Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

স্পাইওয়ার: পর্দার আড়ালের যুদ্ধ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি স্পাই ওয়ারের বলি হয়েছেন?

মত-দ্বিমত

স্পাইওয়ার: পর্দার আড়ালের যুদ্ধ

হেমায়েত উল্লাহ ইমন

Icon

হেমায়েত উল্লাহ ইমন

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

আমেরিকা-ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ কি কেবল মিসাইল, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্রে সীমাবদ্ধ নাকি এটি এমন এক “অদৃশ্য যুদ্ধ”, যেখানে তথ্য, গুপ্তচরবৃত্তি এবং জনমানস সবই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? সাম্প্রতিক সময়ে চারজন ইসরায়েলি সেনার গ্রেপ্তার, কয়েক মাস আগে ইরানের অভ্যন্তরে আন্দোলনকালীন সহিংসতা, এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রিপোর্ট—সব মিলিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সংঘাত শুধু প্রচলিত যুদ্ধের কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই। এই যুদ্ধ বহুমাত্রিক ছায়াযুদ্ধ। যেখানে দৃশ্যমান যুদ্ধের বাইরে অদৃশ্য নেটওয়ার্কগুলোই নির্ধারণ করছে ক্ষমতার ভারসাম্য। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্র, নাগরিক এবং তথ্যের মধ্যকার সম্পর্ক কি এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে?

গত বছরের জুনে যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল সেখানে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ইন্টারসেপ্ট করে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছিল। এই প্রেক্ষিতে ইরান শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করে। এবার যুদ্ধ শুরুর প্রথম মুহূর্তেই খমেনি সহ শীর্ষ নেতৃত্বকে  হত্যা করা হয়, তাদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয় রাস্তায় রাস্তায় ট্রাফিক লাইটে বসানো গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে। তাছাড়া রাস্তার ভিক্ষুক থেকে মুদি দোকানদার সবখানে ছড়িয়ে আছে সিআইএ ও মোসাদ এজেন্টরা।
 
ইসরায়েলে সম্প্রতি চারজন সেনা সদস্যকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ইরানের হয়ে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অভিযুক্তরা সবাই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার অংশ ছিলেন। তদন্ত চলমান থাকলেও আদালতের নিষেধাঙ্গার কারণে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এই ঘটনা আমাদের দেখায় যে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ একটি কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠেছে. 
স্পাই যুদ্ধ বা গুপ্তচরবৃত্তি আধুনিক যুদ্ধে অত্যন্ত প্রভাবশালী উপাদান। ইরানের ক্ষেত্রে এই স্পাই যুদ্ধ বহুস্তরে কাজ করে। একদিকে ইরান নিজেই বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিশেষ করে মোসাদ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখে, অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে যে এই সংস্থাগুলো ইরানের অভ্যন্তরে নেটওয়ার্ক তৈরি করে তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কখনো কখনো স্যাবোটাজ পরিচালনা করে। 

স্পাই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অস্থিরতার ওপর প্রভাব। ইরানের ক্ষেত্রে আন্দোলন বা সামাজিক অস্থিরতার সময় সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশ, তথ্য ছড়ানো, বা গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার অভিযোগ ওঠে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এর ফলে রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে বাহ্যিক শত্রু এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। 

ইরান ও ইসরায়েল—দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক তৈরি ও ভাঙার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ইরানের পক্ষ থেকেও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করার অভিযোগে বহু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ২০ জনকে আটক করা হয় বলে জানা যায়। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনার জন্য পরিচিত। 

এই বাস্তবতায় তথ্য এবং ন্যারেটিভের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেই-এর একটি মন্তব্যে ইরানের আন্দোলনের সময় মোসাদ এজেন্টদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পাশাপাশি ‘Middle East Eye’ সম্প্রতি বিভিন্ন ইরানি নাগরিকের সাক্ষ্য প্রকাশ করে, যেখানে তারা আন্দোলনের সময় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করার কথা বলেন। যদিও এসব দাবি যাচাইযোগ্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তবুও এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের নয়, বরং তথ্যের এবং আগে থেকে পরিকল্পনা জেনে যাওয়া এবং সে অনুযায়ী পাল্টা পরিকল্পনা সাজানোর। 

ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তোলে। সরকারি হিসাবে তিন হাজারের মতো মৃত্যুর কথা বলা হলেও, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অন্তত ৭ হাজার জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছে। এই পরিসংখ্যানগত বৈপরীত্য কেবল তথ্যগত নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের অংশ হিসেবেও কাজ করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The New York Times-থেকে জানা যায়, আমেরিকা-ইসরাইলের বিশ্বাস ছিলো  যে, প্রথম আঘাতে শীর্ষ নেতৃত্বকে মেরে ফেললেই ইরানের ভেতর থেকে গণবিক্ষোভের সূচনা হবে যা ইরানের পতন ঘটিয়ে ফেলবে। 

সবকিছু একত্রে দেখলে বোঝা যায় যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এখন একটি “hybrid conflict” বা সংকর যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এখানে সামরিক শক্তি, গোয়েন্দা কার্যক্রম, তথ্যযুদ্ধ এবং সামাজিক অস্থিরতা সবই একই সঙ্গে সক্রিয়। এখন রাষ্ট্রগুলো শুধু সীমান্ত রক্ষা করছে না,  নিজেদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, জনমত এবং তথ্যপ্রবাহকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। ফলে নাগরিকরাও এই সংঘাতের অদৃশ্য অংশ হয়ে উঠছে, যেখানে তাদের অভিজ্ঞতা, ভয় এবং প্রতিরোধ সবকিছুই বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তাই বলা যায়, ভবিষ্যতের যুদ্ধ নির্ভর করবে কেবল সামরিক শক্তির ওপর নয়, বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় তার ওপর। গোয়েন্দা যুদ্ধ যেমন নিখুঁত নিশানা ঠিক করতে সাহায্য করে, তেমনি ভয়ংকর কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহারের আগেই তা অকেজো করে দিতে পারে। এমনকি অস্ত্রবাজি ছাড়াও যুদ্ধ জিতিয়ে দিতে পারে। আন্ডারকাভার এজেন্টরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও তাই তাদের কাহিনী ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। 

মন্তব্য করুন

Logo