শিশুদের স্কুলমুখী করা, ঝরে পড়া কমানো এবং পুষ্টির চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে মিড ডে মিল চালু হলেও নিম্মমানের খাবার দেয়ার অভিযোগ আসছে। ছবি: সংগৃহীত
দীপু মাহমুদ
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৯:০৪ এএম
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছোট্ট একটি স্কুল- ওটারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুর, জেলে কিংবা ক্ষুদ্র কৃষক। এই স্কুলের অনেক শিশু সকালে না খেয়ে ক্লাসে আসে। তাই যখন স্কুলে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম অর্থাৎ মিড-ডে মিল চালু হলো, তখন শিশুদের চোখে নতুন আনন্দ নেমে এসেছিল। শিশুরা ভেবেছিল সারাদিনে দুপুরে অন্তত ভালো খাবার খেতে পারবে। সেই আশায় তারা প্রতিদিন স্কুলে আসত।
কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের ৮ তারিখ সকাল শিশুদের জন্য সেই আনন্দকে আতঙ্কে বদলে দিয়েছে।
সেদিন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আইরিন আক্তার খুব খুশি ছিল। কারণ সেদিন সে স্কুলে এসে দেখেছিল মিড-ডে মিলে তাদের ডিম দেওয়া হবে। দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটি হয়তো সপ্তাহে একদিনও ডিম খেতে পারে না। স্কুলের খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে সে আর তার সহপাঠীরা অতি আনন্দে আগ্রহ নিয়ে গাছতলায় বসে খেতে শুরু করে। কিন্তু ডিম ভাঙতেই বেরিয়ে আসে দুর্গন্ধ। কেউ নাক চেপে ধরে, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়। কয়েকজন শিশু ভয় পেয়ে খাবার ফেলে দেয়। ছোট ছোট মুখগুলোতে তখন হতাশা আর ঘৃণার মিশ্র ছাপ দেখা দেয়। একজন শিশু কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে শিক্ষককে বলল, ‘স্যার, ডিম তো পচা। গন্ধ বের হয়। খাওয়া যায় না।’
বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের স্কুলমুখী করা, ঝরে পড়া কমানো এবং অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যে কয়েকটি বড় সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম বা ‘মিড-ডে মিল’ অন্যতম। রাষ্ট্রের কল্পনায় এটা ছিল এক মানবিক ও দূরদর্শী কর্মসূচি- দুপুরে পুষ্টিকর খাবার পেলে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা নিয়মিত স্কুলে আসবে, পড়াশোনায় মনোযোগী হবে, অপুষ্টি কমবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে আরও সুস্থ ও সক্ষম। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম চিত্র আজ সেই স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিয়ত উঠে আসছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। কোথাও শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পচা ডিম, কোথাও দুর্গন্ধযুক্ত কলা, কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট বা নিম্নমানের পাউরুটি। এমনকি কিছু এলাকায় খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। যেই প্রকল্প শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার কথা, সেটাই যদি তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটাকে আর কেবল অব্যবস্থাপনা বলা যায় না, এটা এক ধরনের নৈতিক অপরাধ।
স্কুল মিলে পচা ডিম, অপরিপক্ক কলা, এবং নষ্ট রুটি দেয়ার অভিযোগ উঠছে ছবি: সংগৃহীত
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরও অনেক ক্ষেত্রে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি দেখা যায়। তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে অসাধু সরবরাহকারী ও দায়িত্বে অবহেলাকারীরা বারবার একই কাজ করার সুযোগ পেয়ে যায়। অনেক স্কুলে খাবার সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই, নেই মান যাচাইয়ের কার্যকর প্রক্রিয়াও। কোথাও খাবার পৌঁছায় দেরিতে, কোথাও আবার শিশুদের সংখ্যার তুলনায় সরবরাহ কম হয়। এর ফলে একদিকে যেমন অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিশুরা হারাচ্ছে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার মৌলিক অধিকার। শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এই ধরনের উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫৪টি উপজেলায় ১৯ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় আছে। গত কয়েক বছরে এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ভবিষ্যতে এই ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। এত বিশাল বাজেটের একটি প্রকল্পে যদি শিশুর প্লেটে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- এই অর্থ কোথায় যাচ্ছে?
বাংলাদেশে এখনো শিশু অপুষ্টি একটি বড় জাতীয় সংকট। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন জরিপ বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় অংশ খর্বাকৃতি (stunted), কম ওজনের বা রক্তস্বল্পতায় ভোগে। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারে অনেক শিশুই সকালে না খেয়ে বা অল্প খাবার খেয়ে স্কুলে যায়। ফলে মিড-ডে মিল প্রকল্প কেবল একটি খাবার কর্মসূচি নয়, এটা শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষার অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ সেই ভিত্তির ভেতরেই যদি দুর্নীতির ঘুণপোকা ঢুকে পড়ে, তাহলে পুরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মই ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থা ও তদারকির দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা কম খরচে বেশি লাভের জন্য নিম্নমানের খাদ্য কিনছে। কিছু জায়গায় খাদ্য সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা নেই। আবার কোথাও স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করলেও তা গুরুত্ব পাচ্ছে না। ফলে অনিয়ম স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো- এই অনিয়মের শিকার হচ্ছে এমন শিশুরা, যারা নিজেদের অধিকার আদায়ের ভাষাও জানে না।
একজন শিশু যখন স্কুলে গিয়ে পচা ডিম খায়, তখন তার শরীরে শুধু জীবাণুই প্রবেশ করে না, তার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসও জন্ম নেয়। শিশুরা যদি খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়, তাহলে পরিবারগুলোর মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেক অভিভাবক তখন সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হন। ফলে যে প্রকল্প স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানোর কথা, সেটাই উল্টো শিশুর স্কুলবিমুখতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের গুণগত মান খারাপ হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। পুষ্টিহীনতা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং মেধা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শৈশবের অপুষ্টি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ অপুষ্ট শিশুরা পরবর্তী সময়ে কম উৎপাদনশীল কর্মশক্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অর্থাৎ মিড-ডে মিল প্রকল্পের ব্যর্থতা কেবল কয়েকটি স্কুলের সমস্যা নয়, এটা জাতীয় উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মিড-ডে মিল প্রকল্প শুধু একটি খাবার বিতরণ কর্মসূচি নয়; এটি শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। বাংলাদেশের মতো দেশে বহু শিশু খালি পেটে স্কুলে আসে কিংবা দিনের সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবারটি স্কুল থেকেই পাওয়ার আশা করে। সেই খাবার যদি অনিরাপদ বা নিম্নমানের হয়, তাহলে শিশুদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের মনোজগতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একজন শিশু যখন স্কুলে অসুস্থ হয়, তখন তার কাছে শিক্ষা ও নিরাপত্তার ধারণাটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশু-বান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তোলার যে লক্ষ্য, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মিড-ডে মিল প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু খাবার সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। খাবারের মান পরীক্ষা, সংরক্ষণ পদ্ধতি, রান্না ও পরিবেশনের স্বাস্থ্যবিধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অঙ্গীকার।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে একটি দুর্নীতির চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন, ক্রয় প্রক্রিয়া- সব জায়গায় যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সহজেই লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমরা আগেও দেখেছি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিংবা খাদ্য বিতরণ প্রকল্পে দুর্নীতি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র মানুষ। মিড-ডে মিলেও যদি একই চিত্র দেখা যায়, তাহলে তা জাতির জন্য গভীর লজ্জার।
সবচেয়ে দুঃখজনক সত্য হলো, আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অগ্রাধিকারের তালিকায় শিশুরা এখনো উপরের দিকে নেই। কারণ শিশুরা ভোট দেয় না, মিছিল করে না, টেলিভিশনের টকশোতে বসে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারে না। তাদের কোনো শক্তিশালী লবি নেই, অর্থনৈতিক ক্ষমতা নেই, সম্পত্তির মালিকানা নেই। ফলে তাদের কষ্ট, অপুষ্টি কিংবা মৃত্যু খুব সহজেই পরিসংখ্যানের ভিড়ে হারিয়ে যায়। একটি সেতু ভেঙে পড়লে, শেয়ারবাজারে ধস নামলে কিংবা বড় কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটলে রাষ্ট্র ও সমাজ যতটা অস্থির হয়ে ওঠে, একজন শিশু পচা খাবার খেয়ে অসুস্থ হলে বা মারা গেলে ততটা আলোড়ন তৈরি হয় না। এই নীরব অবজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের সামাজিক অবহেলাই শিশুদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। অথচ যে জাতি তার শিশুদের গুরুত্ব দিতে শেখে না, সেই জাতি কখনোই টেকসই উন্নয়ন বা মানবিক সভ্যতার দাবিদার হতে পারে না।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জিরো টলারেন্স নীতি। শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাবারে অনিয়মকে সাধারণ দুর্নীতি হিসেবে দেখলে চলবে না। যারা জেনেশুনে পচা বা নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করে, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ এটা সরাসরি শিশুস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ।
একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা। উপজেলা শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। আকস্মিক পরিদর্শন বাড়াতে হবে। প্রতিটি স্কুলে কী খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এখনকার প্রযুক্তির যুগে প্রতিদিনের খাবারের ছবি বা ভিডিও আপলোড বাধ্যতামূলক করা কঠিন কিছু নয়। এতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও নজরদারি সম্ভব হবে।
স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সমাজকর্মীদের সরাসরি তদারকির সুযোগ দিতে হবে। কারণ স্থানীয় মানুষ জানে কোন খাবার ভালো, কোনটি পচা, কোন ঠিকাদার অসাধু। অভিযোগ করলে যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেই নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে শিশুদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় শিশুরাই সবার আগে বুঝতে পারে খাবারের গুণগত সমস্যা, কিন্তু তাদের কথা গুরুত্ব পায় না। প্রতিটি স্কুলে শিশু-বান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদভাবে তাদের অভিজ্ঞতা জানাতে পারবে। কারণ শিশুদের কল্যাণ নিয়ে পরিকল্পনা করতে হলে শিশুদের কণ্ঠও শোনা প্রয়োজন। একটি কার্যকর মিড-ডে মিল ব্যবস্থা শুধু ক্ষুধা কমাবে না, এটি শিশুদের স্কুলে ধরে রাখবে, শিক্ষায় মনোযোগ বাড়াবে এবং একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই সত্যিকারের অর্থ পাবে, যখন প্রতিটি শিশু নিশ্চিন্তে বলতে পারবে- স্কুলে গেলে অন্তত নিরাপদ খাবার পাওয়া যায়।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ ও মানবিক হবে, তার বড় একটি সূচক হলো সেই দেশ তার শিশুদের কতটা মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারছে। স্কুলের খাবার নিয়ে অনিয়মের ঘটনা তাই শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার খবর নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক মূল্যবোধেরও একটি কঠিন পরীক্ষা। যে সমাজ শিশুদের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য, অপুষ্টি ও শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়ার এক ভয়াবহ চক্রের মধ্যে আটকে যায়। তাই এই সংকটকে সাময়িক আলোচনার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে স্থানীয় উৎপাদকদের সম্পৃক্ত করা। বিদেশি কোম্পানি বা বড় ঠিকাদারের বদলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিম, দুধ, কলা, সবজি সরাসরি সংগ্রহ করা গেলে খাবারের মান যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি সফল হয়েছে। সেখানে মিড-ডে মিল স্থানীয় কৃষি ও নারীর কর্মসংস্থানের সাথেও যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও এমন মডেল অনুসরণ করা সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মিড-ডে মিল কোনো দয়া নয়, এটা শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। একটি সভ্য সমাজ কখনো তার শিশুদের পচা খাবার খাওয়াতে পারে না। উন্নত জাতি গড়ার স্বপ্ন দেখার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, স্কুলে যাওয়া শিশুর প্লেটে অন্তত নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার আছে। কারণ আজ যে শিশু পচা ডিম খাচ্ছে, আগামীকাল সেই শিশুই এই দেশের নাগরিক, শ্রমশক্তি, শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা নীতিনির্ধারক হবে।
তাই এখনই সময় কঠোর হওয়ার। মিড-ডে মিল প্রকল্পকে দুর্নীতির কবল থেকে উদ্ধার করতে না পারলে, হাজার হাজার কোটি টাকার এই উদ্যোগ ইতিহাসে আরেকটি ব্যর্থ রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে বাংলাদেশের শিশুরা।
মন্তব্য করুন

