২০১৬ সালে গোবিন্দগঞ্জে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হামলায় তিন সাঁওতাল নিহত হয়, আগুন দেয়া হয় তাদের স্থাপনায়
রাজীব নূর
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১০:১০ এএম
দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলায় ঘুঘুডাঙ্গা বলে কড়াদের একটা গ্রাম আছে। গ্রাম না বলাটাই ভালো। কারণ মাত্র চারটি পরিবার আর সমাধিক্ষেত্রের পাঁচ শতক জমি নিয়ে গ্রাম হয় না। এটি এখন অস্তিত্ব হারানো এক জনপদের কঙ্কাল। ওই চার পরিবারের ১২ জন সদস্য অবশ্য কবরের জমিতে না, এখনও এর অতিরিক্ত যে চার-পাঁচ শতক জমি তাদের দখলে আছে, সেখানে বাস করছে। তারাও খুব বেশি দিন আর থাকতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো খুব শিগগিরই তাদেরকেও বাস্তুচ্যুত হতে হবে।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫০ প্রকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। যদিও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০ তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়ে স্বীকৃতি দিতে নারাজ, তবে এই তাত্ত্বিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি চরম সত্য হলো—সরকারের তালিকাভুক্ত ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কড়ারা সংখ্যায় সবচেয়ে কম এবং সবচেয়ে বিপন্ন। ঘুঘুডাঙ্গার ১২ জন ছাড়াও দিনাজপুরেরই বিরল উপজেলার ঝিনাইকুড়ি বলে অন্য একটি গ্রামে রয়েছে ৯১ জন কড়ার বাস।
মূলত ঝিনাইকুড়িতে জমি দখলের একটি সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই এই প্রান্তিক মানুষগুলোর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ঘুঘুডাঙ্গায় সশরীরে না গেলেও সেখানকার কড়াদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আমার কানে নিয়মিতই পৌঁছায়। ১৫ এপ্রিল (২০২৬) দিনাজপুরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভাবনার প্রধান নির্বাহী মুস্তাফিজুর রহমান রূপম ফোন করে বললেন, ‘ঘুঘুডাঙ্গার কড়ারা আবারও উচ্ছেদের হুমকি পেয়েছে।’
উচ্ছেদের এমন হুমকি নতুন কিছু নয়। দিনাজপুর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের কড়াপাড়ার জমিটা এক চৌধুরী পরিবার নিজেদের বলে দাবি করছে।
মুস্তাফিজুর রহমান রূপম বলছিলেন, এক দশক আগেও ঘুঘুডাঙ্গায় ২০-২২টি কড়া পরিবার বসবাস করত এবং তারও আগে এই গ্রামেই ৫০-৬০টি কড়া পরিবারের আড়াইশোর বেশি মানুষের বসবাস ছিল। কালক্রমে জমিজমা হারিয়ে অধিকাংশ কড়া-পরিবার দেশান্তরী হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন মানুষের কলকাকলিতে মুখর এই জনপদটি জনশূন্য হয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ হলো জমি হারানো।
ঘটনাচক্রে জমিজমার কাগজপত্র বেশ ভালোই বোঝেন মুস্তাফিজুর রহমান রূপম। তিনি বলছিলেন, “আমি সিএস (ব্রিটিশ) রেকর্ডের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখেছি ঘুঘুডাঙ্গায় কড়াদের ৬০ বিঘারও বেশি জমি ছিল। বাংলাদেশ রেকর্ডে পাঁচ শতাংশ আয়তনের কড়া-সমাধিস্থানটি ছাড়া আর কোনো জমিই কড়াদের নামে রেকর্ড হয়নি।”
কড়াদের চারটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে মুস্তাফিজুর রহমান রূপম নিজেই গিয়েছিলেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে।
জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলামের ভাষ্যমতে, আদিবাসীদের নাকি সামান্য ‘লালপানি’ বা মদ খাইয়ে অনায়াসেই জমির দলিল লিখিয়ে নেওয়া যায়। রূপমের কাছে তার তাচ্ছিল্যভরা প্রশ্ন ছিল—এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ কি তার হাতে নেই? রূপম যখন তাকে প্রশাসনের বিশেষ অনুমতি ছাড়া আদিবাসীদের জমি কেনা যে দণ্ডনীয় অপরাধ তা মনে করিয়ে দিলেন, তখন জেলা প্রশাসক বিদ্রূপের হাসি হেসে উল্টো তাকে আইন না শেখানোর উপদেশ দিলেন। রফিকুল ইসলামের এই ‘ওরা’ সম্বোধন কেবল কড়াদের জন্য নয়; বরং সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজোয়াড়, তুরি, কর্মকার থেকে শুরু করে মালপাহাড়িয়া ও রাজবংশীসহ সকল ভূমিপুত্রদের প্রতি এক গভীর অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। এই মনোভাবই আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র উন্মোচন করে দেয়।
রফিকুল ইসলামের পরিবর্তে যদি এখন দিনাজপুরে শফিকুল ইসলাম জেলা প্রশাসক থাকতেন, তার চেয়ে ভালো কিছু বলতেন বলে আশা করা যায় না। তাই সিধু-কানুর রক্তে ভেজা ভূমির লড়াইকে ‘লালপানি’র গল্পে টালমাটাল হতে দেখেন তারা।
মুস্তাফিজুর রহমান রূপম বরং জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলামকে যথেষ্ট সংবেদনশীল মানুষ বলেই মূল্যায়ন দিলেন। কারণ তিনি কড়াদের অবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার জন্য ভূমি অফিসের একজন কর্মীকে ঘুঘুডাঙ্গায় পাঠিয়েছেন। কিন্তু এভাবে কত দিন?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৫৫ সালে ভূমির অধিকার আদায়ের জন্য সিধু-কানুসহ চার ভাই সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন। সেই বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের ১৭১ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ ২০২৬ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীদের জমির জন্য রক্ত দিতে হচ্ছে। দিনাজপুরেরই কৃষক টুডু সরেন তার বাবা ও ভাইকে হারাবার পর নিজেও ২০১৪ সালে ভূমি রক্ষা করতে গিয়ে খুন হয়েছেন। জাল দলিলের মাধ্যমে তার ৩৩ একর জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে নিজ ভিটা রক্ষায় পিরেন স্নাল জীবন দিয়েছেন এবং ২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাগদাফার্মে পুলিশের গুলিতে তিন সাঁওতাল প্রাণ হারিয়েছেন। সমতলের আদিবাসীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের শত বছরের ভিটা থেকে মামলা, হামলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে উচ্ছেদ হচ্ছেন। জমি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের জনসংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদিবাসীদের বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।
এই অঞ্চলের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে আদিবাসীদের ভূমিকা অনন্য
বাংলাদেশে আদিবাসীদের সঠিক সংখার পরিসংখ্যান নিয়ে আছে বিভ্রান্তি। ২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৬ লাখ হলেও আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী এটি ৩০ লাখের বেশি। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় প্রায় ৩৮টি ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তার বসবাস। এই মানুষগুলো মূলত কৃষিজীবী হলেও আজ তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা বলছে, সমতলের সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ এবং গারো বা রাখাইনদের ৬৬ শতাংশের বেশি লোক এখন পুরোপুরি ভূমিহীন। গত কয়েক দশকে সমতলের ১০টি আদিবাসী গোষ্ঠী প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বিঘা জমি হারিয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
দেশভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় পর্যন্ত প্রভাবশালী মহলের চক্রান্ত, জালিয়াতি এবং প্রশাসনের বৃহদাংশের দুর্নীতির কারণে আদিবাসীরা ক্রমাগত বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ আদিবাসীদের অক্ষরজ্ঞানহীনতার সুযোগ নিয়ে দলিলে জালিয়াতি করে তাদের বিশাল পরিমাণ জমি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রকৃতি ও বন রক্ষার নামেও আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া চলছে। ২০১৬ সালে মধুপুর বনের নয় হাজার একরের বেশি জমি সংরক্ষিত বন ঘোষণা করার ফলে বহু গারো ও কোচ পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। উপকূলীয় পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলেও রাখাইনদের জমি ভুয়া দলিল ও মামলার মাধ্যমে দখল করে নেওয়া হচ্ছে।
মিথ্যা মামলা এবং নারীদের ওপর সহিংসতার মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যার বিচার পাওয়া দুষ্কর। ২০০০ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর দুই যুগেরও বেশি সময় পার হলেও আজও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। এই দীর্ঘ বিচারহীনতা ভূমিদস্যুদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে রাখাইনদের সংখ্যা ও গ্রামের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমেছে। ১৯৫টি রাখাইন গ্রামে এখন আর কোনো রাখাইন পরিবারের অস্তিত্ব নেই। সাঁওতালদের মতো ভূমিপুত্ররা যারা এ দেশের আদি বাসিন্দা এবং মুক্তিযুদ্ধেও লড়াই করেছেন, তারা আজ নিজ ভূমে পরবাসী। পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে আদিবাসীদের ধর্ম ও সংস্কৃতি জড়িয়ে থাকে, তাই জমি হারানো মানে তাদের অস্তিত্বের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার রক্ষায় বিশেষ আইন থাকলেও আমাদের দেশে তার প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। তাই সমতলের আদিবাসীদের ভূমি রক্ষার জন্য অবিলম্বে যুগোপযোগী আইন ও পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
রাজীব নূর: সাংবাদিক, লেখক
মন্তব্য করুন

