Logo

৫ আষাঢ় ১৪৩৩

×

Follow Us

দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে তারেক রহমানের প্রতি সিপিজের আহ্বান

মত-দ্বিমত

১০০ দিন পরও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নে উদ্বেগ

দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে তারেক রহমানের প্রতি সিপিজের আহ্বান

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

ক্ষমতার ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচিত নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে চক্র বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা ভাঙতে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেছে সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)।
গত দুই বছরেরও কম সময়ে বাংলাদেশে তিনটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে— ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার, পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে দায়িত্বে থাকা তারেক রহমানের বিএনপি সরকার।
এই তিন সরকারের পালাবদলের প্রতিটি ধাপেই সাংবাদিকরা গ্রেপ্তার, মামলা, নজরদারি, হামলা এবং অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কেবল এই ধারণার ভিত্তিতে যে, তারা আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সম্প্রতি ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে পুলিশি অনুসন্ধান ও প্রোফাইলিং করা হচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, “বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে প্রায়সই নতুন সরকারের জন্য আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। তারেক রহমানের সরকার ভিন্ন কিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু ১০০ দিন পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারের উচিত অবিলম্বে কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ বন্ধ করা, গণপিটুনি ও সহিংসতা থেকে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অপপ্রচার রোধ করা এবং এসব নিপীড়নের সুযোগ তৈরি করে এমন আইন সংস্কার করা। এতে সাংবাদিকদের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত হবে, তারা যেকোনো রাজনৈতিক মতের বলে বিবেচিত হোন না কেন।”
 
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সিপিজে ১০টি পদক্ষেপের সুপারিশ করে। সুপারিশগুলো হলো—
১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল বা সমর্থনমূলক বলে বিবেচিত বহু সাংবাদিক গ্রেপ্তার বা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে শত শত মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করে কিংবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা এজাহারে সাংবাদিকদের জড়ানো হয়েছে। আবার জামিন প্রক্রিয়া জটিল করতে একই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দেওয়া হয়েছে।
একাত্তর টিভির ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজ-এর সম্পাদক শ্যামল দত্তের ঘটনা সবচেয়ে আলোচিত। তারা ২০২৪ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে আটক রয়েছেন। চলতি বছরের ১১ মে উচ্চ আদালত রূপা ও শাকিল আহমেদকে অধিকাংশ মামলায় জামিন দিলেও অন্যান্য মামলার কারণে তারা এখনও মুক্তি পাননি।
২৮ মে, সরকারের ১০০ দিন পূর্তির দিনে, সম্পাদক পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল সরকারের কাছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার মুখোমুখি ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা জমা দেয়। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সিপিজের মতে, কেবল স্বীকৃতি নয়, এখন প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া সব মামলার পর্যালোচনা করতে হবে, সাংবাদিকতার কারণে হওয়া মামলায় জামিনে বাধা না দিতে প্রসিকিউশনকে নির্দেশ দিতে হবে এবং একাধিক মামলা ও গণ-এজাহারের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
২. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বর্তমানে সাংবাদিকদের সম্পাদকীয় কাজের কারণে তদন্তে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্তত ২৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইসিটিতে তদন্ত চলছে। অনেকের বিরুদ্ধে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযানসংক্রান্ত সংবাদ প্রচারের কারণে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে আইসিটিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সিপিজে বলছে, আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে গণমাধ্যমের দায় নির্ধারণের যে নজির রয়েছে, সেগুলো সরাসরি গণহত্যা উসকে দেওয়া প্রচারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, বিতর্কিত ঘটনার সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে নয়। তাই সাংবাদিকতার কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
৩. রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ঘটনার ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে
শেখ হাসিনা সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার— উভয় আমলেই সাংবাদিকরা হত্যা, হামলা, নজরদারি ও নির্বিচার আটক হওয়ার শিকার হয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনার বিচার প্রায়ই রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেছে।
সরকারের উচিত রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৪. সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম প্রায়ই সংগঠিত গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের সহিংসতার মুখে পড়ে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের অস্থিরতার সময় দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাংবাদিকরা জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন এবং পত্রিকা দুটিকে সাময়িকভাবে মুদ্রণ ও অনলাইন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।
একই সময়ে সময় টিভি-র কার্যালয়ে ঢুকে সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতির দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে আরও অনেক সাংবাদিক শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন।
সরকারকে এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. সাইবার প্রোটেকশন আইন ২০২৬ সংস্কার করতে হবে
সাম্প্রতিক সাইবার প্রোটেকশন আইন ২০২৬ আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের বহু বিতর্কিত ধারা বহাল রেখেছে বলে সিপিজের অভিযোগ।
আইনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে এবং সাংবাদিকতার কাজকে স্পষ্টভাবে সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী ও বর্তমান সাইবার আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও অন্যান্য দমনমূলক আইন সংস্কার করতে হবে
সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে টেলিভিশন মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের কারণে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২১ সালে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে গ্রেপ্তার হন।
এসব আইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করে সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণবিষয়ক খসড়া অধ্যাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে
জাতীয় সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ এবং জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া বর্তমান রূপে কার্যকর হলে তা সম্প্রচার ও প্রিন্ট মিডিয়ার ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত মিডিয়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গঠন করা উচিত।
৮. সাংবাদিক দমনে ব্যবহৃত পুরোনো আইন ও নজরদারি কাঠামো সংস্কার করতে হবে
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩, দণ্ডবিধির ফৌজদারি মানহানির বিধান এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ সংশোধন বা বাতিল করতে হবে।
এছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১-এর নজরদারি ও আড়িপাতা সংক্রান্ত বিধানগুলোতেও স্বাধীন বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো সংস্থা আদালতের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
৯. স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন) ব্যবস্থা সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে হবে
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করে। সমালোচনামূলক সম্পাদক ও সাংবাদিকদের শাস্তি দিতেও এই ব্যবস্থার ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন বহু দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা করা হয়, যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য সংবাদমাধ্যমকে আর্থিক ও আইনি চাপে ফেলা। এসব হয়রানিমূলক মামলার বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১০. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে হবে
রাজনৈতিক ব্যক্তি, রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম এবং অনলাইন ট্রল বাহিনী প্রায়ই সাংবাদিকদের “ভারতপন্থী”, “ইসলামবিরোধী”, “দেশদ্রোহী” বা “পূর্ববর্তী সরকারের এজেন্ট” বলে আখ্যায়িত করে।
এ ধরনের অপপ্রচার শুধু সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ন করে না, তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। অনেক সাংবাদিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, আবার অনেকে হুমকির শিকার হয়েছেন।
সিপিজে বলছে, সরকারের উচিত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা যে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত একটি মৌলিক অধিকার। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা, অপপ্রচার ও সহিংসতা উসকে দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সিপিজের মতে, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং সমান আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হলে তবেই বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Logo