Logo

৫ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

ডেটলাইন কামালপুর; ৫৫ বছর আগে-পরে

দুই সীমান্তের মাঝখানে আটকে আছেন ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মণ, ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

ডেটলাইন কামালপুর; ৫৫ বছর আগে-পরে

আলতাফ পারভেজ

Icon

আলতাফ পারভেজ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৯:২৩ এএম

ফুটবলে বিশ্বকাপ দখলের লড়াইয়ে নামছে দুনিয়া। এই সময়টা জাতীয়তাবাদের বৈশ্বিক উৎসবের মতো। দুনিয়ার মানুষ সীমান্তে-সীমান্তে বিভক্ত হয়ে উঠবে এসময়।

ম্যাসব্যাপী এই ‘যুদ্ধে’র জান্তব অংশটুকু আড়াল করতে একে বর্ণিল একটা আবহও দেয়া হবে। জাতীয়তাবাদ ও ‘রাষ্ট্র’ চেতনার কোষাগারে যত উৎসাহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার তেজ আছে তার অনেকখানিই এসময় দেখবো আমরা। বলা ভালো ‘দেখানো হবে আমাদের’। বিশ্বজুড়ে এই মওসুমে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রপ্রেম বিক্রি করে দেশে-দেশে মিডিয়াগুলো কত আয় করবে সেটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য।

ঠিক এসময় ষষ্টি চন্দ্র বর্মণও মিডিয়ার খোরাক হলেন। শূন্যরেখার প্রস্তজুড়ে খাবার-পানি-আশ্রয়ের জন্য দুই ‘রাষ্ট্রে’র দিকে দৌড়াদুড়ি করছিরেন ষষ্টি কামালপুর সীমান্তে। ইতিহাসের কী প্রবল কৌতুক—১৯৭১ এ এই কামালপুরেই প্রথম ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ে তুলেছিলেন ‘মুক্তিযোদ্ধা’রা। তখনকার বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় জুলুমকে প্রতিরোধে নেমে ষষ্টিদের মুক্তির বাসনায় নেমেছিল ১১ নং সেক্টরের এক দল যোদ্ধা। এরকম মুক্তাঞ্চলগুলো ক্রমে ক্রমে ষোল-ডিসেম্বর এনে দেয়। কিন্তু ষষ্টি চন্দ্রের এখনও শূন্যরেখায় দৌড়াদুড়ি করতে হয়। ষোল-ডিসেম্বর নতুন ‘পরিচয়’ দিলেও ‘মুক্ত’ করতে পারেনি তাকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরাপত্তাহীনতার চক্র থেকে। ষষ্টি দেখছে তার সামনে রাষ্ট্র, তার পেছনেও রাষ্ট্র—কিন্তু তার জল-খাবার নেই কোন দিকে।

শেষ খবর জানাচ্ছে ষষ্টির ‘পরিচয়’ শনাক্ত হয়েছে! কে শনাক্ত করেছে? একটি রাষ্ট্র। অর্থাৎ ষষ্টির ‘মালিক’ পাওয়া গেছে।

এই যে কেউ মানুষের মালিক হয়ে ওঠে তার জোর কোথায়? তার জোর ক্ষমতায়। এই ক্ষমতার হাতে আছে নিপীড়নের যন্ত্র। ঐ যন্ত্রগুলোই শেষমেশ অনুমোদন দেয় পরিচয়ের। সে শনাক্ত করে বৈধতা। ঐ ‘বৈধতা’র পক্ষেও আইন তারাই বানায়। নিজ চৌহদ্দিতে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রই কেবল স্বাধীন। সকলের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়েই তার স্বাধীনতা, বৈধতা। সে ব্যক্তিকে সামষ্টিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে ছিন্ন করে ফেলে। সে-ই কেবল পাবলিক থাকে, বাকিদের সে প্রাইভেট বানিয়ে দেয়। সেই কারণেই ছবিতে আমরা দেখছি কাঁটাতারের দুই দিক থেকে বৈধ নাগরিকরা ষষ্টি চন্দ্রকে দেখছে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মতো। বাস্তবে বন্দিরাই মুক্ত এক মানুষ দেখছিল তার স্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ের শেষ মুহুর্তটিতে। ষষ্টি চন্দ্রের ঠোঁটে তখন মৃদু হাসির রেখা ‘মুক্ত’রা হয়তো খেয়াল করেননি।

ঠিক তারপরই দেখছি নতুন সংবাদ শিরোনামের জন্ম হলো: ‘ষষ্টি চন্দ্র বর্মন এখন থানায়।’ ষষ্টি আবার জবরদস্তির বৈধ জগতে প্রবেশ করলেন। যেখানে কাঁটাতার আছে। কাঁটাতারের দুই দিকে অনেক শুভেন্দু অধিকারী আছেন। কিন্তু ষষ্টির জন্য কোন জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। নিজের মতো করে জীবিকা খুঁজে নেয়ার স্বাধীনতাও নেই তাঁর। কারণ তিনি একটি বিশেষ ‘রাষ্ট্রের নাগরিক’। যে রাষ্ট্রগুলো বৈধতা ও সভ্যতার বড়াই করে। ফুটবল-ক্রিকেট মাঠে তারা বিজয়ী হতে চায়। কিন্তু তাদের কাঁটাতারও লাগে। কারণ স্ব-কল্পিত এক বিজয়ী-ভূমিতে থাকে তারা। যা আসলে ফানুসের মতো। ঐ ফানুসকেই কাঁটাতারের দুই দিকে শুভেন্দুরা শ্লাগা হিসেবে দেখায়।

সমাজের বিরুদ্ধে শ্লাগার এই বিজয়ে কীভাবে মানুষের মুক্তাঞ্চল হারিয়ে যায়—কামালপুরে প্রায় ৫৫ বছর আগে সম্মুখেযুদ্ধে শত্রুর গুলিতে পা হারিয়ে পাশের তুরা শহরের হাসপাতাল বেডে শুয়ে শুয়ে তাহের সেটাই ভাবছিলেন।

আজও কি কোথাও কেউ এসব নিয়ে ভাবে? হায়, ষষ্টি চন্দ্র বর্মণের ছবির ১০৮২ নম্বর সীমান্তের অদূরেই তো তুরা শহর।

আলতাফ পারভেজ: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

Logo