Logo

৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

×

Follow Us

জরুরি কোনটা - বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি হারিয়ে যাওয়া শিশু ফিরিয়ে আনা!

বাংলাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট এখন উচ্চশিক্ষার আসনসংখ্যা নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

জরুরি কোনটা - বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি হারিয়ে যাওয়া শিশু ফিরিয়ে আনা!

দীপু মাহমুদ

Icon

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের আকাঙ্ক্ষা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে, গবেষণার প্রয়োজন আছে, দক্ষ মানবসম্পদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে দেশে এখনো লক্ষ লক্ষ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে, যে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে, সে দেশে শিক্ষানীতির প্রথম অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি হারিয়ে যাওয়া শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা?

প্রশ্নটি আবেগের নয়, এটা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্ন।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল বলছে, প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুদের প্রায় ৬.৭ শতাংশ এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে। আরও উদ্বেগজনক হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা পিরামিডের ভিত্তি হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। ভিত্তি দুর্বল রেখে চূড়ায় নতুন তলা যোগ করা যায়, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষাব্যবস্থার শীর্ষস্তর। সেখানে পৌঁছানোর আগেই যদি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পথ থেকে ছিটকে পড়ে, তাহলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন তৈরি হলেও তার প্রকৃত শিক্ষার্থী কোথা থেকে আসবে?

বাংলাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট এখন উচ্চশিক্ষার আসনসংখ্যা নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। বহু শিশু দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং পারিবারিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদ্যালয় ত্যাগ করে। ইউনিসেফ-সমর্থিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বিপুলসংখ্যক শিশু মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা অর্জন না করেই পরবর্তী জীবনে প্রবেশ করছে।

এখানেই নীতিগত প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে শত শত কোটি টাকা প্রয়োজন। জমি, অবকাঠামো, আবাসন, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণাগার, প্রশাসনিক ব্যয়- সব মিলিয়ে ব্যয় অত্যন্ত বড়। অন্যদিকে একই অর্থ দিয়ে হাজার হাজার ঝরে পড়া শিশুকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, বিদ্যালয় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে বিদ্যালয় সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

শিক্ষামন্ত্রী নিজেই সংসদে জানিয়েছেন যে দেশের ২,৮৩৯টি গ্রামে এখনো কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এই বাস্তবতায় প্রতিটি আসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা এক ধরনের নীতিগত বৈপরীত্য তৈরি করে। একটি গ্রামে যদি বিদ্যালয় না থাকে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত?

শিক্ষানীতির ইতিহাস বলছে, যেসব দেশ মানবসম্পদ উন্নয়নে সফল হয়েছে, তারা প্রথমে সর্বজনীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনাম- কেউ বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণকে শিক্ষাবিপ্লবের সূচনা বিন্দু বানায়নি। তারা প্রথমে নিশ্চিত করেছে যেন কোনো শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, যেন প্রতিটি শিক্ষার্থী মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে, যেন শিক্ষকতার মান উন্নত হয়। তারপর উচ্চশিক্ষা বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নির্ভর করবে আজকের শিশুদের ওপর। যদি তারা বিদ্যালয়ে না যায়, যদি তারা দক্ষতা অর্জন না করে, যদি তারা শিশুশ্রম বা বাল্যবিবাহের শিকার হয়, তাহলে শত বিশ্ববিদ্যালয়ও দেশের মানবসম্পদ সংকট দূর করতে পারবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো মান। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিং, গবেষণা প্রকাশনা, উদ্ভাবন, পেটেন্ট কিংবা শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ- প্রায় সব সূচকেই আমরা পিছিয়ে। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন কি বেশি জরুরি নয়? সংখ্যাবৃদ্ধি নয়, গুণগত উৎকর্ষই কি এখন সময়ের দাবি নয়?

রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তই মূলত অগ্রাধিকার নির্ধারণের সিদ্ধান্ত। যখন একজন শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে, তখন সে শুধু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় না- তার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, শিশুশ্রমে জড়ানোর আশঙ্কা বাড়ে, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা কমে যায়। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা প্রত্যেক শিশু আসলে জাতীয় উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকা একটি সম্ভাবনা।

তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো- আমরা কি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা গণনা করব, নাকি বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা শিশুদের সংখ্যা গণনা করব?

রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিশু এবং শিক্ষাবান্ধব হতে চায়, তাহলে প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন শিশুও যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে। প্রতিটি গ্রামে বিদ্যালয়, প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, ঝরে পড়া রোধে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষকতার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ- এসব নিশ্চিত করার পরই বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণের বৃহৎ পরিকল্পনা অর্থবহ হবে।

কারণ শিক্ষার পিরামিডের চূড়া যতই উঁচু হোক, তার ভিত্তিতে যদি হারিয়ে যাওয়া শিশুদের কান্না লুকিয়ে থাকে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

দীপু মাহমুদ: কথা সাহিত্যিক, চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ

মন্তব্য করুন

Logo