সাঁতার জানা শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে যায়, ছবি: সংগৃহীত
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০৫ এএম
গত ২৮ মে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার এক গ্রামে চার বছরের মাহিম ফারাবী বাড়ির উঠানে খেলছিল। পরিবারের সদস্যরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণ খেয়াল করে আর শিশুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শুরু হয় উৎকণ্ঠিত খোঁজাখুঁজি। একপর্যায়ে বাড়ির পাশের পুকুর থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কয়েক মিনিটের অসতর্কতা একটি পরিবারের জীবন থেকে চিরতরে কেড়ে নেয় একজন শিশুকে।
মাহিমের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এর আগে ২৬ মে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার এক পুকুরে ডুবে দুইজন শিশুর মৃত্যু হয়। একই মাসে জামালপুরে পৃথক ঘটনায় প্রাণ হারায় আরও দুইজন শিশু- একজন বৃষ্টির পানিতে ভরা গর্তে পড়ে, অন্যজন বাড়ির পাশের বিলে ডুবে।
কক্সবাজারের চকরিয়ায় চার বছরের সাদিক, মীরসরাইয়ে আট বছরের মুনতাসিন, কিশোরগঞ্জে তিন বছরের চাঁদ এবং মাগুরায় সাত বছরের রমিম মৃধাও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পানিতে ডুবে মারা গেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে পরিবারের চোখ এড়িয়ে বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা, বিল কিংবা জমে থাকা পানিতে পড়ে।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। চারপাশে জলাবদ্ধতা, উপচে পড়া পুকুর, খাল-বিল এবং বৃষ্টির পানিতে তৈরি অস্থায়ী জলাশয় শিশুদের জন্য অদৃশ্য ফাঁদে পরিণত হয়। ফলে প্রতিবছর বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে শিশু ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের সার্বক্ষণিক তদারকি, বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই মৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা মাহিম, সাদিক, মুনতাসিন বা চাঁদের মতো একজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া জীবন এবং একটি পরিবারের আজীবনের শোকের কাহিনি।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী, খাল, বিল, পুকুর, ডোবা যেমন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে আছে, তেমনি তা আমাদের জীবিকারও বড় উৎস। কিন্তু এই পানিসম্পদই ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের দেশের শিশুদের জীবনের জন্য হয়ে উঠেছে ভয়ংকর মৃত্যুর হাতছানি। প্রতিবছর পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুকে এখন স্বাভাবিকভাবে কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বছরের কোনো সময়, দিনের কখন, কোথায়, কোন বয়সের শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, সেই তথ্য যখন আমাদের কাছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আছে তখন প্রতিবছর আমাদের দেশে পানিতে ডুবে শিশুর এই মৃত্যুকে সহজেই ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’ বলা যেতে পারে। যেখানে সরকার, রাষ্ট্র এবং সমাজের উদাসীনতায় শিশুর জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এসব ঘটনা আদতে একবৃহত্তর ও নীরব জাতীয় সংকটের অংশ।
ইউনিসেফ এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রায় ১৪,০০০ শিশুর মৃত্যু হয়। গড়ে প্রতিদিন বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মারা যায় ৪০ জন শিশু। বর্ষা মৌসুমে এই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে। ১ থেকে ১৭ বছর বয়সের শিশুর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায় যাদের বয়স ১ থেকে ৬ বছর। এই বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী এবং সবচেয়ে কম ঝুঁকিসচেতন হওয়ায় তারা দুর্ঘটনার প্রধান শিকার হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে দেখা গেছে, গতবছর পানিতে ডুবে যত শিশু মারা গেছে তাদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ শিশু মারা গেছে পুকুরের পানিতে। ২৭ শতাংশ শিশু মারা গেছে ডোবা, খাল বা গর্তে জমে থাকে পানিতে ডুবে। নদীতে ডুবে মারা গেছে ২২ শতাংশ শিশু, বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে ৭ শতাংশ শিশু, ২ শতাংশ শিশু মারা গেছে বাড়িতে বালতি বা ড্রামে জমিয়ে রাখা পানিতে ডুবে আর বাকি শিশুরা মারা গেছে সমুদ্র, পাহাড়ি ছড়া কিংবা বিলের পানিতে ডুবে। মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে, বাড়ির আশপাশের পানির উৎসে পুকুর, খাল, ডোবা বা গোসলের জন্য বালতি-ড্রামে জমিয়ে রাখা পানিতে। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৪ বছরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শহরের তুলনায় গ্রামে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার ৩ গুণ বেশি। প্রায় সব শিশুই বাড়ি থেকে ১০-২০ মিটার দূরের কোনো পুকুরে পড়ে মারা যায়। শিশুদের এই মৃত্যুকে আমরা দুর্ঘটনা বললেও, আদতে তাকে দুর্ঘটনা বলা যায় না। যেখানে খোলা পুকুরের পাড় দিয়ে কোনো ঘেরা নেই, বর্ষাকালে ডোবাগুলো বৃষ্টির পানিতে ভরে ওঠে, শিশুরা বাড়ির উঠানে একা খেলা করে তখন ঘটে এই মৃত্যু। এই মৃত্যুর পেছনে যেমন একদিকে অভিভাবকদের শিশুর প্রতি খেয়াল না রাখার মতো ব্যাপার আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রের পরিকল্পনার ঘাটতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে যে স্বল্পমূল্যের উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়, তাও বাস্তবায়ন হয় না কিংবা হয় কাগজে-কলমে। ইউনিসেফের সমীক্ষা বলছে, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ৮৮ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য, যদি তাদের সাঁতার শেখানো হয়। বাংলাদেশে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ ২০০৫ সাল থেকে শিশুদের সাঁতার শেখাচ্ছে। তারা পুকুরেই ছোট শিশুদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে ৩০ হাজারের বেশি শিশু সাঁতার শিখেছে। প্রশ্ন থেকে যায় ৩০ হাজার শিশু সাঁতার শিখলেও বাকি লাখ লাখ শিশু কি কোনো দিন সাঁতার শেখার সুযোগ পাবে?
শিশুমৃত্যু রোধ করতে কতগুলো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে
কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র : কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র বাস্তবায়ন করা গেলে, সকালবেলা মা-বাবা যখন কাজে ব্যস্ত থাকেন তখন সেখানে শিশুদের নিরাপদে রাখা যায়। এখানে পালাক্রমে একেকদিন একেক মা বা বাবা দিবাযত্ন কেন্দ্রের দায়িত্ব নেবেন। স্থানীয় কিশোর-কিশোরী বা তরুণ বয়সের ছেলেমেয়েরাও এই দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যারা কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুদের দায়িত্বে থাকবেন তাদের অবশ্যই শিশুদের প্রতি সংবেদনশীল ও সমানুভূতিশীল হতে হবে। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের কার্যক্রম চালু থাকতে পারে। স্থানীয়ভাবে দিবাযতœ কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ
সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়ে শিশুদের প্রাণরক্ষা করা সম্ভব। এক রিপোর্টে দেখা গেছে, সাঁতারে প্রশিক্ষিত শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে যায়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
পুকুর, ডোবা বা ঝরনার উৎসে বাঁশ বা টিনের ঘেরা দেওয়া। সেখানে সতর্কতা বোর্ড রাখা, স্থানীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা এসব সহজ কাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সচেতনতামূলক প্রচারণা ও বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো দরকার। এর মাধ্যমে প্রত্যেক পরিবারে শিশু সুরক্ষা পরিকল্পনা করতে হবে। এ ছাড়া সমাজে মা-বাবা, অভিভাবকদের অংশগ্রহণে শিশু সুরক্ষার স্থানীয় কমিটি তৈরি করতে হবে। এই কমিটি পরিচালিত হবে কমিউনিটির নিজস্ব অর্থায়নে। প্রত্যেক শিশুর মৃত্যুর কারণ তদন্ত ও ময়নাতদন্ত করা : প্রতি বছর যখন এত সংখ্যক শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে সেখানে নিশ্চয় রাষ্ট্রের পক্ষে সরকারের দায় আছে এবং জবাবদিহি থাকবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পানিতে ডুবে মারা যাওয়া কোনো শিশুর মৃত্যুর তদন্ত হয়েছে বলে জানা যায়নি। এমনকি মৃত্যুর পর লাশের ময়নাতদন্তও হয়নি। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী হয়নি। তার মানে হচ্ছে, আমরা ধরেই নিয়েছি নদীমাতৃক আমাদের দেশ, পানিতে আমাদের জীবিকা তাই প্রতি বছর পানিতে ডুবে শিশু মারা যাবে এটা স্বাভাবিক ঘটনা বা দুর্ঘটনা। এই প্রবণতা আমাদের আছে। পানিতে ডুবে বেশিরভাগ শিশুর মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু এর পেছনে যে উদাসীনতা বা অবহেলা থাকে, যা স্পষ্ট অপরাধ তা বিবেচনা করা হয় না।
অনেক সময় সন্তান হারিয়ে পরিবারের মানুষজন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারা সামাজিক লজ্জা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চান। কিন্তু সচেতনভাবে ভাবলে আমরা বুঝি, প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর তদন্ত হওয়া উচিত। পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো নিয়তির ফল নয় এটি অবহেলা, উদাসীনতা এবং শিশুদের জন্য আমাদের উদ্যোগের অভাবের ফল। প্রত্যেক শিশুর জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু রোধ করা শুধু মানবিক বাধ্যবাধকতা নয়, এটা শিশুর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার ব্যাপার, এটা আমাদের সম্মান, আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, বাড়ির পাশের পুকুর-ডোবার চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শিশু সুরক্ষার দায়িত্বগ্রহণ ও শিশুর সাঁতার প্রশিক্ষণকে যদি আমরা আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে নিতে পারি তাহলে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে। একজন শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবন হারিয়ে যাওয়া নয়, একটি পরিবার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া, জাতির ভবিষ্যৎ নিভে যাওয়া। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু যদি আমরা আজই বন্ধ করতে না পারি, তাহলে আগামীকাল সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
লেখক: চাইল্ড কেয়ার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ
মন্তব্য করুন

