চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৩২ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন নিয়ে লিখতে বসলে শুধু রাজনীতির গল্প লিখে শেষ করা যায় না। তাদের জীবনের ভেতরে একটা সময় লুকিয়ে থাকে, একটা প্রজন্মের স্বপ্ন-হতাশা লুকিয়ে থাকে, কখনো কখনো একটা রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের ছায়াও দেখা যায়। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
তাঁর জীবনকে এক শব্দে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেখানে সংগ্রাম আছে, সাফল্য আছে, ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রে উঠে যাওয়ার ইতিহাস আছে। আবার এমন সময়ও এসেছে, যখন সেই কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে সরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আছে আনুগত্যের গল্প, আছে বিতর্ক, আছে এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর নিয়ে আজও সবাই একমত নয়। আর শেষ অধ্যায়ে আছে এক ধরনের নিঃশব্দ বিদায়, যা তাঁর দীর্ঘ ও আলোচিত রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে।
তোফায়েল আহমেদের নাম শুনলে আমার আগে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা দলের প্রবীণ নেতা—এসব পরিচয় মনে পড়ে না। মনে পড়ে ১৯৬৯ সালের সেই দিনটির কথা। রেসকোর্স ময়দানে তখন মানুষ আর মানুষ। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে উঠেছে চারদিকে। আগরতলা মামলার আসামি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে ফিরেছেন। উত্তেজনা, আবেগ আর প্রত্যাশায় ভরা সেই জনসমুদ্রে এক তরুণ ছাত্রনেতা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবকে একটি নতুন নামে ডাকলেন—“বঙ্গবন্ধু”।
আজ শব্দটি এত পরিচিত যে তার জন্মমুহূর্ত নিয়ে খুব বেশি ভাবা হয় না। অথচ একটু থেমে ভাবলে বিস্ময় জাগে। একজন তরুণ ছাত্রনেতার মুখ থেকে বের হওয়া একটি শব্দ পরে একটি জাতির রাজনৈতিক অভিধানের স্থায়ী অংশ হয়ে গেল। কোটি কোটি মানুষ সেই নাম উচ্চারণ করেছে, কিন্তু প্রথমবার উচ্চারণ করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
শুধু এই একটি ঘটনার জন্যও ইতিহাসে তাঁর নাম থেকে যেত। কিন্তু তাঁর জীবনকে কেবল ওই একটি মুহূর্তে আটকে রাখা অন্যায় হবে।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তখন বাংলাদেশ নামে কোনো রাষ্ট্র নেই। ছিল পূর্ব পাকিস্তান, আর ছিল ক্রমশ জমতে থাকা বাঙালির বঞ্চনার ইতিহাস। সেখান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা, ছাত্ররাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা—সবকিছুই সহজ ছিল না। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি শুধু ভিড়ের একজন নন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ডাকসুর ভিপি ছিলেন। আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব হয়তো পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন। কিন্তু সে সময় ডাকসু ছিল জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রস্তুতিমঞ্চ। দেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনেক সূত্রই বেরিয়ে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে।
আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, আগরতলা মামলা, ছাত্রসমাজের সংগঠিত প্রতিরোধ—সবকিছুর ভেতরেই ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি দর্শক ছিলেন না; ঘটনাগুলোর ভেতরে ছিলেন। মিছিলে ছিলেন, আন্দোলনে ছিলেন, নেতৃত্বের সারিতেও ছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়া সেই সময়ে অসাধারণ অর্জন ছিল। অধিকাংশ তরুণ যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তখন তোফায়েল আহমেদ জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি রাজনৈতিক সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে নিজের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব দেন, প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়। এটি নিছক একটি প্রশাসনিক নিয়োগ ছিল না। এর মধ্যে ছিল গভীর আস্থা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনার স্বীকৃতি।
অনেকেই তখন তাঁকে বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তরুণ সহচরদের একজন হিসেবে দেখতেন। মুজিব-তোফায়েল সম্পর্কের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল না, এক ধরনের ব্যক্তিগত স্নেহের সম্পর্কও ছিল বলে সমসাময়িকরা মনে করেন।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস খুব কম ক্ষেত্রেই সরলরৈখিক।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই ইতিহাস হঠাৎ অন্যদিকে মোড় নিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হলেন। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে গেল। তাঁর বহু ঘনিষ্ঠ সহচরের মতো তোফায়েল আহমেদও রাজনৈতিক আঘাতের মুখে পড়লেন। তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। বিভিন্ন সময়ে মোট ৩৩ মাসের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন।
তবু তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা উঠলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।
বঙ্গবন্ধুর এত ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ কেন হত্যাকাণ্ডের পর আরও দৃশ্যমান প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠলেন না?
প্রশ্নটি নতুন নয়। বহু বছর ধরেই এটি আলোচনায় আছে। তোফায়েল আহমেদ নিজেও এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন, ঘটনাটি তাঁকে এতটাই স্তব্ধ করে দিয়েছিল যে কী করা উচিত, সেটাই বুঝে উঠতে পারেননি। এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। ইতিহাসের বিপর্যয়কর মুহূর্তে সবাই নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না। কেউ কেউ ভেঙেও পড়েন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে ইতিহাস কিছু প্রশ্নকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখে। উত্তর দেওয়া হয়, তবু বিতর্ক শেষ হয় না। তোফায়েল আহমেদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছে।
পরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আরেকটি জটিল অধ্যায় আসে শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ককে ঘিরে। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থার। কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক সব সময় সেই একই ছন্দে এগোয়নি। ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী অংশের সঙ্গে যুক্ত হন বলে অভিযোগ ওঠে। তখন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের নানা আলোচনা চলছিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটি ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়। পরে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে। শেখ হাসিনা আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান নেন। কিন্তু তোফায়েল আহমেদের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি আগের মতো হয়নি। যে মানুষ একসময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন, তাঁকে দীর্ঘ সময় মন্ত্রিসভার বাইরে থাকতে হয়।
এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এর রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল। তবু একটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। তিনি দল ছাড়েননি। নতুন কোনো রাজনৈতিক আশ্রয় খোঁজেননি।
অভিমান ছিল কি না, তা হয়তো তিনিই ভালো জানতেন। সম্ভবত ছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে বিদ্রোহ বা দলত্যাগের পথে তাঁকে দেখা যায়নি। আজকের রাজনীতিতে, যেখানে সামান্য মতভেদেই মানুষ নতুন পতাকা খুঁজে নেয়, সেখানে এই অবস্থানটিও তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পরে অবশ্য তিনি আবার মন্ত্রিসভায় ফিরে আসেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের গল্প খুব কম ক্ষেত্রেই প্রথম উত্থানের মতো হয়। তিনি সম্মানিত ছিলেন, প্রভাবশালীও ছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র তখন আর তাঁর চারপাশে ঘুরছিল না।
এরপর আসে জীবনের শেষ অধ্যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও ভোলা-১ আসন থেকে জয়ী হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থির সময়ে তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। ভাঙচুর হয়। আগুনও লাগানো হয়। যে এলাকার মানুষ তাঁকে বারবার সংসদে পাঠিয়েছে, সেই এলাকাতেই তাঁর বাড়ি আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্য নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।
কিন্তু তখন আর তিনি সক্রিয় রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। আসলে তাঁর সবচেয়ে কঠিন লড়াই তখন রাজনীতির সঙ্গে নয়, নিজের শরীরের সঙ্গে।
স্ট্রোকের পর শরীরের একাংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়েছিল। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলেন অনেকটাই। পুরোনো কেউ দেখতে এলে তিনি অনেক সময় শুধু তাকিয়ে থাকতেন।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল আরেকটি বিষয়।
যে মানুষ অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জন্য পরিচিত ছিলেন, যিনি অসংখ্য মানুষের নাম, ঘটনা আর রাজনৈতিক খুঁটিনাটি মনে রাখতে পারতেন, সেই মানুষটিই ধীরে ধীরে স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করছিলেন। আদালতে তাঁর আইনজীবী পর্যন্ত জানিয়েছিলেন, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় তিনি মামলার কার্যক্রম বোঝার অবস্থায় নেই।
জীবনের এই পরিহাস এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
একসময় যিনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর প্রত্যক্ষ অংশ ছিলেন, শেষ দিকে সেই স্মৃতিগুলোই যেন তাঁর নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছিল।
১ জুন ২০২৬, বিকেল সাড়ে তিনটায় স্কয়ার হাসপাতালে তাঁর জীবনের সমাপ্তি ঘটে। বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
তোফায়েল আহমেদ নিখুঁত ছিলেন না। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক ছিল, ভুল ছিল, মতভেদ ছিল। তাঁকে নিয়ে সমালোচনাও আছে, প্রশ্নও আছে। ১/১১-এর সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে, হওয়াও উচিত। কিন্তু সবকিছুর পরও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন কিছু মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, যেগুলোকে আলাদা করে দেখা যায় না।
আর তাই মনে হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো তাঁর সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মনে রাখবে না। সব বিতর্কও মনে রাখবে না। কিন্তু একটি দৃশ্য বোধহয় থেকে যাবে।
রেসকোর্সের বিশাল মাঠ। উত্তাল জনসমুদ্র। এক তরুণ ছাত্রনেতার কণ্ঠ। আর সেই এক শব্দ—“বঙ্গবন্ধু”।
অনেক মানুষ পদ দিয়ে স্মরণীয় হন। কেউ হন ক্ষমতা দিয়ে। তোফায়েল আহমেদকে হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হবে একটি উচ্চারণের জন্য। কারণ ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে, যখন একটি শব্দ শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি জাতির আবেগকেও সংজ্ঞায়িত করে।
সেই মুহূর্তটি ছিল তাঁর। আর সেটিই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিচয়।
চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

