Logo

১ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া: শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

মত-দ্বিমত

প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া: শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

দীপু মাহমুদ

Icon

দীপু মাহমুদ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রাহাত। ক্লাসে বিশেষ কথা বলে না। বইয়ের রিডিং ঠিকঠাক পড়তে অসুবিধা হয়। শিক্ষকরা তাকে ‘দুর্বল ছাত্র’ বলেই জানেন। তবে বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দেখা গেল, রাহাত অসাধারণ আবৃত্তি করে এবং মঞ্চে তার আত্মবিশ্বাস অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে স্কুলের ফুটবল খেলায় সে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয় এনে দেয়। তখন শিক্ষকরা উপলব্ধি করেন- রাহাতের সমস্যা মেধার নয়, বরং তার প্রতিভা প্রকাশের সুযোগের অভাব।

বাংলাদেশের হাজার হাজার শিশুর কাহিনি প্রায় একই রকম। আমাদের বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে মূলত পরীক্ষার ফল, মুখস্থবিদ্যা ও পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছে। অথচ শিশুর বিকাশ শুধু গণিত বা ভাষা শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তার সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি, সামাজিক দক্ষতা, নেতৃত্ববোধ এবং শারীরিক সক্ষমতারও বিকাশ প্রয়োজন। এই বাস্তবতা থেকেই প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়াকে পৃথক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলা যায়।

উপরের ঘটনার মতো বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় এমন অসংখ্য শিশুকে দেখা যায়, যারা শ্রেণিকক্ষের পরীক্ষায় প্রথম সারিতে না থাকলেও গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য কিংবা খেলাধুলায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেয়। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার মূল মূল্যায়ন দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলকে কেন্দ্র করে হওয়ায় এসব প্রতিভার বড় অংশই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না। ফলে অনেক শিশুর সক্ষমতা পাঠ্যবইয়ের পাতার বাইরে থেকে যায়। অথচ সেগুলোই হয়তো তার ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তি হতে পারত।

এই বাস্তবতায় সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক শিক্ষায় ‘স্পোর্টস’ এবং ‘আর্ট অ্যান্ড কালচার’ বিষয় অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনার কথা জানান। একই সঙ্গে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চারুকলা এবং ক্রীড়াকে শিশুর সামগ্রিক বিকাশের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটা কেবল নতুন বিষয় যুক্ত করার ঘোষণা নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত শিশু বিকাশের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া।

প্রশ্ন হলো, কেন এই বিষয়গুলোকে এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া কি সত্যিই শিশুর বিকাশে এত বড় ভূমিকা রাখে?

শিশুর শরীর গঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকে তার শেখার ক্ষমতাও

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, শিশুর শারীরিক বিকাশ এবং শিখন ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিশু যখন দৌড়ায়, লাফায়, বল ধরে, ছোড়ে কিংবা নাচের তালে শরীর সঞ্চালন করে, তখন তার স্থূল পেশি (Gross Motor Skills) বিকশিত হয়। অন্যদিকে ছবি আঁকা, রং করা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, মাটির কাজ কিংবা কারুকাজের মতো কার্যক্রম সূক্ষ্ম পেশি (Fine Motor Skills) বিকাশে সহায়তা করে।

শৈশবে এই দুই ধরনের পেশি-সঞ্চালনের বিকাশ ভবিষ্যতের অনেক দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। কলম ধরা, লেখা, ভারসাম্য রক্ষা, সমন্বিতভাবে চলাফেরা, এমনকি মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শিশুদের হাড়, পেশি এবং স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থ বিকাশে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এতা স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও কমায়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না। এমন বাস্তবতায় বিদ্যালয়ভিত্তিক ক্রীড়া শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খেলাধুলা ও শিল্পচর্চা কীভাবে মস্তিষ্কের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে

দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পড়াশোনার বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু আধুনিক গবেষণা ভিন্ন কথা বলছে।

শিশু যখন নাটকে অভিনয় করে, তখন তাকে চরিত্র বুঝতে হয়, সংলাপ মনে রাখতে হয় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। যখন সে সংগীত শেখে, তখন তাকে তাল, লয়, স্মৃতি এবং মনোযোগের সমন্বয় ঘটাতে হয়। আবার দলগত খেলায় অংশ নিলে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া, কৌশল নির্ধারণ করা এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো কাজ করতে হয়।

এসব কার্যক্রম শিশুর নির্বাহী দক্ষতা (Executive Function) উন্নত করে, যা পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান, মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু নিয়মিত খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, তাদের শেখার আগ্রহ এবং শিক্ষাগত অর্জন তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।

বস্তুত, শিক্ষা কেবল তথ্য মুখস্থ করার বিষয় নয়, চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়া। শিল্প-সংস্কৃতি এবং ক্রীড়া সেই চিন্তাশক্তিকে বহুমাত্রিকভাবে বিকশিত করে।

ভাষা শেখার শ্রেষ্ঠ অনুশীলন কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষের বাইরেই ঘটে

শিশু যখন আবৃত্তি করে, গল্প বলে, গান গায় কিংবা নাটকে অংশ নেয়, তখন সে ভাষাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় হিসেবে নয়, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে।

ভাষাবিদরা মনে করেন, ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো সক্রিয় ব্যবহার। সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শিশুদের সেই সুযোগ দেয়। একটি নাটকের সংলাপ মুখস্থ করা, মঞ্চে কথা বলা বা গল্প বলা শিশুর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে, উচ্চারণ উন্নত করে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করার সক্ষমতা বাড়ায়।

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে শিল্প-সংস্কৃতিভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের ভাষা শেখাকে আরও স্বাভাবিক ও আনন্দময় করে তুলতে পারে।

আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা ও নেতৃত্ব শেখার নীরব পাঠশালা

শিশুর বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই অবহেলিত ক্ষেত্র হলো সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশ।

একটি ফুটবল ম্যাচে খেলতে গিয়ে শিশু জয়-পরাজয় মেনে নিতে শেখে। একটি নাটকে অংশ নিয়ে সে অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে। সংগীতচর্চা তাকে ধৈর্য শেখায়। দলগত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ তাকে সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

UNESCO দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাকে সামাজিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। একইভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শিশুদের উদ্বেগ, একাকিত্ব এবং মানসিক চাপ কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শৈশবে অর্জিত এই সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতাগুলোই পরবর্তী জীবনে নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে দেয়।

নতুন বিষয় নয়, শিক্ষাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ

ববি হাজ্জাজের ঘোষণার তাৎপর্য এখানেই যে, এটা কেবল পাঠ্যবইয়ে দুটি বা চারটি নতুন বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনা নয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রাথমিক শিক্ষায় এমন দক্ষতাগুলোকে কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেগুলো এতদিন ‘সহশিক্ষা কার্যক্রম’ হিসেবে বিবেচিত হতো।

শুধু বই নয়, যা করতে হবে

এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নতুন বিষয় যুক্ত করাই শেষ কথা নয়। পাঠ্যক্রমে শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার অন্তর্ভুক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর কার্যকর বাস্তবায়ন। অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাই এই উদ্যোগকে সফল করতে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ

শিল্প ও ক্রীড়া শিক্ষা সাধারণ শ্রেণিশিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। সংগীত, চারুকলা, নাট্যকলা ও ক্রীড়ার জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন। কারণ এসব বিষয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি বাংলা, গণিত বা বিজ্ঞানের মতো নয়। একটি শিশুর কণ্ঠস্বর, ছন্দবোধ, অভিনয়ক্ষমতা, শারীরিক দক্ষতা কিংবা সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা দরকার। সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে বিপুলসংখ্যক নতুন শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলেছে, যা বাস্তবায়িত হলে শুধু শিক্ষার মানই বাড়বে না, একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

অবকাঠামো উন্নয়ন

খেলার মাঠহীন বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষা কার্যকর করা কঠিন। একইভাবে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত স্থান, উপকরণ ও পরিবেশ দরকার। বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, কোথাও আবার সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ খেলাধুলা শেখানো যায় না শুধু বই পড়িয়ে, যেমন সংগীত বা নাটকও শেখানো যায় না শুধু তাত্ত্বিক পাঠের মাধ্যমে। শিশুদের হাতে বাদ্যযন্ত্র, রং-তুলি, কারুশিল্পের উপকরণ তুলে দিতে হবে। তাদের দৌড়ানোর, খেলার এবং মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ এই বিষয়গুলোর সফল বাস্তবায়নের জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নম্বরকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পরিবর্তে অংশগ্রহণভিত্তিক মূল্যায়ন

শিল্প ও ক্রীড়াকে আরেকটি মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার বিষয় বানানো উচিত হবে না। শিশু কতটা অংশগ্রহণ করছে, দলগতভাবে কাজ করছে এবং দক্ষতা অর্জন করছে- এসবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া উচিত। যদি এই বিষয়গুলোও কেবল লিখিত পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একজন শিশু হয়তো খুব ভালো গায়ক, দক্ষ খেলোয়াড় বা সৃজনশীল শিল্পী, তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার অংশগ্রহণ, অগ্রগতি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সহযোগিতামূলক আচরণ এবং আত্মপ্রকাশের দক্ষতার ভিত্তিতে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই যে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে এগোচ্ছে, এই বিষয়গুলোতে সেই পদ্ধতির প্রয়োগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

স্থানীয় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব লোকসংগীত, নৃত্য, নাট্যধারা ও ক্রীড়া ঐতিহ্য রয়েছে। পাঠ্যক্রমে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটলে শিশুরা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হবে। দেশের এক অঞ্চলের শিশু যেমন ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা বা জারিগানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, অন্য অঞ্চলের শিশু জানতে পারে লালনগীতি, পালাগান বা বিভিন্ন লোকঐতিহ্যের কথা। একইভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাও শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হতে পারে। এর ফলে শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক থাকবে না, শিশুকে তার সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করবে। বিশ্বায়নের যুগে নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা

অনেক পরিবার এখনো খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে পড়াশোনার প্রতিবন্ধক মনে করে। এই মানসিকতা পরিবর্তনে বিদ্যালয় ও অভিভাবকদের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিশু গান, ছবি আঁকা বা খেলাধুলায় আগ্রহী হলেও পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় পরিবার তাদের এসব কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা শিশুর মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস, ভাষাগত দক্ষতা এবং সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই অভিভাবকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো জরুরি যে শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শিশুর সামগ্রিক বিকাশের অপরিহার্য অংশ। বিদ্যালয়, পরিবার এবং সমাজ একসঙ্গে কাজ করলেই এই উদ্যোগের প্রকৃত সুফল শিশুদের কাছে পৌঁছাবে।

শেষের কথা

প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়া অন্তর্ভুক্তির সরকারি সিদ্ধান্তকে কেবল নতুন বিষয় সংযোজন হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি এমন একটি উদ্যোগ, যা শিশুদের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত অবকাঠামো এবং কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তখন বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জায়গা হবে না, বরং শিশুদের সুস্থ, সৃজনশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে।

এই উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। কারণ এটা এমন একটি সত্যকে স্বীকার করছে, যা শিক্ষাবিদরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন- সব শিশু একইভাবে শেখে না, একই ধরনের প্রতিভাও নিয়ে জন্মায় না। কেউ বইয়ে অসাধারণ, কেউ মঞ্চে, কেউ রঙ-তুলিতে, কেউ বা খেলাধুলায়।

একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কাজ সেই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া। প্রাথমিক শিক্ষায় শিল্প-সংস্কৃতি ও ক্রীড়াকে গুরুত্ব দেওয়ার এই উদ্যোগ তাই কেবল পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নয়; বরং শিশুকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার একটি নতুন সূচনা।

মন্তব্য করুন

Logo