Logo

৫ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে পড়া দেশহীন মানুষ এবং আমাদের বিবেকবোধ

শিশুসহ ১০ জন মানুষকে বিএসএফ পঞ্চগড় সীমান্তের শূন্যরেখায় ঠেলে দেয়, তিনদিন ধরে তারা সেখানে অনাহারে দিনাতিপাত করেছে। ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে পড়া দেশহীন মানুষ এবং আমাদের বিবেকবোধ

শেখ ফাহিম ফয়সাল

Icon

শেখ ফাহিম ফয়সাল

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

গত কয়দিন ধরে যারা 'ন্যো ম্যান্স ল্যান্ডে' আছেন, তাদের ব্যপারে আপনি দরদী হতে পারবেন না। ঔপনিবেশিক 'আধুনিক রাষ্ট্র' আপনাকে এমনই 'দেশপ্রেমের' আফিম খাইয়েছে। প্রবল স্বার্থপর, বর্ণবাদী আর অতিরিক্ত হিসেবি একেকটা রোবট বানিয়েছে আমাদেরকে। আমাদেরকে বানিয়েছে একেকজন অপরাধবোধহীন মানুষ। একেবারে বর্বরতার চূড়ান্ত ধাপ, যেখানে সামান্যতম দরদী আপনি দেখা পারবেন না। আপনার 'সীমানা'র বাইরের কাউকে অন্যায়ভাবে আপনার সীমানায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে, এটা আপনি 'বাস্তব' দৃষ্টিতে মানতে পারেন না, সেটা বোধগম্য। কিন্তু কমসেকম ন্যূনতম মায়া যদি আপনার না লাগে, আপনি আসলে কী? আপনি নিরুপায়, আমরা নিরুপায়। কথা সত্য। চাইলেও জায়গা 'দিতে' পারিনা আমরা কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও দিতাম কি-না সন্দেহ, কিন্তু, সেই মানুষগুলো, যাদের মধ্যে বৃদ্ধ ও শিশুরা পর্যন্ত আছে, তারা তো অন্তত সহানুভূতি ডিজার্ভ করে, না-কি? দেখলাম, যারাই কিছুটা সহানুভূতি নিয়ে লেখালেখি করছে, পঙ্গপালের মতো কিছু মানুষ তাদেরকে আক্রমণ করছেন। রোষানলে পড়ার ভয়ে কেউ কেউ 'আহারে' পর্যন্ত বলতে পারছে না। কখন না জানি 'দেশপ্রেমিক আর্মি' ফেসবুকের কমেন্টে দেশরক্ষা শুরু করে দেয়!

আমরা গত কয়েক দশক ধরে যে 'আইডিয়াল ওয়ার্ল্ড' এর গল্প শুনতাম, তার মুখোশ ধীরেধীরে খসে পড়েছে। বৈশ্বিক মোড়লরা চাইলেই দুর্বলের প্রতি আঘাত করতে পারে, ইউক্রেন বা ইরান ধ্বংস করে দিতে পারে। চাইলেই অন্য দেশের রাষ্ট্রপতিকে তুলে আনা যায়। চাইলেই নিজের দেশের মানুষকে অন্য দেশের বর্ডারে পুশ ইন করা যায়।

এই প্রত্যেকটা বিষয় যখনই ঘটে, সেই রেডক্লিফ লাইন, যে ধরনের লাইন আসলে আমাদের হৃদয়কে পর্যন্ত ভাগ করে ফেলেছে। পুরাতন তুর্কি একটা প্রবাদ আছে।

ব্রিটিশ কোনো বিমান যদি নদীর উপর দিয়ে যায় 

মাছেরাও দুই ভাগ হয়ে যায়।

ব্রিটিশদের ভাগ করার তলোয়ার এতোটাই ধারালো আর বিষাক্ত যে, আকাশে উড়তে উড়তেও যদি ক্ষণিকের কারণে নদীর উপর দিয়ে যায়, মাছেরাও দুই ভাগ হয়ে যায়। যেখানে একই কাগজের উপর দিয়ে পেন্সিলে দাগ কাটলে, একই বাড়ির রান্নাঘর এক দেশে, অন্য দেশে চলে যায় বাড়ির উঠান। সেই জায়গাগুলো একবারের জন্য না দেখেও কীভাবে যেন ভাগ করে ফেলা যায়। ভাগ হয়ে যায় পাগলাগারদের পাগলেরাও।

আমরা এখন দেশে বাস করিনা, রাষ্ট্রে বাস করি।

দেশ ইনক্লুসিভ, রাষ্ট্র এক্সক্লুসিভ।

যারা দেশহীন হয়, নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়, সেখানেও আবার আগের দেশের ট্যাগ লেগে থাকে, এরপর আবার নতুন রাষ্ট্রে যায়। পরিচয়ের এই পরিবর্তন ঘটতেই থাকে। ৪৭ এর দেশভাগের প্রধান কারিগরদের প্রায় সবাই পশ্চিমা শিক্ষায় গড়ে উঠেছিলেন। গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরু, ইকবাল সহ প্রায় সবারই পড়াশোনা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো কেটেছে পাশ্চাত্যে। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক চিন্তা, বিতর্ক, সমঝোতা ও সিদ্ধান্তের শেষ পরিণতি যে সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয়েছিল, তারা এই বিভাজনের বাস্তবতার জন্য মানসিক ও সামাজিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। দেশভাগ তাদের জীবনে যে বিপর্যয়, অনিশ্চয়তা ও স্থানচ্যুতি নিয়ে আসবে, তার পরিধি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের কোনো স্পষ্ট ধারণাই ছিল না। 

প্রায় দুই কোটি মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, বিশ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো ইতিহাসের কাগজে কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থাকে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একেকজন মানুষ। ছিল পরিবার, একটি জীবন ও একেকজনের সম্পূর্ণ পৃথিবী। দেশভাগ মানে কি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া? তা তো নয়। এর অর্থ ছিল কোটি কোটি মানুষের নিজের জন্মভূমি, পরিচিত পথঘাট, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি, স্মৃতি, প্রতিবেশী, ভাষার টান আর সাংস্কৃতিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। অনেকে এমন জায়গা ছেড়ে গিয়েছিল যেখানে তাদের পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেটেছে, অথচ তারা নিজেরা কখনো দেশ বদলানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইতিহাস সাধারণত সীমান্তের রেখা, রাজনৈতিক চুক্তি আর জনসংখ্যার হিসাব মনে রাখে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যায় অগণিত মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঘর, অসমাপ্ত জীবন, ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক আর এমন এক বেদনা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা হচ্ছে। 

ভারতবর্ষের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, জনসংখ্যার বিন্যাস, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, সীমান্তসংকট, নিরাপত্তানীতি, এমনকি কোটি কোটি মানুষের পারিবারিক স্মৃতিও কোনো না কোনোভাবে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার বাস্তব রূপ নির্ধারিত হয়েছিল দেশভাগের মধ্য দিয়ে। ভারত, পাকিস্তান এবং পরে বাঙলাদেশের জন্ম, কাশ্মীর প্রশ্ন, একের পর এক যুদ্ধ, শরণার্থী প্রবাহ, সংখ্যালঘু রাজনীতি, জাতীয় পরিচয়ের বিতর্ক, সবকিছুর শিকড় কোনো না কোনোভাবে ১৯৪৭ এ গিয়ে মেলে। এই অর্থে বলা যায়, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমানকে বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হলো ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। কারণ উপমহাদেশের পরবর্তী ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি বড় স্রোত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, সেই বিভাজনের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে।

বাংলাদেশের উর্দুভাষী কবি আহমদ ইলিয়াসের কথা মনে পড়ছে। তাঁর জীবন আক্ষরিক অর্থেই দেশভাগের ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক। পরিবারের শিকড় ছিল বিহারে, জন্মেছিলেন কলকাতায়। অর্থাৎ জন্মের সময় তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক। প্রথম যৌবন কেটেছে পূর্ব পাকিস্তানে, আর জীবনের পরবর্তী অধ্যায় স্বাধীন বাংলাদেশে।

এক জীবনেই তিনটি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব, অথচ কোথাও পুরোপুরি ‘আপন মানুষ’ হয়ে ওঠার সুযোগ পাননি।

দেশভাগের পর জন্মভূমি বিহার ও কলকাতা ছেড়ে তাঁকে চলে আসতে হয় পাকিস্তানে। সেখানে তিনি ছিলেন ‘মুহাজির’, অর্থাৎ বাইরে থেকে আসা মানুষ। তারপর পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে গেল। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক রয়ে গেলেন, কিন্তু পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গেল আরেকটি শব্দ, ‘বিহারী’। শব্দটি মূলত ভৌগোলিক ও জাতিগত পরিচয়ের হলেও, আমাদের সমাজে বহু সময় তা অবজ্ঞার সুরে উচ্চারিত হয়েছে। ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়। যে মানুষটি তিনটি রাষ্ট্রের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছেন, তিনি প্রতিটি রাষ্ট্রেই কোনো না কোনোভাবে ‘অন্যজন’। কোথাও সম্পূর্ণ নিজের নন, কোথাও সম্পূর্ণ পরও নন।

এমন অভিজ্ঞতা শুধু আহমদ ইলিয়াসের নয়। জগদ্বিখ্যাত কাওয়ালি শিল্পী ফারিদ আয়াক একবার বলেছিলেন, তাঁর পরিবারও ছিল মুহাজির পরিবার। দেশভাগের আগে তাঁদের বাস ছিল দিল্লিতে। দেশভাগের পরে ঠিকানা হলো পাকিস্তান। কিন্তু পরিচয়ের সংকট থেকে গেল। দিল্লির মানুষ তাঁদের লাহোরের লোক ভাবত, আর লাহোরের মানুষ ভাবত দিল্লির লোক।

দেশভাগের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডিগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই। সীমান্ত বদলেছিল কয়েকটি রেখা টেনে, কিন্তু সেই রেখাগুলো মানুষের পরিচয়, স্মৃতি, সম্পর্ক ও আত্মবোধকেও কেটে দিয়েছিল। কেউ রাতারাতি সংখ্যালঘু হয়ে গেল, কেউ শরণার্থী, কেউ মুহাজির, কেউ ‘বিহারী’। অথচ তাদের অধিকাংশই কোনো নতুন দেশ খুঁজতে বের হয়নি। নতুন দেশই একদিন তাদের চারপাশে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই দেশভাগকে শুধু ভূখণ্ডের বিভাজন বললে কম করে বোঝা হয়। মানুষের ‘আপন’ ও ‘পর’-এর সংজ্ঞাকে পুনর্লিখনের এক বিশাল সামাজিক পরীক্ষা ছিল সাতচল্লিশ, যার প্রভাব আজও শেষ হয়ে যায়নি।

প্রায় ৭০ ঘণ্টা পর আটকে পড়া ১০ জনকে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ, ছবি: সংগৃহীত

তিনি গত হয়েছেন ২০২৩ সালে। যে ভাষায় কবিতাটি লিখেছেন, সেটি উর্দু। এইযে দেশ আর বিদেশে, আপন আর পরের মাঝখানে আটকে থাকা মানুষের পরিচয়ের সংকটকে তিনি লিখেছেন এমন এক ভাষায়, যে ভাষায় আজ কবিতা লেখেন খুব অল্প কয়েকজন মানুষ। একসময় এই ভাষা ছিল হাজারো পরিবারের ভাষা। যে ভাষায় তিনি কবিতাটি বলছেন, সেই ভাষা আর কিছুদিন পরে কেবলই স্মৃতির ভাষা হয়ে যাবে। এই ভূখণ্ডে এই ভাষায় নতুন কবির সংখ্যাও হাতেগোনা। কয়েক বছরেই সব নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন তাঁর কবিতাগুলো সাহিত্যের পাশাপাশি, এই অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ভাষা ও তার মানুষের স্মৃতি হিসেবেও পড়া হবে।

‘এক ঢোঁকে বিষ পান করা খুবই সহজ, জানি

সারা জীবন হৃদয়ের রক্ত পান করে দেখাক তো কেউ’

এই ধরনের পঙক্তি হঠাৎ করে লেখা যায় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ বেদনা এবং অবশ্যই দীর্ঘ অপেক্ষা। মৃত্যুর মুহূর্তের কষ্টের চেয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট যে অনেক সময় গভীর হতে পারে, ইলিয়াস সেই কথাটাই কয়েকটি শব্দে বলে ফেলেছেন। একবার বিষ পান করা সহজ হতে পারে, কিন্তু প্রতিদিন নিজের ভেতরের ক্ষত, অপমান, একাকিত্ব আর স্মৃতির ভার নিয়ে বেঁচে থাকা অনেক কঠিন।

আবার যখন তিনি লেখেন,

‘আমি নিজ ঘরে সেই অতিথি, ইলিয়াস

সব আমন্ত্রণকারী যাকে ভুলে গেছে’

তখন আসলে, কথাগুলো ব্যক্তিগত অভিমানকে ছাড়িয়ে আরও বড় অর্থ ধারণ করে। তখন ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠে সেই কবিতা। যে মানুষ নিজের দেশেও পুরোপুরি আপন নয়, নিজের শহরেও নয়, নিজের ভাষার ভেতরেও ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে, তার অনুভূতি এই কয়েকটি পঙক্তিতে ধরা পড়ে। দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। সেখানে সীমান্ত, রাজনীতি, চুক্তি, পরিসংখ্যান সবই আছে। কিন্তু ‘নিজ ঘরে অতিথি’ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যায় না। একটি মানুষ যখন অনুভব করে যে চারপাশের সবকিছু তার পরিচিত, অথচ কোথাও তার জন্য কোনো জায়গা নেই, তখন সেই অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ইলিয়াস সেই কঠিন কাজটিই করেছেন। তবে যে কবিতাটা মনে পড়ছিলো এই 'পুশ ইন' এর ঘটনার মধ্যে, এবার সেটা বলে শেষ করি।

কাগজের বাড়ি

যখনই আমি

সাদা কাগজের কোনো টুকরো পাই

নিজেই নড়ে ওঠে আঙুল আমার

তারপর কাগজে রেখা আঁকা

শুরু হয়ে যায়

শুরু হয়ে যায় কল্পনার বাড়ি বানানোর কাজ

আমি কাগজে দেয়াল ওঠাই

দরজা বানাই

জানালা, অলিন্দ সাজাই

ঘরের সামনে বাগানে ফুল ফোটাই

এরপর, নিজের বাড়ির ছবি দেখে

আমার ভয় লাগে

যেমন করে আমি নিজের বাড়ি হারিয়েছি

হারিয়েছি আসমান ও জমিন

কাগজের এই টুকরোও হারিয়ে না যায়

আমি আবার যদি গৃহহীন হয়ে যাই

কবিতাটি শুরু হয় একটি সাধারণ দৃশ্য দিয়ে। একটি সাদা কাগজের টুকরো সামনে পড়ে আছে, আর আঙুল নিজেই নড়ে ওঠে। ইলিয়াস বলছেন না যে তিনি সচেতনভাবে বাড়ি আঁকতে বসেছেন। আঙুল নিজেই টেনে নিয়ে যায়। সেই কবিতাটির কথা মনে পড়ে।

ম্যায়ঁনে তো য়ুঁহি খাক মেঁ ফেরি থি উংগলিয়া 

দেখা জো গওর সে তেরি তসভির বন গ্যায়া

আমি তো এমনিই ধুলোতে আঁচড় কাটছিলাম 

তাকিয়ে দেখি তোমার ছবি হয়ে গেছে

এটাকে উপজীব্য করে আমিও লিখেছিলাম:

এমনি এমনিই তো গুনগুন করছিলাম

শুনে জগদ্বাসী বলে উঠলো, বাহ অসাধারণ সঙ্গীত

কিছু শব্দগুচ্ছ বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম

সকলে সমস্বরে বলে উঠলো, আহ! কী বেদনাময় মার্সিয়া

নিদারুণ অবহেলা নিয়ে মনে মনে অভিযোগ করছিলাম

শেষে দেখি ইকবালের চাইতেও বড় শিকওয়া হয়ে গেছে!

দেখা হওয়ার শুরু থেকে শেষদিন পর্যন্ত মুহুর্তগুলো ভাবলাম

চোখের জলে মহাকাব্য যেন বেয়ে বেয়ে পড়লো

কেবল তোমার স্মরণ করে গাছের দিকে তাকিয়েছিলাম

গাছের সব পাখিরা কেমন বেদনাবিধুর ডাক ডাকছে!

যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরি।

একটু স্থির হয়ে এই 'নিজেই নড়ে ওঠে' কথাটা ভাবলে, বেশ গভীর বিষয় মনে হয়। যে মানুষ জীবনের বড় একটা অংশ ঘর ছাড়া কাটিয়েছেন, তার ভেতরে ঘরের একটা তৃষ্ণা থেকে যায়। সেই তৃষ্ণাটা এতটাই স্বাভাবিক যে সুযোগ পেলেই সে বের হয়ে আসে। কাগজ পেলে হাত চলে যায়, বাড়ি আঁকা শুরু হয়।

এরপর তিনি কী আঁকেন? দেয়াল, ওঠান, দরজা বানান, জানালা সাজান, এমনকি ঘরের সামনের সেই বাগানও গড়েন এবং সেই বাগানে ফুলও ফোটান। পুরোটা পড়তে পড়তে মনে হয়, এ যেন পুরো বাড়ির নকশা একে চলেছে এক অবচেতন মন। একটি পূর্ণ জীবনের ছবি। দেয়াল মানে নিরাপত্তা। দরজা মানে আসা-যাওয়ার অধিকার। জানালা মানে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক। আর বাগানের ফুল মানে, সেই বাড়িতে বেঁচে থাকার উর্ধ্বে উঠে ভালো থাকার ইচ্ছাও। বিহার থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে পূর্ব পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙলাদেশ, এই যে বারবার ভিটেছাড়া হওয়া, তার মধ্যে এই ছোট্ট কাগজের টুকরোটা হয়ে ওঠে তাঁর শেষ মাটি।

কিন্তু কবিতার মোড় ঘুরে যায় এরপর। বাড়ি আঁকা শেষ হলে তিনি নিজের আঁকা বাড়ির দিকে তাকান। আর ভয় পান।

অর্থাৎ, এই ধরনের মানুষেরা কাগজের বাড়ি বানাতেও ভয় পান! এতক্ষণ যা পড়ছিলাম সেটা যেন হঠাৎ উল্টে গেল। সাধারণত মানুষ নিজের বাড়ি বানালে আনন্দ পায়। কিন্তু ইলিয়াস পান ভয়। কারণটা তিনি নিজেই বলেছেন। 'যেমন করে আমি নিজের বাড়ি হারিয়েছি।' এইটুকু পড়লেই বোঝা যায়, এ ভয় নতুন কোনো ভয় নয়। এটি তো সেই পুরনো অভিজ্ঞতার ছায়া। যে মানুষ একবার নয়, বারবার সব হারিয়েছে, সে নতুন কিছু ভালোবাসতেও ভয় পায়। কারণ ভালোবাসা তৈরি হওয়া মানে হারানোর আরেকটি সুযোগ তৈরি হওয়া। সীমানা কে টেনেছে, কেন টেনেছে এত জটিল বিষয় তারা ভাবতে না চাইলেও, সেই রেখা টানার ফলে যে ভয়টা তৈরি হয়েছে, সেটা তাঁদের বুকের ভেতরে থেকে গেছে।

কবিতার শেষ লাইনটি সবচেয়ে সরল, আর সেই কারণেই সম্ভবত সবচেয়ে হৃদয়বিদারক।

'আমি আবার যদি গৃহহীন হয়ে যাই।'

'আবার' শব্দটির দিকে একটু মনোযোগ দিলেই সব বোঝা যায়। ইলিয়াস বলছেন না 'যদি গৃহহীন হই।' বলছেন 'আবার যদি গৃহহীন হই।' অর্থাৎ এটা আগেও ঘটেছে। একবার নয়, বারবার ঘটেছে। ফলে তাঁর কাছে গৃহহীনতা কোনো অকল্পনীয় বিপদ নয়। একেবারে পরিচিত সম্ভাবনা। যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে। তাই কাগজের বাড়িটুকুও স্থায়ী কি-না সে নিশ্চিত নয়।

এখানে আরেকটি কথা মনে আসে। কাগজের বাড়ি ইলিয়াস আঁকছেন কবিতার ভাষায়, উর্দুতে। এই ভূখণ্ডে যে ভাষায় এখন কবিতা বলেন খুব অল্প মানুষ। কয়েক বছরেই সব শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, যে কাগজে তিনি বাড়ি বানাচ্ছেন, সেই কাগজটিও একদিন মিলিয়ে যাবে। বাড়িটি তো পরে, আগে ভাষাটাও হারিয়ে যাবে। তখন এই কবিতাগুলো কেবল একজন কবির কবিতা হয়ে থাকবে না, একটি জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ চিহ্ন হয়ে থাকবে।

'এক ঢোঁকে বিষ পান করা খুবই সহজ, জানি

সারা জীবন হৃদয়ের রক্ত পান করে দেখাক তো কেউ'

এই পঙক্তি দুটি এবং 'কাগজের বাড়ি' আসলে একই পয়সার দু'টি মুখ। একটিতে আছে বেঁচে থাকার ক্লান্তি, অন্যটিতে আছে তবু বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছা। বিষ পান করা সহজ বলেও যে মানুষ বেঁচে থাকেন, সে মানুষই কাগজ পেলে বাড়ি আঁকেন। দরজা বানান। জানালা সাজান। ফুল ফোটান। আর তারপর ভয় পান। কারণ ভালোবাসার মতো মানুষ তাঁর আছে, কিন্তু তা ধরে রাখার কোনো নিশ্চয়তা তাঁর কখনো ছিল না।

ইলিয়াস'রা তো তা-ও মাথা গুজার জায়গা পেয়েছে। জায়গা পাচ্ছে না প্রায় সত্তর বৎসর বয়সী মাজেদা। আপনি জায়গা দিতে পারবেন না বিচিত্র টানাপোড়েনের কারণে। আপনি দরদও দেখাতে পারবেন না। আবার সেজন্য আমাদের কোনো অপরাধবোধও ঘটবে না।

কারণ, আমরা সভ্য থেকে সভ্যতার হইয়াছি। 

শেখ ফাহিম ফয়সাল, লেখক, সঙ্গীত শিল্পী

মন্তব্য করুন

Logo