Logo

২ কার্তিক ১৪৩৩

×

Follow Us

আকাশের আজন্ম যুদ্ধ: এক প্রবাসী শ্রমিকের জীবনকথা

ছবিঃ অনলাইন থেকে সংগৃহীত

ফিচার

আকাশের আজন্ম যুদ্ধ: এক প্রবাসী শ্রমিকের জীবনকথা

Icon

ম জাকির হোসেন খান

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম

আকাশের নাম রেখেছিলেন তার মা। জন্মের পর ছেলেকে কোলে নিয়ে নাকি বলেছিলেন, “আমার ছেলেটার মন যেন আকাশের মতো বড় হয়।”
মায়ের সেই দোয়া হয়তো কবুল হয়েছিল। আকাশের মন সত্যিই বড় হয়েছিল। শুধু কেউ তাকে বলেনি, বড় মনের মানুষদের বুকের ভেতর অনেক সময় নিজের জন্য জায়গা খুব কম থাকে।
বাংলাদেশের এক ছোট্ট গ্রামে আকাশের জন্ম। বাবা ছিলেন দিনমজুর। বর্ষায় কাজ থাকত না, শীতে কাজ কমে যেত, আর অসুখ করলে সংসারের চুলায় আগুনও যেন অসুস্থ হয়ে পড়ত। খুব অল্প বয়সেই আকাশ বুঝে গিয়েছিল, পুরুষ হয়ে জন্মালে তার কান্নারও একটা বাজারদর আছে। 
ছোটবেলায় কাঁদলে মা বুকে নিতেন; একটু বড় হওয়ার পর বাবা বলতেন, “পুরুষ মানুষ এত কাঁদে না।” তারপর জীবন তাকে শেখাল, পুরুষের আত্মা কাঁদে ঠিকই, শুধু এমন জায়গায় কাঁদে যেখানে কেউ দেখে না।

স্কুলের শেষ বেঞ্চে বসে একসময় আকাশের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হবে। কিন্তু স্বপ্নের আগে এলো বাবার অসুখ, ছোট দুই বোনের বিয়ে, ঘরের চাল মেরামত আর ধারদেনা।
একদিন গ্রামের একজন বলল, মধ্যপ্রাচ্যে নির্মাণকাজে লোক নিচ্ছে। “কষ্ট আছে, কিন্তু টাকাও আছে।” এই একটি বাক্যই তখন আকাশের কাছে ভবিষ্যতের দরজা মনে হয়েছিল। জমি বন্ধক পড়ল। মায়ের গলার একমাত্র সোনার চেইন বিক্রি হলো। আত্মীয়ের কাছ থেকে সুদে টাকা নেওয়া হলো। তারপর বহু মানুষের মতো আকাশও একটা প্লেনের টিকিট কিনল, নিজের জন্য নয়, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য।

মরুর দেশে প্রথম সকাল। বিমান থেকে নামার পর প্রথম যে জিনিসটি তাকে আঘাত করেছিল, সেটা ছিল গরম।
বাংলাদেশের আর্দ্র গরমের সঙ্গে এর মিল নেই। এখানে বাতাসও যেন আগুনের চুল্লি থেকে বেরিয়ে আসে। বিমানবন্দরের কাঁচের দেয়াল, চকচকে মেঝে, সুগন্ধি আর ঝকঝকে গাড়ি দেখে আকাশ কিছুক্ষণ ভেবেছিল, এই দেশ বুঝি স্বপ্ন দিয়ে বানানো।

কয়েক ঘণ্টা পর কোম্পানির বাস যখন তাকে শহরের বাইরে শ্রমিকদের আবাসনে নিয়ে গেল, সে বুঝল একই শহরেরও একাধিক মুখ আছে। একদিকে আকাশ ছোঁয়া কাচের ভবন, পাঁচতারা হোটেল, সুবিশাল শপিং মল, দামি গাড়ি আর সন্ধ্যায় আলোকিত বুলেভার্ড। অন্যদিকে ছোট ছোট ঘরে ছয়-আটজন মানুষের বাস। লোহার খাট। এক কোণে রান্নাঘর। দেয়ালে ঝোলানো কাপড়। ফ্রিজে প্রত্যেকের আলাদা প্লাস্টিকের বাক্স। কারও ভেতর ডাল, কারও ভাত, কারও শুকনো মাছ, কারও শুধু পানি।

সেখানে বাংলাদেশি আছে, নেপালি আছে, পাকিস্তানি, ভারতীয়, ফিলিপিনো, সুদানি, মিসরীয়, অনেক ভাষার মানুষ। সবাই একে অন্যের ভাষা বোঝে না। কিন্তু ক্লান্তি সবার ভাষা।
সকালে আজানের ধ্বনি যখন মরুর নিস্তব্ধতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে, আকাশের গ্রামের মসজিদের কথা মনে পড়ে। শুক্রবারের নামাজে স্থানীয় আরব, আফ্রিকান, দক্ষিণ এশীয়, ধনী-গরিব, এক কাতারে দাঁড়ায়। মুহূর্তটির মধ্যে অদ্ভুত এক সমতা আছে।

কিন্তু নামাজ শেষে সবাই আবার নিজের সামাজিক জগতে ফিরে যায়। কেউ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে ওঠে। কেউ শ্রমিকবাহী বাসে। আকাশ দ্বিতীয় দলের মানুষ। মানুষ নয়, প্রথমে সে শ্রমিক এ সত্যটা ক্রমেই কঠিন সত্য হতে দাঁড়ায়।  নির্মাণসাইটে আকাশের পরিচয় খুব ছোট। নাম নয়। একটি আইডি নম্বর। একটি হেলমেট। একজোড়া সেফটি বুট। একটি শিফট।
সকাল হওয়ার আগেই বাস ছাড়ে। শহর তখনও পুরোপুরি জাগেনি। কিন্তু শ্রমিকেরা জেগে গেছে। কারণ যেসব ভবনে মানুষ দিনের বেলা কাজ করবে, ঘুমাবে, কেনাকাটা করবে, সেসব ভবন তৈরি করতে অন্য মানুষদের সূর্যের আগেই কাজে নামতে হয়। প্রথম কয়েক মাস আকাশ ইট, সিমেন্ট, লোহা আর কংক্রিটের ভাষা শিখল। আরবি জানত না। ইংরেজিও খুব সামান্য। কিন্তু “ইয়াল্লাহ”, “হাবিবি”, “খালাস”, “ফাস্ট”, “সেফটি”, এসব শব্দ দ্রুত শিখে গেল।

কোম্পানির নিয়ম ছিল। কাজের সময় ছিল। নিরাপত্তার নির্দেশনাও ছিল। প্রচণ্ড গরমে কখন কাজ থামাতে হবে, কীভাবে হেলমেট পরতে হবে, কোথায় হারনেস লাগাতে হবে, সব কাগজেই লেখা।
কিন্তু কাগজ আর মানুষের জীবনের মাঝখানে প্রায়ই থাকে উৎপাদনের চাপ, সাব-কন্ট্রাক্টরের তাড়া, সময়সীমা আর অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন। 
আকাশও অতিরিক্ত কাজ চাইত। ওভারটাইম মানে বাড়িতে বেশি টাকা।
বেশি টাকা মানে মায়ের ভালো ওষুধ। মেয়ের ভালো স্কুল। ছেলের নতুন বই। স্ত্রীর হাতে বাজারের টাকা। নিজের শরীর তখনও হিসাবের খাতায় ঢোকেনি।
একজন পুরুষের যুদ্ধ শুরু হয় অনেক আগেই। আকাশ ভেবেছিল বিদেশে গিয়ে তার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আসলে যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। যেদিন দশ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে মাঠে গিয়েছিল। যেদিন নিজের স্কুলের বই না কিনে ছোট বোনের পরীক্ষার ফি দিয়েছিল। যেদিন মায়ের সামনে প্রথম বলেছিল, “তুমি চিন্তা করো না, আমি আছি।” সেই “আমি আছি” বাক্যটি এরপর সারাজীবন তাকে তাড়া করেছে। পুরুষদের জীবনে অনেক সময় এই তিনটি শব্দই শপথ হয়ে যায়। বলতে হয়, আমি আছি। কিন্তু তাকে কে বলবে, “তোমার জন্য আমিও আছি”?

প্রথম বেতন পাওয়ার দিন আকাশ খুব খুশি হয়েছিল। নিজের জন্য একটি ভালো শার্ট কিনবে ভেবেছিল। দোকানে গিয়ে দাম দেখে ফিরে এলো। শার্টটি না কিনে টাকা দেশে পাঠিয়ে দিল। 
মা ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “বাবা, এত টাকা পাঠাইছিস কেন? নিজের জন্য রাখিস।” আকাশ হাসল। “আমার কী লাগে মা?” এই বাক্যটিও পরে তার জীবনের অংশ হয়ে গেল। আমার কী লাগে? স্ত্রী বলল, ঘরের টিন পুরোনো।  টাকা গেল।  তারপর পাকা ঘর হলো। ফ্রিজ এলো। টেলিভিশন এলো। সোফা এলো। ছেলের প্রাইভেট স্কুল। মেয়ের কোচিং। ঈদে নতুন জামা। আত্মীয়ের চিকিৎসা বিয়ের অনুষ্ঠানে উপহার। কারও ব্যবসায় কিছু টাকা। কখনো জমি কেনা। কখনো বাড়ির দ্বিতীয় তলার পরিকল্পনা। আকাশ প্রতিবারই বলেছে, “ঠিক আছে, পাঠাচ্ছি।”

দেশের বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে তার শ্রম জড়িয়ে গেল। শুধু সেই বাড়িতে তার নিজের থাকার সময় হলো না।
রমজান এলেই মরুর দেশটি বদলে যেত। দিনের ব্যস্ততা কিছুটা অন্য ছন্দে চলে যেত। সন্ধ্যার আগে রাস্তায় গাড়ি ছুটত। মসজিদের পাশে ইফতারের আয়োজন হতো। কোথাও খেজুর, পানি, ভাত, মাংস বিতরণ করা হতো। আকাশ এই সময়টাকে ভালোবাসত। ইফতারের সময় ধনী-গরিবের দূরত্ব কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছোট হয়ে আসে।
একবার এক বৃদ্ধ আরব মানুষ তাকে একটি খেজুর এগিয়ে দিয়েছিলেন। হেসে বলেছিলেন, “আখি”, ভাই। আকাশের বুক কেঁপে উঠেছিল। একটি শব্দের মধ্যেও কখনো কখনো মানুষ ঘর খুঁজে পায়। কিন্তু ঈদের সকাল ছিল অন্যরকম। দেশে ভিডিও কলে সবাই নতুন পোশাক পরে দাঁড়াত। ছেলের নতুন ঘড়ি। মেয়ের নতুন জামা। স্ত্রীর সাজ। বাড়িতে সেমাই। আত্মীয়স্বজনের ভিড়। আকাশ স্ক্রিনের ওপাশ থেকে হাসত।

তার নিজের গায়ে আগের বছরের পাঞ্জাবি। ভিডিও কল শেষ হলে ঘরটা হঠাৎ খুব নিঃশব্দ হয়ে যেত। সেদিন সে বুঝত, টাকা দূরত্ব পেরিয়ে যায়। মানুষ পারে না সবসময়।
কিন্তু কঠিন সময় আসতে দেরি হয়না। যেদিন পা ভাঙল, সেদিনও অন্য দিনের মতো ছিল। উঁচু ভবনের নির্মাণকাজ। লোহার কাঠামো। ধুলো। মেশিনের শব্দ। চিৎকার করে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। 
এক মুহূর্তের ভুল। একটি পা পিছলে গেল। আকাশ পড়ে গেল। খুব উঁচু থেকে নয়। তাই বেঁচে গেল। কিন্তু তার পায়ের হাড়ে চিড় ধরল।
হাসপাতালে নেওয়া হলো। প্রথম চিকিৎসা হলো। ডাক্তার বললেন বিশ্রাম দরকার, ফলোআপ দরকার, আরও কিছু পরীক্ষা দরকার। আকাশ প্রথম প্রশ্ন করল, “কত খরচ?”
ডাক্তার হয়তো এই প্রশ্ন হাজারবার শুনেছেন। কারণ সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসায় রোগের আগে বাজেটের পরীক্ষা হয়।
আকাশ কয়েকদিন বিশ্রাম নিল। তারপর কাজে ফিরল। পা তখনও ফুলে থাকে। সিঁড়ি উঠলে ব্যথা করে। রাতে বিছানায় শুয়ে পায়ের নিচে বালিশ দেয়। কিন্তু দেশে কাউকে জানায় না পুরোটা। মাকে বললে মা দুশ্চিন্তা করবেন। স্ত্রীকে বললে সে বলবে দেশে চলে আসতে। কিন্তু দেশে গেলে আয় বন্ধ। তখন? বাড়ির কিস্তি? স্কুল? ওষুধ? সংসার? একজন পুরুষের শরীর অনেক সময় তার নিজের সম্পত্তিও থাকে না। তার শরীর হয়ে যায় পরিবারের অর্থনীতি। অজানা আশংকা আকাশকে ঘিরে ধরে। সিগারেট আকাশ ছোটবেলা থেকে খেত না। প্রবাসে এসে শুরু। প্রথমে সহকর্মীদের সঙ্গে। তারপর একা। রাতে ফোনের পর একটা।  বেতন দেরি হলে একটা। দেশে কোনো সমস্যা হলে দুইটা। ব্যথা হলে। মন খারাপ হলে। ঘুম না এলে।

একদিন বুঝল, সিগারেট আর তার অভ্যাস নয়, সঙ্গী। বহু বছর পর কাশি শুরু হলো। প্রথমে শুকনো। তারপর দীর্ঘ। কখনো বুক জ্বলে। সহকর্মী রহিম বলেছিল, “ভাই, ডাক্তার দেখান।” আকাশ বলেছিল, “সময় পাই না।” আসলে সময় নয়। ভয়। ডাক্তার যদি বড় কিছু বলে? চিকিৎসা করতে টাকা লাগবে। কাজ বন্ধ করতে হবে।
তখন পরিবার? একদিন পরীক্ষা করাতে গিয়ে ডাক্তার তাকে সতর্ক করল, ফুসফুসে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ধূমপান বন্ধ করতে হবে। আরও পরীক্ষা দরকার।
আকাশ বাইরে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর একটা সিগারেট ধরাল।

মানুষ কখনো কখনো মৃত্যুভয়েও সেই জিনিসের কাছেই ফিরে যায় যেটা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কারণ সে মৃত্যুকে নয়, একাকিত্বকে বেশি ভয় পায়। এদিকে দেশে আকাশের পাঠানো টাকায় গ্রামের বাড়ির চেহারা বদলে গেছে। 
দেয়ালে টাইলস। ড্রয়িংরুমে বড় টেলিভিশন। নতুন সোফা। ছেলের দামি ফোন। মেয়ের সুন্দর ঘর। ফ্রিজে খাবার। উৎসবে অতিথি। সামাজিক মাধ্যমে ছবি ওঠে।
“Alhamdulillah. Blessed.”
আকাশ ছবিগুলো দেখে লাইক দেয়। সে খুশি হয়।
আবার কোথাও একটা ব্যথাও হয়। একদিন ছেলে ফোনে বলল, “আব্বু, আমার বন্ধুর আইফোন আছে।”
আকাশ বলল, “তোমার ফোন তো ভালো।”
ছেলে অভিমান করল। “আপনি বুঝবেন না।” আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সত্যিই সে বুঝবে না।
যে বাবা নিজের দুপুরের খাবারের দাম বাঁচিয়ে সন্তানের মোবাইল কেনে, তার কাছে মডেলের পার্থক্য বোঝা কঠিন। মানুষের শরীর শুধু খাবার চায় না। স্পর্শও চায়। একদিন গভীর রাতে আকাশ শ্রমিক আবাসনের বাইরে বসে ছিল। মরুর আকাশ বিস্ময়কর পরিষ্কার। দূরে শহরের আলো। কাছেই মসজিদের মিনার। রাস্তার ওপরে গরম বাতাস। সে একা।
পরিচিত অনেক প্রবাসীর অ্যাপে যৌনতা মেটানোর গল্প হয়তো প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু একাকীত্ব গ্রাসে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের কম্পন কি তার প্রিয়জনরা শুনতে পায়, এ ভাবনা আকাশকেও ভাবায়।
তার হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো কেউ পাশে এসে বসুক। কিছু না জিজ্ঞেস করে মাথাটা বুকে টেনে নিক।
বলুক, “তুমি অনেক যুদ্ধ করেছ। এবার একটু বিশ্রাম নাও।”
সে চেয়েছিল কারও বুকের মধ্যে মুখ লুকাতে। পাঁজরে পাঁজর মিশিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চিন্ত থাকতে। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দিক। এই চাওয়া যৌবনের কামনার চেয়েও গভীর ছিল। এটি ছিল একজন ক্লান্ত মানুষের আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা।

আকাশের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। মরুর গরম বাতাসে কখন শুকিয়ে গেল, সে বুঝল না।
তার ঘরে আরও পাঁচজন শ্রমিক। একজনের মেয়ে বিয়ে হবে। একজনের বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত। একজন দশ বছর দেশে যায়নি। একজনের স্ত্রী অন্য সম্পর্কে চলে গেছে। আরেকজন ঋণ শোধ করতে করতে চল্লিশ পেরিয়েছে। প্রত্যেকেরই একটি গল্প আছে। রাতে আলো নিভে গেলে কেউ নাক ডাকে। কেউ ফোনে কথা বলে। কেউ কোরআন পড়ে। কেউ ইউটিউবে গ্রামের ভিডিও দেখে। কেউ চুপচাপ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই ঘরগুলো আসলে শ্রমিকদের আবাসন নয়। এগুলো পৃথিবীর অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যারাক। যেখানে কোনো বন্দুক নেই।

কিন্তু প্রতিদিন মানুষ লড়ছে-
ক্ষুধার বিরুদ্ধে, ঋণের বিরুদ্ধে, একাকিত্বের বিরুদ্ধে, শরীরের বিরুদ্ধে, সময় হারানোর বিরুদ্ধে, পরিবার হারানোর ভয় আর পরিবার বাঁচানোর দায়িত্ব, দুটোর বিরুদ্ধেই। আকাশরা অর্থনীতির নায়ক, জীবনের অনুপস্থিত মানুষ।  দেশে মাঝে মাঝে বলা হয়, প্রবাসীরা অর্থনীতির চালিকাশক্তি। রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আকাশ এসব শুনলে মৃদু হাসে। সে জানে ব্যাংকের হিসাবে তার পাঠানো অর্থের অঙ্ক আছে। কিন্তু কোথাও লেখা নেই- সে কতগুলো দুপুর না খেয়ে কাটিয়েছে। কত রাত পায়ের ব্যথায় ঘুমায়নি। কতবার অসুস্থ হয়েও কাজে গেছে। কত ঈদ সন্তান ছাড়া কাটিয়েছে। কত জন্মদিন ফোনের স্ক্রিনে দেখেছে। কতবার স্ত্রীর মুখ ছুঁতে গিয়ে মোবাইলের কাঁচ ছুঁয়েছে। কতবার মায়ের কণ্ঠ শুনে ফোন কেটে কেঁদেছে। রাষ্ট্রের হিসাবে তার রেমিট্যান্স আছে। কিন্তু তার নিঃসঙ্গতার কোনো বৈদেশিক মুদ্রামান নেই। এভাবেই সময় যেতে থাকে। আকাশের চুল পাকে। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠে। মেয়ে বড় হয়। মা আর হাঁটতে পারেন না আগের মতো। আকাশ ভাবে, এবার দেশে ফিরবে।

তারপর হিসাব করে। দেশে গিয়ে করবে কী? জমানো টাকা খুব বেশি নেই। বাড়ি হয়েছে। সন্তানের পড়াশোনা হয়েছে। কিন্তু নিজের নামে ভবিষ্যৎ? প্রায় শূন্য।

সারাজীবন টাকা পাঠিয়ে সে পরিবারের জীবন গড়েছে। নিজের জীবিকার জন্য কোনো জমা পরিকল্পনা তৈরি করেনি। তখন সে আবিষ্কার করে প্রবাসী শ্রমিকের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলোর একটি-
বাড়ি যাওয়ার স্বপ্নে সে বিদেশে থাকে; কিন্তু বহু বছর পর বাড়ি যাওয়ার সামর্থ্যটাই হারিয়ে ফেলে। এক রাতে আকাশ আবার বাইরে বসেছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে। এবার তার হাতে সিগারেট ছিল না। ডাক্তার কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। পায়ের পুরোনো ব্যথাও ফিরে এসেছে। ফোনে দেশে কথা হয়েছিল। আবার কিছু টাকা দরকার।
সে বলেছে, “দেখি।”
ফোন রেখে আকাশ অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজেকেই প্রথমবার একটি প্রশ্ন করল-
“আকাশ, তুই কেমন আছিস?”
প্রশ্নটি শুনে সে যেন ভয় পেয়ে গেল। কারণ পঞ্চাশ বছরের জীবনে সবাইকে সে এই প্রশ্ন করেছে।
মাকে। স্ত্রীকে। সন্তানকে। ভাইবোনকে। আত্মীয়কে।
কখনো নিজেকে করেনি। সেদিন সে বুঝল, দায়িত্ব ভালোবাসা। ত্যাগও ভালোবাসা। কিন্তু নিজের জীবনকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেওয়া ভালোবাসার একমাত্র প্রমাণ নয়। পুরুষেরও চিকিৎসা দরকার।  বিশ্রাম দরকার। সম্মান দরকার। কাদার জায়গা দরকার।
আর সবচেয়ে বেশি দরকার এমন একজন মানুষ, যে তার উপার্জনের আগে তার মানুষটিকে দেখবে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পথে প্রতিদিন কত আকাশ উড়ে যায়।
তাদের নাম আলাদা। পেশা আলাদা। দেশ আলাদা। কেউ সৌদি আরবে। কেউ কাতারে। কেউ ওমানে। কেউ কুয়েতে। কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাতে। কেউ বাহরাইনে।
কিন্তু গল্পগুলো আশ্চর্যভাবে কাছাকাছি। তারা শহর বানায়, যেখানে নিজেরা থাকে না। রাস্তা বানায়, যেখানে দামি গাড়ি চলে। হোটেল বানায়, যেখানে একটি রাত থাকার সামর্থ্য তাদের নেই। বাড়ি বানায়, কিন্তু নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখে মোবাইলের পর্দায়।
অন্যের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে করতে নিজের বর্তমান হারায়।
তবু তারা সকালবেলা উঠে কাজে যায়। কারণ তাদের পেছনে একটি পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে। আর সামনে থাকে আরেকটি বেতন।
এই দুইয়ের মাঝখানে মানুষটি কোথায় থাকে, সেই প্রশ্ন আমরা খুব কমই করি। তাই আকাশের গল্প কোনো একজন মানুষের করুণ কাহিনি নয়।
এটি একজন পুরুষের আজন্ম যুদ্ধের গল্প, প্রথমে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, তারপর দায়িত্বের জন্য, এরপর প্রবাসের কঠোরতার সঙ্গে, শরীরের ক্ষয়ের বিরুদ্ধে, নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার জন্য।

সমাজ তাকে শিখিয়েছে,  পুরুষ হও। সহ্য করো। উপার্জন করো। পাঠাও। দুর্বল হয়ো না। কিন্তু কেউ তাকে শেখায়নি,  নিজেকেও বাঁচিয়ে রেখো।
আর কোনো এক মরুর রাতে, লক্ষ তারার নিচে, আকাশ নামের মানুষটি হয়তো এখনো বসে আছে। তার চোখে আর কোনো বড় স্বপ্ন নেই।
শুধু একটি ছোট্ট আকাঙ্ক্ষা, কেউ যেন একদিন তার পাঠানো টাকার হিসাব না করে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমি আর কত দেবে, আকাশ? এবার একটু নিজের জন্য বাঁচো।”
কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো, যে মানুষ সারাজীবন সবার আশ্রয় হয়ে থাকে, অনেক সময় তার নিজের মাথা রাখার জন্য একটি বুকও থাকে না।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ওয়াশিংটন। 

লেখকের নোট: গত কয়েক বছরে মালয়েশিয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ভ্রমণের পথে, বিশেষ করে বিমানে, অনেক প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের জীবনের গল্প শুনেছি। তাদের নীরব কষ্ট, ত্যাগ ও অব্যক্ত কথাগুলো গভীরভাবে মনে দাগ কেটেছে। সর্বশেষ গত আগস্টে একজন নির্মাণশ্রমিকের অভিজ্ঞতা আমাকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতাকে অবলম্বন করে, কাল্পনিক নাম ও প্রেক্ষাপটে এই গল্পটি লেখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা নির্দিষ্ট ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়; কারও নাম বা পরিস্থিতির সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়।

মন্তব্য করুন

Logo