প্রীতিলতা রূপকথা
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
বাংলাদেশের গণসঙ্গীত আন্দোলনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগঠক ও শিক্ষক কামরুদ্দীন আবসার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ৩০ মে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর তাঁর এই প্রস্থান শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, বরং এ দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান।
১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করা কামরুদ্দীন আবসারের শৈশব ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকার গোপীবাগে। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হন। পরিবারের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাঁর মা ফাতিমা বেগম অসীম সংগ্রামের মাধ্যমে সন্তানদের মানুষ করে তুলেছিলেন। সেই সংগ্রামী পরিবেশই সম্ভবত আবসারের মননে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বীজ বপন করেছিল।
সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে প্রাথমিক সঙ্গীতশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীতসহ বিভিন্ন ধারার সঙ্গীতে তালিম নেন। বি-মিউজিক ডিগ্রি অর্জন করেন মিউজিক কলেজ থেকে। কিন্তু তিনি কখনো সঙ্গীতকে ব্যক্তিগত খ্যাতি বা প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং গানকে বেছে নিয়েছিলেন মানুষের মুক্তির সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে।
তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় যখন তিনি এক রাজনৈতিক সমাবেশে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদকে গণসঙ্গীত পরিবেশন করতে দেখেন। সেই মুগ্ধতা তাঁকে গণসঙ্গীতের পথে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদের কাছেই তিনি গণসঙ্গীতের তালিম নেন। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখক শিবির, কৃষক ফেডারেশন, গণসাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সৃজনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
কামরুদ্দীন আবসার গণসঙ্গীতকে দেখতেন শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামের শিল্পরূপ হিসেবে। তাঁর কাছে গণসঙ্গীত কেবল গান নয়, ছিল সমাজ পরিবর্তনের একটি রাজনৈতিক অস্ত্র। তিনি বলতেন, গণসঙ্গীতকে অবশ্যই শোষিত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন ধারণ করতে হবে।
এই বিশ্বাসের জন্য তাঁকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে দুভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে গাওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক প্যারোডি গানের কারণে তিনি গ্রেপ্তার হন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও তাঁর প্রতিবাদী গান তাঁকে কারাবরণ ও নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়। কিন্তু কোনো দমন-পীড়নই তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
গত শতকের সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রায় প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর কণ্ঠ ছিল সংগ্রামী মানুষের সাহসের উৎস। ফুলবাড়ী কয়লাখনি রক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের আন্দোলন—সবখানেই তিনি ছিলেন সুরের যোদ্ধা। মহসিন শস্ত্রপাণির লেখা “বলো জয় জাগ্রত বীর জনগণ, হঠাও সাম্রাজ্যবাদ...” গানে তাঁর সুর আন্দোলনের মাঠে নতুন শক্তি সঞ্চার করেছিল।
তাঁর নিজের প্রিয় গানগুলোর মধ্যেও ছিল সংগ্রাম, প্রত্যয় ও মুক্তির আহ্বান। “কারা বলছো সামনের পথ অন্ধকার?” কিংবা “আমি কোনো ভালোবাসার গল্প বলিনি, যেটুকু বলেছি সবটুকু যুদ্ধের”—এসব গান যেন তাঁর জীবনদর্শনেরই প্রতিচ্ছবি।
শুধু গণসঙ্গীত নয়, শিশুদের অসংখ্য ছড়ায় সুর দিয়েছেন তিনি। অসংখ্য তরুণ শিল্পীর শিক্ষক ছিলেন। গণসঙ্গীত দল ‘সৃজন’-এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চা পৌঁছে দিয়েছেন। পাশাপাশি ‘দীপ্র’ প্রকাশনার মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রগতিশীল বই প্রকাশের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
কামরুদ্দীন আবসারের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত তাঁর মানবিকতা। তিনি ছিলেন মানুষের মতো মানুষ। জীবনে ধন-সম্পদ, খ্যাতি কিংবা আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি নিজেকে কখনো শিল্পী হিসেবে বড় করে দেখেননি। বরং বলতেন, “আমি রাজনৈতিক কর্মী, গণমানুষের মুক্তির সৈনিক, গান আমার একটা হাতিয়ার মাত্র।”
তাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছে সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য তিনি গান গেয়েছেন—রিকশাচালক, শ্রমিক, কৃষক, বঞ্চিত ও সংগ্রামী মানুষ। তাঁদের দুঃখ, স্বপ্ন ও প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর কণ্ঠ।
২০১১ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন তিনি। শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলেও তাঁর মনোবল ভেঙে পড়েনি। সুযোগ পেলেই তিনি প্রতিবাদী কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উপস্থিত হতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের মুক্তির স্বপ্নকেই ধারণ করে গেছেন।
কামরুদ্দীন আবসারের মৃত্যুতে আমরা হারালাম একজন শিল্পীকে, একজন সংগঠককে, একজন শিক্ষককে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান, তাঁর আদর্শ, তাঁর সংগ্রামী জীবন এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
যতদিন এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ লড়বে, যতদিন মুক্তির স্বপ্নে নতুন প্রজন্ম কণ্ঠ মিলাবে, ততদিন কামরুদ্দীন আবসারের গান বেজে উঠবে—প্রতিবাদের মিছিলে, সংগ্রামের পথে, মানুষের মুক্তির অভিযাত্রায়।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি গণমানুষের এই অকৃত্রিম শিল্পীকে।
মন্তব্য করুন

