তা।’ চতুর্থজন বললেন, ‘না, এটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।’ পঞ্চমজন বললেন, ‘আসলে উনি শান্তির কথাই বলেছেন।’ তখন বাকি চারজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আপনি এত সরল কেন?’

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সরলতা সত্যিই একটি দুর্লভ জিনিস। ‘একই আকাশ, একই বাতাস’—এই কথাটিও কম চমৎকার নয়। প্রকৃতপক্ষে আকাশ তো সত্যিই এক। বাতাসও সীমান্ত মানে না। পদ্মার ইলিশ পাসপোর্ট দেখে সাঁতার কাটে না। মেঘও ভিসা নিয়ে আসে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, কূটনীতি চলে প্রকৃতির নিয়মে নয়, রাষ্ট্রের নিয়মে। তাই একই আকাশের নিচে থেকেও অনেক সময় দুই দেশের মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। আবার অনেক সময় হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও সম্পর্ক উষ্ণ থাকে।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সত্য সম্ভবত ভূগোল নয়, মনস্তত্ত্ব। ত্রিবেদীর বক্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ সম্ভবত ‘অভিন্ন স্বপ্ন’ ধারণা। প্রশ্ন হলো, সেই স্বপ্ন কী? বাংলাদেশের স্বপ্ন একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান। ভারতেরও নিজস্ব স্বপ্ন আছে—অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থান, আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি, বৈশ্বিক নেতৃত্ব। এই দুই স্বপ্ন যেখানে মিলবে, সেখানে সহযোগিতা সহজ হবে। যেখানে সংঘাত তৈরি হবে, সেখানে কূটনীতিকদের হাসিমুখে কঠিন আলোচনা করতে হবে। এটাই বাস্তবতা।

তাই ‘সব সমস্যার সমাধান ভালোবাসা দিয়ে সম্ভব’—বাক্যটি শুনতে যতই সুন্দর লাগুক, বাস্তবে ভালোবাসার সঙ্গে কিছু চুক্তি, কিছু ন্যায্যতা, কিছু পারস্পরিক সম্মান এবং কিছু বাস্তব পদক্ষেপও লাগে। শুধু ভালোবাসা দিয়ে যেমন সংসার চলে না, তেমনি শুধু আবেগ দিয়ে রাষ্ট্রও চলে না।

শেষ পর্যন্ত দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এটিই—তিনি বাংলাদেশে পা রেখেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছেন। অনেক কূটনীতিক বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও মানুষের মুখে মুখে ফিরতে পারেন না। তিনি সীমান্ত পেরিয়েই তা পেরেছেন।

তবে তাঁর জন্য একটি ছোট্ট পরামর্শ থাকতেই পারে। বাংলাদেশ এমন এক দেশ, যেখানে মানুষ কবিতাও রাজনৈতিকভাবে পড়ে, আবার রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যেও কবিতা খোঁজে। এখানে ‘১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করেছি’ বললে কেউ ভালোবাসা দেখে, কেউ অঙ্ক দেখে, কেউ ইতিহাস দেখে, কেউ ভূরাজনীতি দেখে। তাই ভবিষ্যতে তিনি যদি বলেন, ‘দুই আর দুইয়ে চার,’ তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না যদি পরদিন টকশোতে প্রশ্ন ওঠে—’এই চার আসলে কোন চার?’

কারণ এদেশে অঙ্ক কখনো শুধু অঙ্ক নয়। এখানে সংখ্যারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকে। আর উপমহাদেশে ভালোবাসাও কখনো শুধু ভালোবাসা নয়; তার সঙ্গে থাকে ইতিহাসের ব্যাগ, ভূরাজনীতির ছাতা, সন্দেহের চশমা আর ব্যাখ্যার একখানা মোটা অভিধান।

দীনেশ ত্রিবেদী সম্ভবত ভালোবাসার ভাষায় কথা বলতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি যে অঞ্চলে এসেছেন, সেখানে ভালোবাসার বাক্যও আগে রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে যায়, তারপর জনমতের বাজারে বিক্রি হয়। সুতরাং ১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করে ১৬০ কোটি বানানো যত সহজ, দুই দেশের মানুষের মনকে এক সূত্রে গাঁথা তত সহজ নয়। অঙ্কের খাতায় যোগ চিহ্ন টানা যায় এক সেকেন্ডে; কিন্তু ইতিহাসের খাতায় সেই যোগফল মিলাতে কখনো কখনো লেগে যায় কয়েক প্রজন্ম। আর সে কারণেই হয়তো পুরোনো প্রবাদটি আজও টিকে আছে—’মুখের কথা আর তীরের ফলার কোনো ফেরত নেই।’ হাইকমিশনারের একটি বাক্য এখন উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে; কেউ তাতে শান্তির কবুতর দেখছেন, কেউ দেখছেন রাজনীতির বাজপাখি। সত্যিটা কোথায়, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত অঙ্কের এই যোগফলই দুই বাংলার রাজনৈতিক চায়ের কাপে বেশ বড়সড় এক ঝড় তুলে দিয়েছের

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo